Japanese Kanso philosophy | আবেগের অতল গহ্বর থেকে মুক্তি চাইছেন? জাপানি ‘কানসো’ দর্শন শিখিয়ে দিচ্ছে সহজ জীবনের নতুন মন্ত্র

SHARE:

জীবনের জটিলতা কমাতে জাপানের কানসো (Kanso) দর্শন কীভাবে সাহায্য করে? জানুন সরলতায় সুখ খোঁজার বৈজ্ঞানিক উপায়।

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : দৈনন্দিন জীবনের চাপে ক্লান্ত? মাথার ভিতর গুঞ্জন করছে ডেডলাইনের শোরগোল, ফোন, ই-মেলের অবিরাম নোটিফিকেশন, অফিস-ঘর, সব দায়িত্বের এক অসহ্য ভার? এমন জীবনে শান্তির ঠিকানা খুঁজে পাওয়া কঠিন মনে হলেও, জাপানের প্রাচীন নন্দনতত্ত্ব কানসো (Kanso) দেখাচ্ছে এক আলোকিত পথ। ‘সরলতা’-য় উপনীত হওয়ার এ দর্শন আজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়, কারণ এটি বলে, জটিল জীবনের সেরা প্রতিষেধক অল্পে বাঁচা, কমে সুখ খুঁজে নেওয়া।মানসিক চাপের প্রকোপ বাড়তেই মনোবিজ্ঞানী থেকে লাইফ কোচরা নানা পদ্ধতির পরামর্শ দিচ্ছেন। তার মধ্যেই জাপানের কানসো তত্ত্ব যেন নিঃশব্দ বিপ্লব। এই দর্শন বলে, জীবনে যা প্রয়োজনীয় নয়, যা অপ্রয়োজনীয় ঝক্কি বাড়ায়, যা মানসিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়, সেগুলো বাদ দিলে বাকি জীবন হয়ে ওঠে শান্ত, সাজানো এবং স্বচ্ছ। জাপানি নন্দনতত্ত্বে খালি জায়গাকে (space) অত্যন্ত মূল্যবান মনে করা হয়। জাপানের বিখ্যাত ডিজাইনার সেন নো রিক্যু (Sen no Rikyū) বলেছিলেন, “খালি স্থান মনকে বিশ্রাম দেয়।” এই ভাবনা থেকেই উদ্ভূত ‘কানসো’ দর্শন। যা বস্তুগত বা মানসিক অপ্রয়োজনীয় বোঝা ফেলে দিতে শেখায়। ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে এর আশ্চর্য মিল আছে, সরলতা, সংযম এবং অপ্রয়োজনীয় লোভ থেকে মুক্তি।

আরও পড়ুন : Sasraya News, Sunday’s Literature Special | Issue 51, 9tha February 2025 || সাশ্রয় নিউজ, রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | সংখ্যা ৫১| ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

জীবনের নানা পরত খুলে দেখলে দেখা যায়, আমাদের চারপাশের অনেক কিছুই আসলে প্রয়োজনের তালিকায় পড়ে না। যেমন, একরাশ অপ্রয়োজনীয় আসবাব, স্তুপ হয়ে থাকা পোশাক, মনকে অযথা ব্যস্ত করা মোবাইল অ্যাপ, কিংবা অযৌক্তিক চাওয়া-পাওয়া। এসব বাদ দিলে জীবনে এসে যায় হালকা হাওয়া। মন খুলে যায়, শ্বাস নেওয়া সহজ হয়।

কানসোর মূল দর্শন, যা জরুরি, শুধু সেটাই রাখো

এই জাপানি তত্ত্ব বলছে, অতিরিক্ত সম্পদ, বাড়তি কাজ, তুচ্ছ লক্ষ্য, মনকে আশান্ত করা নোটিফিকেশন, সবই জীবনের ‘অন্তর্গত বিশৃঙ্খলা’ তৈরি করে। এই বিশৃঙ্খলা থেকেই জন্ম নেয় চাপ, দুশ্চিন্তা, অবসাদ। তাই কানসো শেখায়, জীবনকে এমনভাবে সাজাও, যাতে কেবল প্রয়োজনীয় জিনিসই থাকে। বাকিটা স্বভাবত সরে যাক। এ তত্ত্বের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাসাতো ওশিমা (Masato Oshima) বলেন, ‘সরলতা কখনও কৃচ্ছ্রসাধন নয়। বরং এটি এমন এক বেছে নেওয়া জীবন, যেখানে অপ্রয়োজনীয় কিছু জায়গা দখল করে রাখে না।’

দৈনন্দিন জীবনে ‘কানসো’ কীভাবে প্রয়োগ করা যায়?

এক. গৃহসজ্জায় সরলতা: ঘর তো শুধু থাকার জায়গা নয়, মনের প্রতিচ্ছবি। তাই ঘরে অপ্রয়োজনীয় আসবাব বা সামগ্রী থাকলে তা মনের ওপরও চাপ ফেলে। ঘরকে খালি, ছিমছাম, বাতাস চলাচলযোগ্য রাখা, এই দর্শনের মূল কথা। এতে ঘর যেমন বড় দেখায়, তেমনই জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার ঝামেলা কমে।

দুই. এক সময়ে একটি কাজ: কর্পোরেট দুনিয়ায় বহুকাজ (multitasking) যেন গর্বের বিষয়। কিন্তু কানসো বলে, এক সময়ে একটি কাজ সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে করো। এতে ভুল কম হয়, কাজ ভাল হয়। জীবনে চাপও কমে। তিন. ডিজিটাল ডিটক্স: মোবাইল বা কম্পিউটারের অতিরিক্ত নোটিফিকেশন, অসংখ্য অ্যাপ, সামাজিক মাধ্যমে অনবরত স্ক্রল, এসবই চাপ বাড়ায়। তাই অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ মুছে ফেলো, নোটিফিকেশন বন্ধ করো, কাজের সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া এড়িয়ে চল। ডিজিটাল পরিস্কার মানেই মানসিক পরিস্কার। চার. কেনাকাটায় সংযম: শপিং-এ অযথা টান বেড়ে যায়। প্রয়োজন ছাড়াই পোশাক-জুতো-গয়না কিনে ঘর ভরাই। পরে দেখা যায় সেগুলো হয়ত ব্যবহারই করা হল না। কানসো শেখায়, কিনো কম, কিনো ভাল। গুণগত মানে নজর দাও। পাঁচ. লোভ ছাড়ো, প্রয়োজন রাখো: মানুষ যত চায়, তত চাইতে থাকে। ধন-সম্পদ, সঞ্চয়, বাহুল্য দেখানোর প্রতিযোগিতা- সবই চাপ বাড়ায়। কানসো বলে, ‘কমলে শান্তি বাড়ে।’ অর্থাৎ, অপ্রয়োজনীয় চাওয়া-পাওয়া কমালে জীবনে প্রশান্তি নেমে আসে।

কেন কানসো আধুনিক মানুষের কাছে এত জরুরি?

আজকের পৃথিবী বস্তুগত প্রাচুর্যে ভরা। কিন্তু মানুষ ভিতরে ভিতরে ক্লান্ত। কারণ, অত্যধিক আকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা, অযথা তুলনা, সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে ‘প্রমাণ’ করার তাগিদ। এই অবস্থায় কানসো বলে, ‘নিজেকে হালকা করো’ এ যেন মনকে দেওয়া একটি কোমল বার্তা। মনোবিজ্ঞানী নোরিকো সুজুকি (Noriko Suzuki) বলেন, ‘মানুষ চাপের কারণে নয়, অতিরিক্ত প্রত্যাশার কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কানসো সেই প্রত্যাশার ভার কমিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনে।’

ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে কানসোর মিল কোথায়?

কানসো কেবল জাপানের নয়, এটি ভারতের ‘অপরিগ্রহ’ ধারণার সঙ্গেও মিল খুঁজে দেয়। জীবনে অপ্রয়োজনীয় কিছু না রাখা-এ কথাই বলেছেন প্রাচীন ঋষিরা। আধুনিক জীবনে কানসো সেই পুরনো ভাবনাকেই নতুনভাবে ধরাচ্ছে।

জাপানি এই দর্শন কোনও কঠোর নিয়ম নয়। এটি এক জীবনদর্শন, যা আমাদের শেখায়, অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা থেকে দূরে গিয়ে নিস্তরঙ্গ, সুসংগঠিত, শান্ত জীবন গড়তে। পৃথিবী যত ব্যস্ত হবে, এই দর্শনের প্রয়োজন ততই বাড়বে। এক কথায়, কানসো হল অল্পে সুখ খোঁজার বিজ্ঞান। সব ফেলে দিয়ে নয়, বরং যা সত্যিই জরুরি, সেটিকে আঁকড়ে ধরে বাকি শব্দকে ছেঁটে ফেলার জ্ঞান।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Muri Shinai De | মুরি শিনাই দে: কর্মব্যস্ত জীবনে জাপানি শান্তির মন্ত্র, কীভাবে বদলাবে আপনার দিন?

Sasraya News
Author: Sasraya News