সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : নতুন দিল্লির জন্তর মন্তরে (Jantar Mantar) চলমান আন্দোলনের মঞ্চে আবারও অনশনে বসলেন লাদাখের পরিচিত পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক (Sonam Wangchuk)। সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের এই অনশন শুরু করে তিনি জানালেন, বহুদিন ধরে চলা আলোচনার অচলাবস্থা এবং কেন্দ্রের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়াই তাঁকে এই পথে নামতে বাধ্য করেছে। দীর্ঘদিন ধরে লাদাখের সাংবিধানিক সুরক্ষা, রাজ্য মর্যাদা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির দাবিতে যে আন্দোলন চলছে, তারই নতুন অধ্যায় এই অনশন। সংবাদ সংস্থা পিটিআই (PTI)-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ওয়াংচুক বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, আর কোনও দিন আন্দোলনে বসতে হবে না। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে আবার সেই জায়গায় নিয়ে এসেছে। আনন্দ নিয়ে আমি অনশন করছি না, এটা সহজও নয়। প্রয়োজনে মৃত্যুর মুখেও যেতে পারি, তবু পিছিয়ে আসব না।’ তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট যে, পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং আন্দোলনের পথ ছাড়ার কোনও ইচ্ছা তাঁর নেই।
লাদাখে গত কয়েক বছর ধরে চলা আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের (Sixth Schedule) আওতায় অন্তর্ভুক্তির দাবি। এই তফসিল অনুযায়ী, নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনজাতিদের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। লাদাখের বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি, জমি এবং পরিচয় রক্ষা করা সম্ভব হবে। ওয়াংচুকের বক্তব্যে উঠে এসেছে আলোচনার প্রক্রিয়া নিয়ে হতাশার কথাও। তিনি জানান, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লাদাখ আন্দোলনের সময় জাতীয় নিরাপত্তা আইনে (NSA) তাঁকে আটক করা হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পান। এই সময়ে এবং মুক্তির পর কেন্দ্রের সঙ্গে কয়েকটি বৈঠক হলেও, তা থেকে প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। তিনি বলেন, ‘৪ ফেব্রুয়ারি যখন আমি জেলে ছিলাম, তখন একটি বৈঠক হয়েছিল, কিন্তু তা কার্যত সফল হয়নি। ২২ মে মুক্তির পর আর একটি বৈঠক হয়। তখন আমার অনেক আশা ছিল। বলা হয়েছিল, বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করতেই আমাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং আলোচনা চলবে।’ কিন্তু সেই আশার পরিণতি কী হয়েছে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
ওয়াংচুকের অভিযোগ, ২২ মে-র বৈঠক থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত মিললেও, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি। তাঁর কথায়, ‘ওই বৈঠক এগিয়ে যাওয়ার একটা সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তগুলো লিখিত আকারে দিতে অনীহা দেখানো হচ্ছে। এক পা এগিয়ে আবার দুই পা পিছিয়ে যাওয়ায় মানুষের আস্থা কমে গিয়েছে।’ এই পরিস্থিতিতে অনশনকে তিনি একপ্রকার ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেই দেখছেন। তাঁর আশা, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আবারও আলোচনার পথ খুলবে এবং কেন্দ্র বিষয়টির গুরুত্ব বুঝবে। যদিও তিনি বারবার বলেছেন, তিনি এখনও সংলাপের পক্ষপাতী এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানই চান।
লাদাখের আন্দোলন এখন শুধু একটি আঞ্চলিক দাবি নয়, বরং তা জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। পরিবেশগত ভারসাম্য, স্থানীয় অধিকার এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রশ্নে এই আন্দোলন নতুন করে ভাবনার দরজা খুলেছে। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলের মতো সংবেদনশীল এলাকায় উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। জন্তর মন্তরে ওয়াংচুকের অনশন শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সমাজের নানা স্তরের মানুষ, পরিবেশকর্মী ও ছাত্র সংগঠন এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। যদিও কেন্দ্রের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া মেলেনি, তবুও পরিস্থিতি যে দ্রুত রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
লাদাখের সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছে, দীর্ঘদিন ধরে তাদের দাবিগুলি উপেক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার পর প্রশাসনিক ক্ষমতা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা এখনও মেটেনি। এই প্রেক্ষাপটে ওয়াংচুকের অনশন সেই অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে এই আন্দোলন কোন পথে এগোবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে কেন্দ্রের প্রতিক্রিয়ার উপর। আলোচনা ফের শুরু হবে কি না, কিংবা কোনও বাস্তবসম্মত সমাধানের রূপরেখা তৈরি হবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আপাতত জন্তর মন্তরের মঞ্চে বসে সোনম ওয়াংচুক তাঁর অবস্থানে অনড়, আর সেই বার্তাই পৌঁছে যাচ্ছে দেশজুড়ে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ritabrata Camp to Approach Election Commission Claiming Real TMC | Bengal Political Crisis | ‘আমরাই আসল তৃণমূল’ : প্রমাণ হাতে নিয়ে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হতে প্রস্তুত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির




