শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দুর্গাপুজোর আলো ধীরে ধীরে নিভছে, মণ্ডপ থেকে বিদায়ের পথে দেবী দুর্গা। ঢাকের আওয়াজে মিশে যাচ্ছে বিসর্জনের বিষাদ, আর বাঙালির মনে জমছে আগামী বছরের অপেক্ষা। কিন্তু শুভ বিজয়া (Shubho Bijoya) কী শুধুই প্রতিমা বিসর্জনের দিন? বাঙালির সামাজিক জীবনে এই দিনটির তাৎপর্য আরও গভীর। বিজয়ার শুভেচ্ছা, বড়দের প্রণাম, ছোটদের আশীর্বাদ, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাতায়াত, বন্ধুদের সঙ্গে কোলাকুলি আর মিষ্টিমুখ এসবের মধ্য দিয়েই উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সম্পর্কের পরিসরে। তাই দেবীর বিদায়বেলায় মন খারাপ থাকলেও শুভ বিজয়া হয়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব কমিয়ে আনার আন্তরিক উপলক্ষ্য। সারা বছর ব্যস্ততার চাপে অনেক সম্পর্কেই যেন জমে ওঠে অবহেলার ধুলো ময়লা। কাজের চাপ, সংসারের দায়িত্ব, পড়াশোনা কিংবা কর্মসূত্রে দূরে থাকার কারণে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়ে ওঠে না। একই শহরে থেকেও অনেক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হয় না মাসের পর মাস। বন্ধুত্বের সম্পর্কেও কখনও জমে থাকে অভিমান, কখনও জমে ওঠে অকারণ দূরত্ব। শুভ বিজয়ার দিন সেই চেনা সম্পর্কগুলির দিকে নতুন করে ফিরে তাকানোর সুযোগ এনে দেয়। একটি ফোন, একটি শুভেচ্ছাবার্তা, একটি প্রণাম কিংবা সামান্য মিষ্টির বাক্স অনেক দিন ধরে জমে থাকা দূরত্ব কমানোর উপলক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। বাঙালির ঘরে শুভ বিজয়া মানেই বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার রীতি। ছোটদের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেন বড়রা। পরিবারের মধ্যে এই আদানপ্রদানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্নেহ, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের অনুভূতি।

বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার ধরন বদলেছে, পরিবারের সদস্যদের বসবাসের জায়গাও ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন শহর ও দেশে। অনেকের পক্ষেই বিজয়ার দিনে সরাসরি প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছনো সম্ভব হয় না।

তবু ফোনে কিংবা ভিডিও কলে প্রণাম ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখার চেষ্টা চলে। প্রযুক্তি বদলেছে, যোগাযোগের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু আপনজনের কাছ থেকে আশীর্বাদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা একই রয়ে গিয়েছে। শুভ বিজয়ার আর একটি বড় আকর্ষণ মিষ্টিমুখ। সন্দেশ, রসগোল্লা, লাড্ডু কিংবা বাড়িতে তৈরি নানা পদ দিয়ে অতিথি আপ্যায়নের রীতি বহু বাঙালি পরিবারে এখনও সমান জনপ্রিয়। আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া, প্রতিবেশীর হাতে মিষ্টির বাক্স তুলে দেওয়া কিংবা বহু দিন পর বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে একসঙ্গে বসে গল্প করা ইত্যাদি এসব ছোট ছোট মুহূর্তেই তৈরি হয় উৎসবের স্মৃতি। কারও বাড়িতে জমে ওঠে আড্ডা, কোথাও পুরনো দিনের গল্পে ফিরে আসে শৈশব, আবার কোথাও নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচিত হয় পরিবারের দূরের আত্মীয়রা। পুজোর ক’দিন মণ্ডপে ঘোরার আনন্দের বাইরে বিজয়ার এই ঘরোয়া পরিসরও বাঙালির উৎসবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আরও পড়ুন : Durga Puja 2026, Shubho Bijoya | শুভ বিজয়া ২০২৬: বঙ্গে বিষাদের সুর, আবার অপেক্ষা আগামী বছরের
শুধু পরিবার কিংবা আত্মীয়স্বজন না। প্রতিবেশীদের সঙ্গেও সৌহার্দ্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে বিজয়া। পাড়ার পুজোয় যাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন, যাঁরা রাত জেগে মণ্ডপ সামলেছেন, যাঁরা দর্শনার্থীদের সাহায্য করেছেন, তাঁদের মধ্যে উৎসবের সূত্রে তৈরি হয় এক ধরনের সামাজিক বন্ধন। বিজয়ার শুভেচ্ছা সেই বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে পারে। প্রতিদিনের জীবনে পাশের বাড়ির মানুষের সঙ্গে হয়তো খুব বেশি কথা হয় না, অথচ পুজোর সময় একই মণ্ডপে দাঁড়িয়ে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হয়। বিজয়ার দিনে সেই পরিচিত মুখগুলির সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় পাড়ার সম্পর্ককে নতুন করে উষ্ণ করে তোলে। শুভ বিজয়ার আনন্দের পাশে কিছু মানুষের নিঃসঙ্গতাও থেকে যায়। যাঁদের পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকেন, যাঁরা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন কিংবা যাঁদের জীবনে ব্যক্তিগত নানা সংকট রয়েছে, তাঁদের কাছে উৎসবের এই দিনটি কখনও কখনও আরও বেশি আবেগের হয়ে ওঠে। চারদিকে যখন শুভেচ্ছা বিনিময় ও মিষ্টিমুখের আয়োজন, তখন কারও কারও মনে পড়ে যায় অনুপস্থিত আপনজনের কথা। যাঁরা একসময় বিজয়ার দিনে বাড়িতে অতিথি আপ্যায়ন করতেন, তাঁদের অনুপস্থিতি পরিবারের কাছে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। তাই শুভ বিজয়ার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু আনন্দের আয়োজনেই না। অন্যের অনুভূতি বোঝার মধ্যেও রয়েছে। কারও খোঁজ নেওয়া, নিঃসঙ্গ মানুষের পাশে কিছুটা সময় কাটানো কিংবা বিপদে থাকা পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোও বিজয়ার শুভেচ্ছাকে অর্থবহ করে তুলতে পারে।

এই দিনটি তাই সামাজিক সৌজন্যের পাশাপাশি মানবিকতারও পরীক্ষা। শুধু পরিচিত মানুষকে শুভেচ্ছা জানানো নয়, যাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ দিন কথা হয়নি তাঁদের খোঁজ নেওয়া, পুরনো অভিমান ভুলে কথা শুরু করা কিংবা প্রয়োজনের সময়ে কারও পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তও হতে পারে বিজয়ার প্রাপ্তি। সব সম্পর্ক আগের জায়গায় ফিরে আসবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। তবু আন্তরিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অনেক সময় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। উৎসবের আবেগ ক্ষণস্থায়ী হলেও সেই আবেগ থেকে জন্ম নেওয়া ভালো আচরণ এবং যত্নের অভ্যাস দীর্ঘ দিন টিকে থাকতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা এখন বড় জায়গা করে নিয়েছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে ছবি, বার্তা ও শুভেচ্ছা ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে। দূরে থাকা বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ক্ষেত্রে এই মাধ্যমগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে একসঙ্গে অসংখ্য শুভেচ্ছা পাঠানোর ভিড়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগের গুরুত্ব যেন হারিয়ে না যায়। কাছের মানুষের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলা, তাঁর খবর শোনা কিংবা মন দিয়ে তাঁর কথা শোনার মূল্য অনেক সময় আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছার চেয়েও বেশি। বিজয়ার আসল আবেগ ধরা পড়ে সেই আন্তরিকতায়, যা কোনও সাজানো ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

আরও পড়ুন : Shubho Bijoya 2025, Bijoya Dashami 2025 | শুভ বিজয়া দশমী ২০২৫: মিলন, মিষ্টি আর আবেগের উৎসব
দুর্গাপুজো বাঙালিকে কয়েক দিনের জন্য ব্যস্ততা থেকে দূরে এনে আনন্দের পরিসরে নিয়ে যায়। কিন্তু উৎসবের শেষ দিনে সেই আনন্দকে কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে বহন করা হবে, সেটিও ভাবার বিষয়। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর সঙ্গে সৌজন্য, পরিবারের সদস্যদের প্রতি যত্ন, প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং পুরনো সম্পর্কগুলির খোঁজ রাখা—এসবের মধ্য দিয়েই উৎসবের মূল্য দৈনন্দিন জীবনে ছড়িয়ে পড়ে। দেবী দুর্গার বিদায়ের পর মণ্ডপ ফাঁকা হয়ে যেতে পারে, আলো খুলে নেওয়া হতে পারে, ঢাকিরা ফিরে যেতে পারেন নিজেদের গন্তব্যে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উষ্ণতা যদি থেকে যায়, তা হলে উৎসবের আনন্দও শেষ হয়ে যায় না। আজকে শুভ বিজয়া। দেবীর বিদায়ের আবেগের মধ্যেই তাই নতুন করে আপন হওয়ার আহ্বান। প্রণাম, আশীর্বাদ, কোলাকুলি আর মিষ্টিমুখের ঐতিহ্য ধরে রেখে সম্পর্কের যত্ন নেওয়ার অঙ্গীকার হোক এই দিনের অন্যতম প্রাপ্তি। আগামী বছর আবার দুর্গাপুজো আসবে, আবার মণ্ডপ সাজবে, আবার বাজবে ঢাক। কিন্তু তার আগেই মানুষের জীবনে ফিরে আসুক আন্তরিক যোগাযোগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পাশে থাকার মানসিকতা। কারণ শুভ বিজয়ার সবচেয়ে সুন্দর উপহার শুধু মিষ্টির বাক্স নয়, শুধু শুভেচ্ছার কয়েকটি শব্দও না। তার সবচেয়ে বড় উপহার হল, দূরে সরে যাওয়া মানুষগুলিকে আবার কাছে টেনে নেওয়ার একটি সুযোগ।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rashmika Mandanna on MS Subbulakshmi biopic | সুব্বুলক্ষ্মীর চরিত্রে রশ্মিকা, প্রথম দিনেই আবেগে আপ্লুত! বললেন, ‘যেন ঈশ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি’



