সম্পাদকীয় -এর বদলে…
আত্মবিশ্বাস কখনওই ভেঙে পড়ে না, কিন্তু অতিরঞ্জিত আত্মবিশ্বাস তাসের ঘরের মতন ভেঙে পড়ে।
প্রেম এমনি এক আত্মবিশ্বাস।

🍂মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
শ্রীভগবান শঙ্কর পার্ব্বতীকে বলেছিলেন— হিমালয় ও বিন্ধ্যগিরির মধ্যস্থিত জনগণ ভাগবত, তন্মধ্যে যাঁরা রাম নাম উচ্চারণ করেন তাঁরা ভাগবতোত্তম।
হে রাজন! “রাম” এই নাম কীর্ত্তনে সমস্ত রোগ নিবারণ হয় এবং মহা মহা পাপের প্রায়শ্চিত্ত, কেবল তাই নয়, দেহধারিগণের মুক্তিদায়ক।

কথাটা কি হল?
একজন বহুবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে অনন্যভাবে রামনাম আশ্রয় করলে নাম তার রোগ দূর করে দিলেন; কেবল রোগ নয়,রোগের কারণ যে পাপ তা নষ্ট করলেন। শুধু তাই নয় পাপের মূল যে অবিদ্যা— “আমি দেহ” এই বোধ পর্য্যন্ত রাখলেন না। সেই নিষ্পাপ ভক্ত আলোর রাজ্যে গিয়ে পড়লেন, আমি দেহ নই, আত্মা ব্রহ্ম— এ জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হল; তারপর সেই ব্রহ্মভূত প্রসন্নাত্মা ব্যক্তি পরাভক্তি লাভ করলেন।
কেবল রাম রাম করলেই হবে— একথা বহুবার জিজ্ঞাসা করেছি; আবার বলছি— রাম রাম করলেই শ্রীভগবানকে পাবো?
শ্রীভগবান তোমায় বুকে করে রাখবেন। এ পাওয়ায় যাওয়া নেই, এ পাওয়া একেবারে আত্মার আত্মারূপে জড় চেতন সবরূপে পাওয়া।
একবার রামনামে কোটি ব্রহ্মহত্যা হরে।
তিনবার রামনাম বলালি তাহারে॥
মোর পুত্র হয়ে তোর অজ্ঞান বিশাল।
দূর হরে বামদেব হবিরে চণ্ডাল॥
এই রাম নাম হয় সর্ব্বসাধ্য সার।
দাস সীতারাম তুই বল অনিবার॥
শ্রীরাম জয় রাম জয় জয় রাম।
শ্রীরাম জয় রাম জয় জয় রাম॥
শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী
ফিরেপড়া | কবিতা
শঙ্খ ঘোষ -এর একটি কবিতা

সন্ধ্যানদীজল
দুহাত তোমার স্রোতে, সাক্ষী থাকো, সন্ধ্যানদীজল।
এমন দর্পণদিনে বহু মঠ পেরিয়ে পেরিয়ে
তোমার দুঃখের পাশে বসে আছি এই ভোরবেলা।
আরো যারা এ-মুহূর্তে নেই হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে
আমার শরীর ঘিরে এমন সম্পূর্ণ যবনিকা—
তাদের সবার শ্বাস দুহাতে অঞ্জলি দিয়ে আজ
এইখানে বসে ভাবি আমার সম্বল স্থির থাকা।
আমার সম্বল শুধু ঝুমকোঘেরা মঠ অবিকল
আমার নদীর নাম সন্ধ্যানদী, তুমি তার জল।
🍂গদ্য
এখানে ‘বিদিশার নিশা’ বা ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’ বলতে কবি ঐতিহাসিকভাবে বা ভৌগোলিক ভাবে ঠিক কী বুঝিয়েছেন, তা না জানলেও একজন পাঠকের অসুবিধা হয় না। ওই ‘অন্ধকার’, ‘নিশা’ এবং ‘কারুকার্য’ শব্দগুলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে এক প্রাচীন, রহস্যময় এবং রোমান্টিক আবহ তৈরি হয়। পাঠক অর্থের গভীরে না গিয়েও সেই রহস্যময় নারীর সৌন্দর্য অনুভব করতে পারেন।
কবিতা বুঝতে না পারার মধ্যেও কবিতার ভালোলাগা বিরাজ করে
তৈমুর খান
কবিতা সবসময় বোঝার নয়, বাজারও। ভালো কবিতার ভালোলাগা থাকে, অনেক সময় সমালোচনা করা যায় না। এসব কথা আমরা হামেশাই শুনতে পাই। ভালোলাগার আবার ব্যাখ্যা কী! উপলব্ধির আবার ভাষা কী! ধ্বনির আবার অনুবাদ কী! সুতরাং সৌন্দর্যের যেমন মুগ্ধতা আছে তেমনি ভালোলাগারও শিহরন আছে। এসব ভাষাহীন এক রকমের পুলকিত নীরবতায় তা সর্বদা এক আবহ সৃষ্টি করে চলে।এই কথাটি সাহিত্য সমালোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ। আধুনিক ইংরেজি কবিতার জনক টি.এস. এলিয়ট (T.S. Eliot) -এর একটি বিখ্যাত উক্তির ভাবানুবাদ এটি: “Genuine poetry can communicate before it is understood.” অর্থাৎ সত্যিকারের কবিতা বোঝা যাওয়ার আগেই পাঠককে স্পর্শ করতে পারে। বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশ বা বিনয় মজুমদারের মতো কবিদের ক্ষেত্রে এই কথাটি ধ্রুব সত্য। এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা করি।
যুক্তির বিচারে কোথাও কি বারোমাস বৃষ্টি পড়া সম্ভব? বা মেঘ কি গাভীর মতো ঘাস খেতে পারে? সবুজ নালী ঘাস কি পরাঙ্মুখ হতে পারে দুয়ার চেপে ধরে? অবনীই বা কে? লজিক খুঁজলে এর উত্তর মিলবে না। কিন্তু কবিতাটি পড়ার সময় পাঠকের মনে এক গভীর একাকিত্ব এবং বিষাদের সুর বেজে ওঠে। দরজায় কড়া নেড়ে কেউ যেন নিজের অস্তিত্বের খোঁজ নিচ্ছে- এই হাহাকারটুকু বোঝার জন্য পুরো কবিতার প্রতিটি শব্দের আভিধানিক অর্থ বোঝার প্রয়োজন হয় না।
কবিতা কেন না বুঝেও আনন্দ পাওয়া যায়?
কবিতা কেবল বুদ্ধির বা মস্তিষ্কের বিষয় নয়, এটি অনুভূতির বিষয়। কবিতার আনন্দ পাওয়ার জন্য সবসময় ‘মানে’ বোঝার দরকার হয় না, এর কতগুলি কারণ আছে : যেমন—
১) শব্দের সঙ্গীত : কবিতার শব্দের চয়ন এবং ছন্দের একটি নিজস্ব সুর থাকে। গানের ভাষা না বুঝেও যেমন আমরা সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ হই, কবিতার ক্ষেত্রেও শব্দের ধ্বনি (Soundscape) আমাদের অবচেতন মনে দোলা দেয়।
২) চিত্রকল্প বা ইমেজের শক্তি: কবিরা অনেক সময় লজিক বা যুক্তি দিয়ে কথা বলেন না, তাঁরা ছবি আঁকেন। সেই ছবি বা ‘ইমেজ’ আমাদের মনের ভেতর এক অদ্ভুত আবহাওয়া তৈরি করে।
৩) অবচেতন মনের সংযোগ: কিছু কবিতা আমাদের যুক্তিবাদী মনকে (Conscious mind) পাশ কাটিয়ে সরাসরি আমাদের অবচেতনে (Subconscious) আঘাত করে। ফলে আমরা কারণ না জেনেই বিষণ্ণ বা আনন্দিত হই।
উদাহরণসহ বিশ্লেষণ: যেমন —
বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য বাংলা সাহিত্যের দুজন বিখ্যাত কবির উদাহরণ নেওয়া যাক, যাঁদের কবিতা সব সময় ‘বোঝা’ যায় না, কিন্তু ‘অনুভব’ করা যায়।
১) জীবনানন্দ দাশ
জীবনানন্দ দাশকে বলা হয় ‘নির্জনতম কবি’। তাঁর অনেক কবিতার লাইন লজিক দিয়ে বোঝা কঠিন, কিন্তু পড়ার পর এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা তৈরি হয়। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় তিনি লিখেছেন :
”চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য…”
বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, এখানে ‘বিদিশার নিশা’ বা ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’ বলতে কবি ঐতিহাসিকভাবে বা ভৌগোলিক ভাবে ঠিক কী বুঝিয়েছেন, তা না জানলেও একজন পাঠকের অসুবিধা হয় না। ওই ‘অন্ধকার’, ‘নিশা’ এবং ‘কারুকার্য’ শব্দগুলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে এক প্রাচীন, রহস্যময় এবং রোমান্টিক আবহ তৈরি হয়। পাঠক অর্থের গভীরে না গিয়েও সেই রহস্যময় নারীর সৌন্দর্য অনুভব করতে পারেন।
কবিতা যে সবসময় ‘কাটাছেঁড়া’ বা ‘সমালোচনা’ (Criticism) করার বিষয় নয়, বরং কেবল ‘অনুভব’ করার বিষয়- এটা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। জীবনানন্দ দাশের আর একটি বিখ্যাত এবং ছোট কবিতা ‘হায় চিল’-কে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাক। এই কবিতাটি যুক্তিবাদী মন দিয়ে বিচার করতে গেলে অনেক প্রশ্ন জাগবে, কিন্তু অনুভব করতে গেলে এক গভীর বিষাদে মন ভরে যাবে।
হায় চিল —
“হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে!
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!”
যদি এই কবিতার ‘সমালোচনা’ বা ‘ময়নাতদন্ত’ করি তবে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। যদি একজন কঠোর সমালোচক বা যুক্তিবাদী পাঠক এই কবিতাটি পড়েন, তিনি নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলো তুলতে পারেন এবং হতাশ হতে পারেন:
যুক্তি ১: চিল কি সত্যিই কাঁদে? চিলের ডাককে ‘কান্না’ বলা কি জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সঠিক?
যুক্তি ২: চিলের ডাকের সঙ্গে ‘বেতের ফলের মতো ম্লান চোখ’-এর সম্পর্ক কী? বেত ফল তো এক ধরনের ফল, তার সঙ্গে চোখের তুলনা কেন?
যুক্তি ৩: সেই নারীটি কে? ‘পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যা’ বলতে কবি ঠিক কোন ঐতিহাসিক চরিত্র বা কাকে বুঝিয়েছেন? তিনি কোথায় চলে গেছেন?
আসল ফলাফলে কেউ যদি এই কবিতার প্রতিটি লাইনের আক্ষরিক অর্থ বা লজিক খুঁজতে যান, তবে তিনি বলবেন, “এই কবিতার কোনো মাথামুণ্ডু নেই, অস্পষ্ট সব উপমা।” সমালোচনার টেবিলে এই কবিতা অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে কারণ এতে কোনো নির্দিষ্ট ‘গল্প’ বা ‘তথ্য’ নেই।
কেন কবিতাটি ‘না বুঝেও’ অসামান্য? অনুভবের ব্যাখ্যায় তা ধরা পড়বে। কবিতাটি পড়ার সময় পাঠক যখন লজিক বা সমালোচনা সরিয়ে রাখেন, তখন তিনি এক আশ্চর্য জগতে প্রবেশ করেন। এখানে অর্থ বোঝা জরুরি নয়, যা জরুরি তা হল:
ভিজু্যয়াল এবং অডিটরি এফেক্ট (Visual & Auditory Effect): ‘ভিজে মেঘের দুপুর’- এই তিনটি শব্দ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের মনে একটি স্যাঁতসেঁতে, মেঘলা, অলস দুপুরের ছবি ভেসে ওঠে। চিলের তীক্ষ্ণ ডাক সেই নির্জন দুপুরে এক হাহাকার তৈরি করে। এখানে বোঝার কিছু নেই, পুরোটাই অনুভবের।
অদ্ভূত উপমা (The Abstract Imagery): ‘বেতের ফলের মতো ম্লান চোখ’ -এর অর্থ অভিধানে পাওয়া যাবে না। কিন্তু পাঠক অবচেতনভাবে অনুভব করেন এমন এক চোখ, যা হয়তো অসুস্থ, ক্লান্ত, বা মৃত্যুর আগের নিস্তেজ চাহনি। বেত ফলের ফ্যাকাশে রঙের সঙ্গে চোখের মণির এই তুলনা পাঠককে এক ধরনের ‘বিষণ্ণ সৌন্দর্য’ উপহার দেয়।
স্মৃতি ও বেদনা (Nostalgia & Pain): কবিতার শেষ লাইন: “কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!” এটি সর্বকালের এক অমোঘ সত্য। এখানে কবি নির্দিষ্ট কোনো নারীর কথা বলছেন না। চিলের ডাকের মতো কোনো একটি সামান্য ঘটনা আমাদের মনে পুরনো কোনো হারানোর ব্যথা জাগিয়ে তোলে। পাঠক তখন আর কবির প্রেমিকার কথা ভাবেন না, তিনি নিজের জীবনের কোনো হারানো মানুষের কথা ভেবে ব্যথিত হন।
সুতরাং এই কবিতাটি প্রমাণ করে যে, কবিতা সব সময় ‘মস্তিষ্ক’ (Intellect) দিয়ে বিচার করার জিনিস নয়। এই কবিতাটি সমালোচনার ঊর্ধ্বে, কারণ এর আবেদন ‘স্নায়ু’ (Nerves) এবং ‘হৃদয়ে’। যেমন সুন্দর একটি ফুলকে ছিঁড়ে পাপড়ি আলাদা করে গবেষণা করলে (সমালোচনা) তার গঠন বোঝা যায়, কিন্তু সৌন্দর্যটা নষ্ট হয়ে যায়-
তেমনি জীবনানন্দের এই কবিতাটির অর্থ খুঁজতে গেলে এর জাদু নষ্ট হয়ে যায়। এটি কেবল চুপচাপ পড়ে সেই ‘ভিজে মেঘের দুপুরের’ বিষাদটুকু গায়ে মাখার জন্য সৃষ্টি হয়েছে।
২) শক্তি চট্টোপাধ্যায়
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘অবনী বাড়ি আছো?’ এর কথা ধরা যাক।
”বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে–
‘অবনী বাড়ি আছো?’’
যুক্তির বিচারে কোথাও কি বারোমাস বৃষ্টি পড়া সম্ভব? বা মেঘ কি গাভীর মতো ঘাস খেতে পারে? সবুজ নালী ঘাস কি পরাঙ্মুখ হতে পারে দুয়ার চেপে ধরে? অবনীই বা কে? লজিক খুঁজলে এর উত্তর মিলবে না। কিন্তু কবিতাটি পড়ার সময় পাঠকের মনে এক গভীর একাকিত্ব এবং বিষাদের সুর বেজে ওঠে। দরজায় কড়া নেড়ে কেউ যেন নিজের অস্তিত্বের খোঁজ নিচ্ছে- এই হাহাকারটুকু বোঝার জন্য পুরো কবিতার প্রতিটি শব্দের আভিধানিক অর্থ বোঝার প্রয়োজন হয় না।
৩) সুকুমার রায় (ননসেন্স রাইম)
সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হল সুকুমার রায়ের “আবোল তাবোল”
”সাঁঝের বেলায় জলার তলে
কালকে যারা আমায় বলে
করত রে ভাই চিম্নি-চালি,
আজকে তারা দিচ্ছে গালি!”
‘হুকোমুখো হ্যাংলা’ বা ‘কুমড়োপটাশ’-এর অস্তিত্ব বাস্তবে নেই, এবং তাদের কার্যকলাপের কোনো বৈজ্ঞানিক অর্থও নেই। কিন্তু এই ছড়া পড়ার সময় যে অদ্ভুত রিদম বা ছন্দ তৈরি হয়, তাতেই আমরা আনন্দ পাই। এখানে ‘অর্থ’ গৌণ, ‘ধ্বনি’ এবং ‘মজা’টাই মুখ্য।
কবিতার কাজ সবসময় কোনো তথ্য দেওয়া নয়, বরং একটি ‘মুড’ (Mood) বা মেজাজ তৈরি করা। যখন কোনো কবিতা পড়ে আপনার মনে হয়— “জানি না কী আছে এতে, কিন্তু মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গেল বা ভালো লাগল”—তখনই বুঝতে হবে কবিতাটি সার্থক। অর্থ বা ‘মানে’ হলো হাড়ের কাঠামোর মতো, আর আনন্দ বা ‘রস’ হলো রক্তের মতো; হাড় না দেখেও যেমন মানুষের সৌন্দর্য বোঝা যায়, তেমনি অর্থ না বুঝেও কবিতার সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব।🍁
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়
বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
১৮
আবার সকাল হয়
ফল প্রকাশের দিন আসলে কোনও নির্দিষ্ট সকাল দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় অনেক আগে থেকে, কখনও কয়েক সপ্তাহ আগে, কখনও কয়েক মাস আগে, আবার কখনও বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা একধরনের অদৃশ্য অপেক্ষা থেকে, যে অপেক্ষা মানুষের ঘুম কাড়ে, খাওয়ার স্বাদ নষ্ট করে, কথাবার্তাকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলে।
এই অনুভূতিটা- না রাগ, না কান্না, শুধু একধরনের শূন্যতা, যেটা নতুন করে আর অবাক করে না। মা দূর থেকে জিজ্ঞেস করল, কী হল? হিরণ্য বলল, পরে দেখব। এই ‘পরে’ শব্দটা তার জীবনের আশ্রয় হয়ে গেছে। পরে হবে, পরে ভাবব, পরে ঠিক হবে, এই পরে’র মধ্যে সে নিজেকে লুকিয়ে রাখে, যেন এখনই স্বীকার না করতে হয় যে আবারও হয়নি। বাবা কিছু বলল না।
হিরণ্য সেই রাতেও ঠিক ঘুমোতে পারেনি, যদিও শরীর বিছানায় শুয়ে ছিল এবং চোখ মাঝেমধ্যে বন্ধ হচ্ছিল, কিন্তু মন কোথাও থিতু হচ্ছিল না। জানালার বাইরে কুয়াশা জমে ছিল, রাস্তায় আলো কম, কুকুরের ডাকও যেন দূরে সরে গিয়েছে, অথচ ঘরের ভেতর তার মাথার মধ্যে শব্দের কোনও অভাব ছিল না। এই সময়গুলোতে হিরণ্যর মনে হয়, রাত আসলে ঘুমানোর জন্য নয়, রাত তৈরি হয় ভাবার জন্য, মনে রাখার জন্য, নিজেকে প্রশ্ন করার জন্য। প্রশ্নগুলো নতুন নয়, এইবার কী হবে, এইবার কি শেষ হবে এই অনিশ্চয়তা, এইবার কী বাবার চোখে একটু স্বস্তি দেখা যাবে, এইবার কী মায়ের গলায় সেই অদৃশ্য কাঁপনটা কমবে। ভোরের দিকে সে বুঝতে পারল দরজার কাছে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কোনও শব্দ নেই, শুধু একটা উপস্থিতি, একটা নিশ্বাসের ছায়া। মা। মায়েরা এমনভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে, যেন ডাক দিলে ছেলের ভেতরে আরও ভয় ঢুকে পড়বে, তাই তারা শব্দ ব্যবহার করে না। হিরণ্য চোখ বন্ধ রেখেই জানত মা তাকিয়ে আছে, দেখছে সে জেগে আছে কিনা, আবার জেগে থাকাটাও যেন আজ অপরাধ। কিছুক্ষণ পরে মা বলল, উঠছিস? এই একটা শব্দের মধ্যে কত কথা লুকিয়ে থাকে, হিরণ্য তা ভালো করেই জানে। আজ ফল বেরোবে, আজ আবার হয়তো হবে না, আজ আবার সংসারের ভিতরে চাপা নীরবতা নামবে। সব কথাই ওই এক শব্দে লুকিয়ে ছিল। হিরণ্য উঠে বসল, আয়নার দিকে তাকাল না, কারণ আয়নায় তাকালে আজকাল তার মনে হয় আয়নাটা তাকে আর চিনতে পারছে না। আগে আয়নায় যে মুখটা দেখা যেত, তার সঙ্গে এখনকার মুখটার মিল কম। চুল একটু বেশি এলোমেলো, চোখের নিচে কালি, আর ভেতরে একটা স্থায়ী ক্লান্তি। চা হাতে নিয়ে সে বারান্দায় দাঁড়াল। পাড়ার রাস্তায় লোকজন বেরোচ্ছে, কেউ কাজে যাচ্ছে, কেউ দোকান খুলছে, কেউ বাস ধরার জন্য দৌড়চ্ছে। এই দৃশ্যগুলো প্রতিদিনের, অথচ আজ সেগুলো হিরণ্যর কাছে অন্যরকম লাগছিল, যেন সবাই কোথাও পৌঁছতে পারছে, শুধু সে দাঁড়িয়ে আছে। তার জীবনের গতি যেন থমকে গেছে কোনও অদৃশ্য সিগন্যালে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সে ওয়েবসাইট খুলল। সরকারি ওয়েবসাইটের এই ধীর লোডিং হিরণ্য বহুবার দেখেছে, তবু প্রতিবার মনে হয় এই দেরিটুকু ইচ্ছাকৃত, যেন ফলাফল দেখার আগেই মানুষটা একটু ভেঙে পড়ে। লগইন, রিফ্রেশ, আবার অপেক্ষা। শরীর বুঝে যায় কী হতে চলেছে, মনও আন্দাজ করে, তবু চোখ স্ক্রিন ছাড়ে না। ঘরের ভিতরে বাবা খবরের কাগজ খুলে বসে ছিল। কাগজের পাতাগুলো উল্টাচ্ছিল না, শুধু ধরে রেখেছিল। বাবার এই চুপ করে থাকা হিরণ্যর কাছে সবচেয়ে ভারী। বাবা কথা বললে হয়তো রাগ করত, হতাশা দেখাত, কিন্তু এই নীরবতার মধ্যে কোনও অভিযোগ নেই, আছে কেবল দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর নিজেকে দোষী ভাবার একরকম চেষ্টা, যেন ছেলের ব্যর্থতার দায় সে নিজেই বহন করছে। স্ক্রিনে তালিকা খুলল। হিরণ্য নাম খুঁজল। একবার, দু’বার, আবার। নাম নেই। এই মুহূর্তে তার বুকের ভিতর কিছু ভাঙল না, বরং একটা পরিচিত ফাঁকা জায়গা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে জানে, এই অনুভূতিটা- না রাগ, না কান্না, শুধু একধরনের শূন্যতা, যেটা নতুন করে আর অবাক করে না। মা দূর থেকে জিজ্ঞেস করল, কী হল? হিরণ্য বলল, পরে দেখব। এই ‘পরে’ শব্দটা তার জীবনের আশ্রয় হয়ে গেছে। পরে হবে, পরে ভাবব, পরে ঠিক হবে, এই পরে’র মধ্যে সে নিজেকে লুকিয়ে রাখে, যেন এখনই স্বীকার না করতে হয় যে আবারও হয়নি। বাবা কিছু বলল না। বাবা প্রশ্ন করে না, কারণ প্রশ্ন মানেই উত্তর, আর উত্তর মানেই নিজের ভেতরের ক্ষতকে আরেকবার খোঁচানো। দুপুর গড়িয়ে গেল। ঘরের ভেতর শব্দ কম, কথা কম, কিন্তু আসলে শব্দ কম নয়, শব্দগুলো শুধু উচ্চারিত হচ্ছে না। সেগুলো জমে থাকছে আলমারির ভিতরে রাখা সার্টিফিকেটের সঙ্গে, পরীক্ষার ফর্মের কাগজের স্তূপে, দেয়ালের ফাটলে। বিকেলে হিরণ্য বাইরে বেরোল। কোথাও যাওয়ার দরকার ছিল না, তবু সে হাঁটল স্টেশনের দিকে। স্টেশন তার কাছে এমন একটা জায়গা, যেখানে মানুষ আসতে পারে, আবার চলে যেতে পারে, যেখানে দাঁড়িয়ে থাকাও একটা বৈধ কাজ। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সে ট্রেন আসা-যাওয়া দেখল। একটা ট্রেন ছেড়ে গেল, আরেকটা ঢুকল। জীবনের মতোই। তার ফোনে বন্ধুদের ছবি ভেসে উঠল, কেউ নতুন অফিসে, কেউ বিয়ের প্যান্ডেলে, কেউ বিদেশের কোনও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে। হিরণ্য স্ক্রল করল, কোনও মন্তব্য করল না, কোনও প্রতিক্রিয়া দিল না। রাতে বাড়ি ফিরে এসে খেতে বসল। খাবারের স্বাদ সে আলাদা করে টের পেল না। বাবার ঘরে আলো জ্বলছিল। বাবা এখনও জেগে। হয়তো হিসাব করছে সংসারের, ছেলের বয়সের, নিজের অসহায়তার। হিরণ্য নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। দরজা বন্ধ করা তার কাছে একটা নিরাপত্তা, এখানে সে ব্যর্থ হতে পারে, এখানে সে দুর্বল হতে পারে। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই দিনের বেলা জমে থাকা শব্দগুলো একে একে জেগে উঠল। বলা না-কথা, গিলে ফেলা অপমান, অপ্রকাশিত ভয়—সব মিলিয়ে রাত্রিটা ভারী হয়ে উঠল। হিরণ্য জানে না এই রাত্রির শেষ কোথায়, সে শুধু জানে তার জীবনে এখন দিন কম, রাত্রি বেশি, আর এই রাত্রিগুলোয় শব্দেরা কথা বলে। এই কারণেই তার জীবনে শব্দদের রাত্রি হয়।🍁 (চলবে)
🍂কবিতা
মৈথিলী ঠাকুর -এর একটি কবিতা

ওই ঔজ্জ্বল্য
এই যে আলো, সূর্যের ডানা মেলে উড়ে যাওয়া?
না কোনও অচেনা স্বপ্নের ভিতরে ঘুম ভাঙা
মানুষের প্রথম নির্ভরতা?
পথে-ধুলোয় পড়ে থাকে কত নামহীন দিন,
তবু সন্ধ্যার বাতাসে গন্ধ হয়ে ফেরে কিছু…
হারানো চিঠির মতো মেঘেরা ভাসে বুকে—
কে যেন দূর থেকে ডাকে, ফিরে এসো ভাষা।
আমরা সবাই
চলেছি অদৃশ্য নদীর স্রোতে
কেউ জানি না মোহনার ঠিকানা কোথায়!
বুকের ভিতর লুকিয়ে রাখি ছোট্ট প্রদীপ
অন্ধকারে জ্বালার প্রত্যাশায়।
ভালবাসা শব্দ নয়, নিঃশব্দে ছুঁয়ে যায় মন।
যেমন শরতের ফুল জানে না নিজের সৌন্দর্য
তবু সে সাজায় প্রান্তর, অকারণ, অনুক্ষণ।
যদি কোনওদিন পথ হারিয়ে ফেলো একবার তাকিও
তারারা আজও পুরনো গল্প বলে
মানুষ এখনও স্বপ্ন দেখে বেঁচে থাকার জন্যই।
অশোক কুমার রায় -এর একটি কবিতা

পিছুটান
ছুঁতে গিয়েও ছুতে পারি না
যদিও আমি বয়স ভেঙে ভেঙে
মজে যাওয়া নদীর কাছাকাছি
মৃদু স্রোতের দৈন্য দশায়।
তবুও সেখানেই দাঁড়িয়ে কার নিঃশ্বাস অনুভব করি।
ভেসে ওঠে চোখের গভীরে এক অষ্টাদশী
উপহার পাঠায় জেগে উঠতে
নতুন অঙ্কুরোদগমে।
চমকে উঠি
ওই তো সেই
ও তো আমারই।
অমনি ক্লান্ত জীবনে জেগে উঠে
জবরদস্ত তেজি ঘোড়া।
যেন ছুটে গিয়ে বলি তাকে
আবার শুরু করি বাল্যের রান্না পার্টি খেলা।
হিন্দোল ভট্টাচার্য -এর একটি কবিতা

সময়
সময় থামে না কখনও
রেখে যায় ছায়া
পুরনো বিকেলের রোদে
আজও লেগে থাকে কারো মায়া
হাতে ধরা মুহূর্তগুলো
বালির মতো ঝরে যায় ধীরে
আমরা শুধু স্মৃতির প্রদীপ জ্বালি
অন্ধকার নীল নীড়ে
কত কথা বলা হয়নি কখনও
কত স্বপ্ন ঘুমিয়ে আছে অজানায়
তবু হৃদয় প্রতিদিন নতুন করে শেখে
ভাঙার ভিতর গড়ার উপাখ্যান
যে চলে যায় সে কি সত্যিই যায়
সে তো থেকে যায় বাতাসের ভাঁজে
হয়ত কোনও চেনা সুর হয়ে
নিঃশব্দ রাতের পাশে
জীবন অন্তহীন যাত্রার ডাক
হারিয়ে গিয়েও মানুষ খুঁজে পায়
নিজের ভেতরে লুকনো আকাশ
বৃন্দাবন দাস -এর একটি কবিতা

সংবিধান
কেউ আলাদা হয়ে থাক
কেউ আলাদা হয়ে যাক
কেউ আলাদা আলাদা ব্যাপার
আলাদা কাঁটা গাছ
আলাদা বাবলা গাছ
আলাদা ফনিমনসা
আলাদা গোলাপ
আলাদা বললেই ‘আলাদা: হয় না
আলাদা কিছু রাখাও নেই
এটাই আমাদের সংবিধান
ভুল উচ্চারণে কেউ কেউ
‘আলাদা’ হতে চায়
তার জন্য ক্ষমা তুলে রাখি—
গোলাম কবির -এর দু’টি কবিতা

সকাল দেখা হয় না বহুদিন
বহুদিন ভাল না আছে মন,
না আছে শরীর আর না আছে
দেশ ও দেশের মানুষ!
ভালো থাকা হারিয়ে গেছে
সেই কবেই,
যা এখন আর মনেও পড়েনা!
মাঝেমধ্যে মনেহয় হয়তোবা ভালো ছিলাম
শিউলি শৈশবের সরলতা মাখানো
দিনগুলোতে আবার কখনো মনেহয়
স্কুলজীবন শেষ করে সদ্য যুবক হয়ে ওঠার
দিনগুলোই ছিলো জীবনের শ্রেষ্ঠতম দিন!
তারপর এলো সেই ভাল থাকার
স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন ভাঙার দিনগুলো!
প্রতিদিনই জীবন যুদ্ধে
জয়ী হবার প্রাণান্তকর ব্যর্থ চেষ্টা!
এখন শরীর ও হৃদয়ে বাস করে ঘুণপোকা,
কুরে কুরে খায় শরীর ও মন!
কতোদিন যে সকাল দেখা হয় না
আজ আর মনেও পড়ে না!
দ্যাখো তো, শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া
নদীটার মতোই শীর্ণতার হাহাকার নিয়ে
শহরটাও কী ঘুমিয়ে গেছে নাকি
আমার মতো সারারাত
জেগে থেকে ঘুমের অভিনয় করে!
এখন কবিতার শব্দগুলো মৃত মাছির মতো
পড়ে থাকে, কবিতা লেখা হয়ে ওঠে না!
এখন আমার কেবলই রাত হয়ে যায়!
একাকী দীর্ঘ রাত নেমে আসে জীবন জুড়ে,
সকাল দেখা হয় না তাই বহুদিন!

অলীক আশার ছলনায়
তুমিহীন বেদনার নীল জ্যোৎস্নারাতে
ভেসে যাচ্ছি সমুদয় বিরহের পাহাড় সমেত!
হাত, পা থেকে সমস্ত শরীর বিষণ্ণতায় অবশ!
মননের গভীরে নিওলিথ যুগের
শ্যাওলা পড়া পাথরের মূর্তির মতো
তবুও দাঁড়িয়ে আছো
সেই কবে থেকে
যা আজ অব্দি
মনে করতে পারিনি স্মৃতিশক্তির দৈন্যতায়!
নিজের মনকে নিজেই বোঝাতে
ব্যর্থ চেষ্টা করে যাই তবু,
অলীক আশার ছলনায় ভুলে
তবুও আশা করি
একদিন বেদনার পাহাড়
ভেঙে খান খান হয়ে যাবে,
সেদিন হয়তো তুমি সামনে দাঁড়াবে
একগুচ্ছ লালগোলাপ হাতে নিয়ে এবং বলবে,
“ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি!”
তারক মণ্ডল -এর একটি কবিতা

একলা জীবন
আমি একা থাকতে ভালবাসি, তাই বলে এটা নয় যে, আমি সবার সঙ্গে মিশতে পারি না
সময় ছিল কখনও আমি থাকলে তাদের হাসির অভাব হতো না, আর আজ আমি ঘরে বসে শত চোখের জল ফেললেও একবার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। তাই বলে আমি তাদের বেঈমান বলব না বা বেঈমান বলে অপমান করব না। সময় এর ঘড়িটা অনেকটাই এগিয়ে গেছে যারা স্কুল যাবার পথে ডাক দিত আজ তাদের দেখাও মেলে না…
সবাই আজ তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যস্ত এটা ঠিকই কিন্তু একটা ছিল যখন আমাদের নিজেদের মধ্যে কোনও Secret ছিল না, কোনও ব্যক্তিগত জীবন ছিল না। তাই এত টাও বড় হয়ে যেওনা যাতে নিজের শৈশব টা হারিয়ে ফেলো।
তাই জীবন এমন কিছু মানুষ রেখো যাদের কাছে তুমি তোমার ওই শৈশবের জীবন টা ফিরে পাও।
এলিনা হোসেন -এর একটি কবিতা

পথিক ও নৈঃশব্দ্য
নিঃশব্দ এই পথ, হেঁটে যায় পথিক।
তার পায়ের শব্দ নেই
চোখে তার লেগে থাকে
হাজার বছরের নির্ঘুম প্রহর।
পথিক খোঁজে না করতালি
খোঁজে না নামের আলো…
শুধু বুক থেকে এক মুঠো নীল তুলে নেয়
যেন কী জককালো!
সঙ্গী তার শুধু সেতারের তান
আর শুকনো পাতার মর্মর…
কখনও নদীর ধারে বসে
মানুষ তাকে চেনে না সময় তাকে রাখে না হিসেবের খাতায়
তবু তার ফেলে যাওয়া পদচিহ্ন পথ হয়ে দাঁড়ায়।
কেউ কেউ নীরবে স্বপ্ন বোনে তাদের কণ্ঠে থাকে ডাক…
প্রিয়াংকা নিয়োগী সনি -এর একটি কবিতা

ভালবাসা ও দয়া
ভালবাসা আছে বলেই প্রকৃতির রং গাঢ় লাগে,
প্রকৃতি উপলব্ধিতে মনের রং প্রাণবন্ত হয় উন্নীত গগনে,
উচ্ছলতা ঝলসায় নতুন পথ যুক্ত হয় চেনা পথে,
ঐন্দ্রিলা নীল তরঙ্গে আসে স্বপন বায়ু বেশে,
উড়িয়ে নেয় এক আবেগী সোনালী রাজ্যে,
যেখানে নির্ভরতা সবকিছু শুধু ভালবাসার টানে।
শক্তি সে তো ভালবাসা,আবেগ সে তো দয়া ও মায়ার টানে,
সবটুকু জড়িয়ে খেয়ালে বিমগ্ন যত্নের সবটুকু আছে,
উড়াল বাতাসে দিগন্ত ছোটে শিশির মেঘে উজ্জ্বল বাড়ে।
ভালবাসা ও দয়া জীবন গতিতে সত্য যা বাধ্য হুইটম্যানের প্রথম নীতিতে,
বাস্তব আছে বলেই ভালোবাসার রস বোধ আছে,
ভাললাগা আছে বলেই ভালবাসা অনুকরণের আনুষঙ্গিকতাতে,
ছন্দ রুপ বিষয়বস্তু ভাষা সবকিছুই থাকে জীবনের তালিমে।
মানুষ মানুষের জন্যে এই নীতি জীবনকে তরান্বিত করে,
আমেরিকান গৃহ যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন অসুস্থ আহত সৈনিকদের সেবাতে,
দয়া ও ভালবাসা অন্য মানুষের প্রতি মনুষ্যত্বের পরিচয় রাখে।
বাস্তবতাবাদ ও মানবতাবাদের ধারা বহে তার লেখনিতে।
মানবিকতা আসে মন সুন্দর থেকে যা জনদরদী কাজ করে।
ভালবাসা পারে শক্তিশালী করে এগিয়ে নিয়ে যেতে,
দয়া পারে একজন সুন্দর মানুষে পরিণত করতে,
জীবন সুস্থ সুন্দর পথে অগ্রসর এর জন্যে ক্ষমা,দয়া,শান্তি ও ভালবাসা জরুরী মনে ফুল ফুটতে।
ভালবাসা যেখানে,দয়া ও মায়া সেখানে।
ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হল সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী
সুনয়না দি
৪.
—মনে হচ্ছে যেন আমরা স্বামী স্ত্রী নই আমি অন্য কারোর বউকে বাইকে চাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। পবিত্র তিথিকে কথাটি বলল।
—কেন হঠাৎ এরকম কথা বলছ?
—তাইতো যেমন লজ্জা পাচ্ছ, তোমাকে একদিন বলেছি না বাইকে চাপলে তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে বসবে এটা আমি গাড়ি চালানোর এক্সট্রা এনার্জি পাই।
—ধেততেরি আমার প্যারা লাগে।
—কেন প্যারা লাগে কেন আমি তোমাকে প্যারা লাগার মতো কোনো কথা বললাম।
—দেখো ফোন বাজছে ।
সেদিন দু’জনে দুলেছিনু বনে…
বাব্বা তুমি আবার এরকম —রোমান্টিক গান লাগালে কবে?
তিথি বুবুনের কপালে একটা আদর চিহ্ন এঁকে দিল। খুব আদর করল ঘুমন্ত ছেলেকে। একবার ছেলে মায়ের দিকে তাকিয়ে মাম মাম বলে জড়িয়ে ধরল।
এক নিমিষে তিথির সমস্ত ক্লান্তি যেন কর্পূরের মত মতো উবে গেল। একেই বলে মাতৃত্ব। একেই বলে নারী জীবনের পূর্ণতা। সত্যি বুবুন না থাকলে যেন, তিথির নারীত্ব কানায় কানায় পূর্ণ হতো না। ওরে বাবা ওদিকে আমার শ্বেতাম্বরী ও তো আদর করে কত আদর করে।
ভগবান সব সময় ওকে ভাল রেখ।
—তুমি আমার পকেট থেকে ফোনটা তোলো মেলা বকিও না
—না বাবা, কে না কে ফোন করেছে! বলা যায় তোমার গার্লফ্রেন্ডও তো ফোন করতে পারে?
—এইবার আমার প্যারা লাগছে, এত গা জ্বলানো কথা বলো না। আমার গার্লফ্রেন্ড তো আমার সাথেই আছে।
—তাই না?
—তাই তাই। নাও ফোনটা তোলো।
ওই দেখো বাড়ি থেকে ফোন করছে।
—ধরো, ধরো ফোনটা।
—হ্যাঁ ,বাবা বলো
—তোরা কত দূর।
—এই তো দিগনগর এসে পৌঁছেছি।
—এখন দিগনগর, তোরা এসে খাবি না? তো একদিনও কি আসলে একটু সকাল সকাল আসতে পারিস না ।
—ওকে জিজ্ঞেস করো।
—আজকে থাকবে তো
বাবা, কি বলছে মা।
—তোর মা বলছে তোরা থাকবি কিনা?
—খেপেছ নাকি বুবুন রয়েছে বাড়িতে।
—আচ্ছা, বাবা ফোনটা রাখছি।
—ঠিক আছে সাবধানে আসিস।
আবার ফোন বাজছে।
—এবার বোধহয় তোমার ফোন বাজছে।
—কি জানি বাবা আবার কি হল?
ধরতে ধরতে ফোনটা কেটে গেল।
আবার কি হল কে জানে!
—আরে তুমি ফোনটা ঘুরিয়ে করো।
—হ্যাঁ গো করছি। ওরে বাপরে এত জোরে কেউ ব্রেক করে
এক্ষুনি পড়ে যেতাম। ভাল হতো, —তোমাকে তখন থেকে বলেছি ধরে বসতে।
—চুপ করো, চুপ করো রিং হচ্ছে।
—হ্যালো।
—হ্যাঁ বৌমা।
—কি হয়েছে মাসি?
—আরে গ্যাসওয়ালা এসেছে গ্যাস দিতে…
—সমস্যা কি গ্যাসটা নিয়ে নাও।
—আরে না তোমাদের যে গ্যাস দেয় সেই লোক কিন্তু নয়, অন্য লোক।
—আলী দা নয়!
—না।
—তাহলে কি করব?
—আরে দেখ না গ্যাসের গাড়ি আছে কিনা সাথে।
—আচ্ছা আচ্ছা দেখছি। হ্যাঁ আছে।
—তাহলে আর সমস্যা কি, নিয়ে নাও।
—আচ্ছা ঠিক আছে।
—বুবুন ঠিক আছে।।
—হ্যাঁ।
—আচ্ছা তুমি রাখ ফোন।
—ওমা, তুমি বাড়ি বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন?
—কখন থেকে এসে দাঁড়িয়ে আছে তোর মা তোরা আসবি বলে।
—এত দেরি করে আসলে বাবা আবার তো এক্ষুনি বলবে যাই যাই।
—আমার চা টা দিন।
—চলো চলো দিই।
—তবে এখন চা খাবে কেন ভাত খাও।
—চা তে অরুচি নেই।
—বেশ বেশ আমার দাদুভাই কোথায় ওকে আনলে না কেন?
—ও মা এত দূরের রাস্তা।
—চলো চলো ভেতরে চলো।
—সরস্বতী খাবারটা দে তো, দু’জনকে।
—হ্যাঁ মাসি, আমি রেডি করেই রেখেছি, বসতে বলো।
—ভাল আছিস সরস্বতী?
—হ্যাঁ, ভাল আছি। তুই ভাল আছিস।
—এখন বসতে পারব না।
—মায়ের শরীর কেমন আছে রে? মা তো সবসময় বলে ঠিক আছি।
—না গো দিদি, মাসির শরীর খুব খারাপ।
—ক’দিন থেকে যাওনা।
—কি করে থাকব বল নতুন কাজের মেয়েটা ঢুকবে ওই মাসি থাকবে না আমার খুব অসুবিধে হবে তুই আছিস তো মায়ের দেখাশোনা করিস।
—হ্যাঁ সে তো আছি তা হলেও তুমি তো মেয়ে। তোমরা আসবে বলে কি খুশি যেন মনে হচ্ছে কোন রোগ বালাই নেই।
—মা কোথায় গেল রে?
—বাথরুমে গেছে মনে হয়।
—ওমা চলো না ক’দিন আমার বাড়িতে গিয়ে থাকবে।
—হ্যাঁ চলুন ক’দিন আমাদের বাড়িতে গেলে জায়গাও বদল হবে। ভালই লাগবে।
—না না তোমার শ্বশুরমশাই একা দোকান সামলে অসুবিধা হবে।
—দেখতো বাবা কেমন হয়েছে রান্না!
—ও দিদি তোমরা আসবে বলে আর জামাইবাবু মাসির হাতে রান্না ভালবাসে বলে নিজে রান্না করেছে গো। পারে না তবুও আমাকে রান্না করতে দিল না।
—কেন করতে গেলে মা? শরীর খারাপ নিয়ে।
—ছাড় আমার শরীর আর ঠিক হবে না তাই বলে আর আমি জামাইকে রান্না করে খাওয়াব না নাকি!
—আপনার মেয়েকে রান্না করা শেখান। এটা কি শাক রান্না করেছেন কি টেস্টি হয়েছে। —ছোলার শাক মাছের মাথা দিয়ে। আর ডালটাও কি টেস্টি হয়েছে ।
—বাড়িতে ডাল করলেই বলে ইউরিক অ্যাসিড আর দেখো এখানে ডাল চেয়ে খাচ্ছে।
—এরকম রান্না করো, তাহলে নিশ্চয়ই খাব ।
—ওরে,বেগুন ভাজাটা দে।
—হ্যাঁ, গরম ভেজে দিচ্ছি। এই যে গরম বেগুনভাজা।
—মাংসটা কেমন হয়েছে বাবা।
—অনবদ্য, অপূর্ব।
—ছোট মাছের চচ্চড়িটা খেলে না?
—ওরে সরস্বতী ছোট মাছের চচ্চড়ি দিস নি?
—ভুলে গেছি মাসি, দিচ্ছি, দিচ্ছি।
—কোনটা ছেড়ে কোনটা খাব! আপনার এখানে আসলে না আমি দ্বিগুণ খেয়ে ফেলি।
—খাও বাবা এখন খাবে না তো কোন বয়সে গিয়ে খাবে?
—ও বাবা তোমরা চলো না।
—দিদি তোমার ফোন বাজছে।
—ধর তো সরস্বতী।
—হ্যালো…
—বৌমা বুবুনের গাটা গরম, জ্বর এসেছে বোধহয়।
—কেমন ঘ্যান ঘ্যান করছে। আর বারবার বলছে মাম মাম যাবো।
—কি কাণ্ড দেখো একটা দিনও আসার উপায় নেই এরমধ্যে জ্বর এসে গেল। মাসি, তুমি অর্ণবদার কাছে নিয়ে যাও।
—আচ্ছা, আচ্ছা যাচ্ছি।
—আমি তাড়াতাড়ি ফিরছি।
ওমা, বেশিক্ষণ বসতে পারব না, শুনলে তো।
—অনেক কথা ছিল রে।
—ঠিক আছে আমি অন্য একদিন আসব, ফোনে বলতে পারবে না।
—সব কথা কি ফোনে বলা যায়?
—আচ্ছা ঠিক আছে। খেয়ে উঠে তো কিছুক্ষণ গল্প করা হল।
—সরস্বতী চাটা দিয়ে দে।
—হ্যাঁ এই তো এনেছি প্লেটটা নিন জামাইবাবু।
—ও এইটা আমার স্পেশাল প্লেট ওই যে আপনার বড় বড় বিস্কিট চায়ের দোকানের বিস্কিট পছন্দ করেন সেটা মাসি আনিয়ে রেখেছে।
—দেখো তিথি, এইটুকু সেবা যত্ন যদি তুমি আমার জন্য করতে।
—ঠিক আছে ওমা তোমার ডায়াবেটিস আছে বলে তোমার জন্য দেখো একটা ডায়াবেটিক পাউডার এনেছি প্রোটিন পাউডার ওটা খাবে কিন্তু রোজ। আর এইখানে তোমার আর বাবার জামাকাপড় আছে।
—কেন এত সব আনতে গেছিস কত জামা কাপড় রয়েছে ।
—তাতে কি হয়েছে এগুলো শীতের পোশাক, কত ঠাণ্ডা পরেছে বলতো।
—-আমার না টেনশন হচ্ছে মাসি কাল থেকে আসবে না নতুন কাজের মেয়ে কি যে হবে। ঠিক আছে। সব ভালই হবে অত চিন্তা করিস না।
—আচ্ছা মা আসছি।
—থাক আর প্রণাম করতে হবে না দু’জনেই ভাল থেক।
—সরস্বতী মায়ের সাথে যাবি। আর শোন মা-বাবা দু’জনেরই দেখা শোনা করিস ভাল করে। কোনও অসুবিধে হলে আমাকে জানাস।
—ঠিক আছে দিদি, চিন্তা করো না তো আমি আছি তো।
—সেটাই তো আমাদের ভরসা। —এখন দু’জনারই বয়স হয়েছে বুঝতে পারছিস।
—গাড়ি স্টার্ট করলো পবিত্র রাস্তায় বেরিয়ে চিন্তা হচ্ছে বুবুনটার জন্য। এইতো প্রায় এসেই গেছি।
—কলিং বেল টিপছি মাসি সাড়া দিচ্ছে না কেন গো? ওরা কি ফেরেনি নাকি না বাইরে থেকে তো তালাও দেওয়া নেই।
—ওই দেখো এতক্ষণ পর দরজা খুলছে।
—ও মাসি কি হয়েছে এত দেরি করলে দরজা খুলতে।
—আরে আমি একটু বাথরুমে ছিলাম, সবে বাবুসোনা একটু ঘুমিয়েছে।
—অর্ণব দা কি বলল?
—হ্যাঁ ওষুধ দিয়েছে তো, খাইয়েও দিয়েছি।।
—আচ্ছা বৌমা তোমার বাবা- মা ঠিক আছেন তো? বাবা ওই আছে, মায়ের তো শরীরটা ভাল নেই। তারই মধ্যে যেটুকু ভাল।
—আচ্ছা তাহলে আমি আসি বৌমা। কালকে তাহলে সুনয়না আসছে আগামীকাল থেকে আমি আসছি না। আমি এক জায়গায় যাব।
—ঠিক আছে মাসি ফিরলে আমার সঙ্গে দেখা করো, সাবধানে যেও, খেয়েছ তো? খাবার নিয়েছো, হ্যাঁ নিয়েছি। আচ্ছা।
—দেখি ছেলেটা কি করছে।
—আহা ছেলেটা আমার ঘুমোচ্ছে গো। কি মুখটা দেখলেই যেন মনের ভেতরে আমার কত শান্তি হয়। সারাদিন ওকে দেখতে পাইনি। মনটা কেমন হু হু করছিল।
—তিথি বুবুনের কপালে একটা আদর চিহ্ন এঁকে দিল। খুব আদর করল ঘুমন্ত ছেলেকে। একবার ছেলে মায়ের দিকে তাকিয়ে মাম মাম বলে জড়িয়ে ধরল।
এক নিমিষে তিথির সমস্ত ক্লান্তি যেন কর্পূরের মত মতো উবে গেল। একেই বলে মাতৃত্ব। একেই বলে নারী জীবনের পূর্ণতা। সত্যি বুবুন না থাকলে যেন, তিথির নারীত্ব কানায় কানায় পূর্ণ হতো না। ওরে বাবা ওদিকে আমার শ্বেতাম্বরী ও তো আদর করে কত আদর করে।
ভগবান সব সময় ওকে ভাল রেখ।
—রাত সাড়ে বারোটা বাজে বোনকে কিছু খাইয়ে দেব, এই তো ঘুম থেকে উঠেছে বাবা কেমন আছো বাবা।
বুবুন তিথিকে জড়িয়ে ধরে।বুবুনকে কোলে নিয়েই রান্নাঘরে গিয়ে দুধটা গরম করে আনে। দুধের ভেতরে একটু হলুদ ফেলে দিয়ে ছেলেকে খাইয়ে দিল। তারপর ছেলের পাশে শুয়ে পড়ল। এক ঘুমে সকাল। ছেলেও সেরকম কোনও অসুবিধে করেনি। কিন্তু একি এখনও সুনয়না কাজে আসলো না। সাতটা বাজে। সাড়ে ছটায় কাজে আসার কথা। প্রথম দিনেই লেট, আদপে আসবে তো।
—শোনো নতুন কাজের লোকের ভরসায় বসে থেক না তোমার কাজ শুরু করে দাও।
—হ্যাঁ বুবুন, আর শ্বেতাম্বরীর দুধ টা গরম করে খাইয়ে দিই, তারপর তোমার চা’টা দিচ্ছি। মনে হচ্ছে আসবে না ঘরের কাজগুলো আস্তে আস্তে করতে শুরু করি। সত্যি প্রথমেই কেমন মেয়েটার প্রতি একটা বিরক্তি জন্মে গেল দেখো।
—এসব মেয়েরা ভালোহবে? তুমি তো রাখলে কাজে।
—ওভাবে বলো না কাগজি মাসি কি–সে কি ভাল না?
—মাসির সঙ্গে তুলনা ক’রো না।
তিথি তোমার ফোন বাজছে।
—হ্যালো।
—দিদি আমি সুনয়না বলছি।
—হ্যাঁ বলো।
—আজকে কাজে যাচ্ছি না। কাল থেকে যাব।
—তুমি এখন জানাচ্ছ।
—ঠিক আছে রাখছি।
—হ্যাঁ গো, কথাবার্তাও ঠিক ঠিকানা নেই দেখো।
—কেমন যেন আমার লাগছে মেয়েটাকে, দেখা যাক কি হয়।
তিথি কাজ করতে করতে মনে পড়ল মায়ের মুখটা। তিথিরা যখন বেরিয়ে আসছে তখন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল অসময়ে শ্রাবণের ঘনঘটা আকাশ যেন বুক ফেটে তার সমস্ত কষ্ট বৃষ্টির আকারে ছড়িয়ে দিতে চাইছে। 🍁 (ক্রমশঃ)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়





