সংবেদন শীল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, আহমেদাবাদ : ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তনের কথা অনেক আছে, কিন্তু কিছু কথা আলাদা হয়ে থাকে আবেগ, সংগ্রাম এবং বিশ্বাসের জন্য। ভারতীয় দলের উইকেটকিপার-ব্যাটার সঞ্জু স্যামসন (Sanju Samson) -এর সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ সাফল্যের গল্পটাও ঠিক তেমনই। দু’বছর আগে ভারতের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হয়েও মাঠে নামার সুযোগ পাননি সঞ্জু। সেই অপূর্ণতা নিয়েই মনে মনে একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন নিজের পারফরম্যান্সে দেশকে বিশ্বকাপ জেতানোর। অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পেল। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অসাধারণ ব্যাটিং করে তিনি ‘টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার’ নির্বাচিত হয়েছেন। ফাইনাল ম্যাচের শেষে পুরস্কার গ্রহণের সময় আবেগঘন মুহূর্তে সঞ্জু স্যামসন বলেন, ‘আজ সত্যিই আমার স্বপ্নপূরণ হয়েছে। এই মুহূর্তটার কথা আমি প্রথম ভাবতে শুরু করি দু’বছর আগে। তখন আমি বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ ছিলাম, কিন্তু একটাও ম্যাচ খেলার সুযোগ পাইনি। সেদিন রাতে মনে মনে ঠিক করেছিলাম, একদিন সুযোগ পেলে নিজের পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপ জেতাতে চাই।’
২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য ছিলেন সঞ্জু। সেই সময় তিনি দলের সঙ্গে ট্রফি জিতলেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি। ফলে ব্যক্তিগতভাবে সেই সাফল্যের আনন্দ যেন পূর্ণ হয়নি। সঞ্জুর কথায়, ‘মেডেল পেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু ভেতরে একটা শূন্যতা ছিল। মনে হচ্ছিল, আমি মাঠে নেমে দলের জন্য কিছু করতে পারিনি।’ কিন্তু সময় বদলাতে বেশি দেরি হয়নি। এবারের বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়ে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করেছেন তিনি। মাত্র পাঁচটি ম্যাচ খেলেই ৩২১ রান করে প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক হন সঞ্জু স্যামসন। শুধু রানই নয়, পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ছক্কা মারার রেকর্ডও তাঁর ঝুলিতে, পুরো টুর্নামেন্টে মোট ২৪টি ছক্কা হাঁকিয়েছেন। বিশেষ করে শেষ তিনটি ম্যাচে তাঁর ব্যাট যেন আগুন ঝরিয়েছে। সেই ম্যাচগুলিতে তিনি যথাক্রমে ৯৭, ৮৯ এবং ৮৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই তাঁকে টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটারের সম্মান এনে দেয়।
সঞ্জুর এই সাফল্যের পথ মোটেই সহজ ছিল না। বিশ্বকাপের আগে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজ়ে সুযোগ পেলেও উল্লেখযোগ্য রান করতে পারেননি। ফলে অনেকেই মনে করেছিলেন, বিশ্বকাপের প্রথম একাদশে তাঁর জায়গা পাওয়া কঠিন হবে। প্রথমদিকে সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছিল। দলের ওপেনিং জুটি হিসেবে সুযোগ পান অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma) এবং ঈশান কিশান (Ishan Kishan)। সঞ্জুকে বেঞ্চেই বসে থাকতে হয়। কিন্তু ক্রিকেটের অনিশ্চয়তাই তাকে আবার সুযোগ এনে দেয়। অভিষেক শর্মা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হওয়ায় দল নতুন বিকল্পের সন্ধান শুরু করে। সেই সময় ভারতীয় দলের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir) কৌশল বদলানোর সিদ্ধান্ত নেন। রিঙ্কু সিংহ (Rinku Singh) -এর পরিবর্তে দলে সুযোগ পান সঞ্জু স্যামসন। প্রথম সুযোগ আসে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে। যদিও সেই ম্যাচে বড় রান করতে পারেননি। কিন্তু নিজের ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন। এরপরের ম্যাচগুলোতেই দেখা যায় নতুন সঞ্জুকে।
সঞ্জু নিজেই স্বীকার করেছেন যে এই প্রত্যাবর্তন তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলির একটি ছিল। তিনি বলেন, ‘নিউ জিল্যান্ড সিরিজ়ের পর আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে গিয়েছে। বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে আবার শুরু করব।’ তবে সেই কঠিন সময়েই তিনি নিজের ভিতরে নতুন শক্তি খুঁজে পান। সঞ্জুর ভাষায়, ‘সম্ভবত ঈশ্বরের অন্য পরিকল্পনা ছিল। আবার সুযোগ পেলাম। তখন ঠিক করলাম, এবার আর সুযোগ নষ্ট করব না।’ এই প্রত্যাবর্তনের পথে দলের সতীর্থ এবং কোচিং স্টাফদের অবদানও তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ভারতের কিংবদন্তী ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকর (Sachin Tendulkar)-এর প্রতি। পুরস্কার নেওয়ার সময় সঞ্জু বলেন, ‘সচিন স্যরের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ ছিল। যখনই দলে জায়গা পাইনি বা বাইরে বসে থাকতে হয়েছে, তখন তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি। উনি আমাকে সবসময় মানসিকভাবে শক্ত থাকতে বলেছেন।’ তিনি আরও জানান, ফাইনালের আগের দিনও সচিন তেন্ডুলকর তাঁকে ফোন করেছিলেন। সঞ্জুর কথায়, ‘গতকালও স্যর ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন আমার মনের অবস্থা কেমন। উনি যেভাবে আমাকে সমর্থন করেছেন, সেটা ভাষায় বোঝানো কঠিন।’
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, সঞ্জু স্যামসনের এই পারফরম্যান্স ভারতীয় দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিং এবং আত্মবিশ্বাস পুরো দলের মানসিকতাকে বদলে দিয়েছে। আজকের দিনে সঞ্জু স্যামসনের কথাগুলি অনেক তরুণ ক্রিকেটারের কাছে প্রেরণা হয়ে উঠেছে। কারণ তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, সুযোগ না পেলেও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা উচিত নয়। পরিশ্রম এবং বিশ্বাস থাকলে একদিন সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sanju Samson 97 not out | সমাজমাধ্যমে কৃতজ্ঞতা, মাঠে দাপট : সঞ্জুর ৯৭*-এ উচ্ছ্বসিত ক্রিকেটমহল




