সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বুধবার রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) ফেসবুকে একটি বিস্ফোরক পোস্ট করেন। বাংলার শিক্ষা-ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর আক্ষেপের সুর আঘাত করেছে সাধারণ মানুষ, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক সবাইকে। তাঁর পোস্টের প্রথম লাইনেই ধরা পড়ে গভীর বেদনা, “বাংলার বুক থেকে যে আলোর স্রোত একদিন সমগ্র ভারতকে জ্ঞানের পথে নেতৃত্ব দিয়েছিল- আজ সেই আলো নিভে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ক্ষীণ কাঁপুনিতে জানিয়ে দিচ্ছে তার মৃত্যুসংবাদ।”
শমীক ভট্টাচার্য -এর এই বাক্য বলে দেয়, বাংলার শিক্ষার অবনমনকে তিনি কীভাবে দেখছেন। তাঁর মতে, এটা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটা বহু স্বপ্নভঙ্গের হাহাকার, বহু প্রজন্মের ভবিষ্যৎহানির লাল সঙ্কেত।একসময় যে বাংলা দেশকে পথ দেখাত, জ্ঞান ও প্রগতির আলোয় সাজিয়ে তুলত সমাজকে, আজ সেই বাংলার বুকেই তিনি দেখছেন অন্ধকারের ঘন মেঘ। তাঁর দাবি, স্বাধীনতার পর যে বাংলায় ছাত্র-শূন্য স্কুল ভাবা যায়নি, সেই বাংলাতেই আজ সবচেয়ে বেশি তালাবন্ধ বিরান বিদ্যালয়। সরকারি তথ্যে উঠে আসা এক ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরে তিনি লেখেন, মাত্র ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে রাজ্যের ৩,২৫৪টি স্কুলে একজনও ছাত্র নেই। শমীকের ভাষায়, “এটা কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়, এটা বাংলার শিক্ষা-সভ্যতার শেষ নিঃশ্বাস, শেষ আর্তনাদ।” একসময় ছাত্র-শিক্ষকের কোলাহলে ভরা বিদ্যালয়-প্রাঙ্গণ আজ পরিত্যক্ত অবকাঠামো আর শূন্যতার প্রতিধ্বনিমাত্র, এ কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৭০ সালে বাংলার ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত দেশজুড়ে ছিল প্রশংসিত ২৫:১। অথচ ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১:১ সংখ্যায়। জাতীয় গড় উন্নতির পথে থাকলেও পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে পড়ছে, এ অভিযোগ করেন শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অবহেলা, শিক্ষক নিয়োগে বেনজির দুর্নীতি, আদালত-পর্যায়ের মামলা, এবং ‘দলীয় দখলদারির সংস্কৃতি’ বাংলার শিক্ষাকে পর্যুদস্ত করেছে।শুধু স্কুল নয়, উচ্চশিক্ষাতেও একই ছবির প্রতিফলন তুলে ধরেছেন তিনি। যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (Calcutta University) একসময় এশিয়ার বুদ্ধিবৃত্তির রাজধানী বলে গর্ব করত, NIRF ২০২৪ র্যাঙ্কিংয়ে সেটি নেমে এসেছে ১৮তম স্থানে। একসময় বাংলায় জন্ম নিত দেশের ১২% গবেষক, আজ তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩% -এই পরিসংখ্যান সামনে এনে তিনি আক্ষেপ করেন, এটা পতন নয়, এটা মেধার উপর শোকের ছায়া।
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে তাঁর ক্ষোভ আরও তীব্র। বিভিন্ন মামলায় শিক্ষকরা আদালতে ধরনা দিচ্ছেন, অথচ ছাত্রছাত্রীরা ভবিষ্যতের সিঁড়ি খুঁজে পাচ্ছে না, এই অভিযোগও উঠে এসেছে তাঁর পোস্টে। তিনি লিখেছেন, “যে বাবা-মা সন্তানের স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের চোখে আজ আতঙ্ক। যে ছাত্র ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, সে আজ অন্ধকারে হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছে।” উল্লেখ্য, এভাবেই তিনি তুলে ধরেছেন বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় জমাট বাঁধা তীব্র যন্ত্রণা। যেখানে মেধা, গবেষণা, সৃজনশীলতার জায়গা দখল করেছে রাজনৈতিক স্বার্থ, অদক্ষতা এবং দুর্নীতির ছায়া।তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, বাংলা কি তার হারানো জ্ঞান-আলোক ফিরে পাবে? কত প্রজন্ম আর এই অস্থিরতার বলি হবে? শিক্ষাকে যারা ক্ষমতার হাতিয়ার বানিয়েছে, তারা কি কোনোদিন জবাব দেবে?তাঁর মতে, পরিবর্তনের দাবি জরুরি, এখনই এই মুহূর্তে। “বাংলা শিক্ষা চায়, দলীয় দখলদারি নয়। বাংলা চায়, উৎকর্ষতা ফিরে আসুক। নইলে যে বাংলা একদিন ছিল ভারতের আলোকবর্তিকা, সেই বাংলাই চিরতরে অন্ধকারের মানচিত্রে হারিয়ে যাবে।” এই সতর্কবার্তায় তিনি শেষ করেন তাঁর পোস্ট।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলার বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার এই করুণ ছবি তাঁর পোস্টে যেন বাস্তবের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে: দুর্নীতি, অচলাবস্থা, গবেষণার সংকট, ছাত্র-শিক্ষকের দূরত্ব, পরিত্যক্ত স্কুল ভবন এবং স্বপ্নহারা প্রজন্মের কষ্টই যেন উঠে আসে তাঁর কথায়। রাজনৈতিক মহলে এই পোস্ট আলোড়ন তুলেছে। অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে, বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে, নাকি আরও গভীর কোনও সংকট লুকিয়ে আছে পরিসংখ্যানের আড়ালে? তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) -এর সমালোচনা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যই নয়, তা সমাজের এক বৃহৎ অংশের দীর্ঘদিনের আক্রমণাত্মক বাস্তবেরই প্রতিফলন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Himanta Biswa Sharma statement | সংবিধান দিবসে বড়ো ভাষায় সংবিধান প্রকাশ: প্রধানমন্ত্রী মোদীর উদ্যোগে উচ্ছ্বাসে অসম, কৃতজ্ঞতা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা




