সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : চুঁচুড়া : শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব (Sitaramdas Onkarnath Dev) -এর স্নেহধন্যা শিষ্যা, লীলাপরিকর এবং তাঁর নির্দেশিত গুরুসেবার অন্যতম প্রধান বাহক কিঙ্করী যোগমায়া দেবী (Kinkori Jogomaya Devi) গত বুধবার ১৯ নভেম্বর বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে দেহত্যাগ করেছেন। বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। তাঁর চলে যাওয়ায় সারা বাংলা জুড়ে অসংখ্য সীতারাম ভক্ত ও সাধক-সাধিকার হৃদয়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বহুজনের মতে, এটা কেবল মৃত্যুসংবাদই নয়, তা ‘অধ্যাত্মসেবার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান।’
চুঁচুড়ার ‘জগন্নাথ নিবাস’, যেখানে যোগমায়া মা বিগত দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করছিলেন, সেটি শুধু একটি আশ্রম নয়, এটি ছিল শ্রীশ্রীওঙ্কারনাথদেবের (Onkarnath Dev) লীলাক্ষেত্র। সেই পবিত্র পরিবেশে থেকেই তিনি আজীবন পালন করে এসেছেন গুরুসেবা, দীক্ষাদান, নামপ্রচার, সতীসঙ্ঘ পরিচালনা এবং জগন্নাথের আরাধনার গুরুদায়িত্ব। এই নিবাসের প্রতিটি ইঁট যেন সাক্ষী তাঁর অবিরাম সেবা-সাধনার। উল্লেখ্য, শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেবের সান্নিধ্যে এসে যোগমায়া মা শুধু তাঁর শিষ্যাই হয়ে ওঠেননি, তিনি পেয়েছিলেন মন্ত্রদানের অধিকার। বহু ভক্ত স্মরণ করছেন, কীভাবে তাঁর কণ্ঠে ‘নাম’ উচ্চারণ অদ্ভুত শক্তি এনে দিত পরিবেশে। তাঁর মুখ থেকে বারবার উচ্চারিত হতো, “গুরুই পথ, গুরুই আশ্রয়, গুরুই পরম সত্তা।” এক ভক্ত বলেন, “মায়ের কাছে গেলে মনে হতো যেন আশ্রয় পেলাম। তাঁর আশীর্বাদ ছিল প্রকৃতির মতো, নিঃশব্দ, অথচ অপরিসীম শক্তিশালী।”
দীর্ঘ দশক ধরে যোগমায়া মা অসংখ্য মানুষকে দীক্ষা দিয়েছেন, তাঁদের আধ্যাত্মিক পথচলায় আলো দেখিয়েছেন। তাঁর জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সরল, সন্ন্যাসিনীসুলভ শৃঙ্খলিত, আর তাঁর কথাবার্তায় ছিল গভীর অনুপ্রেরণার শক্তি। চুঁচুড়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, যোগমায়া দেবী যেমন ছিলেন মাতৃসুলভ স্নেহময়ী, তেমনই ছিলেন আধ্যাত্মিক দৃঢ়তার প্রতীক। আশ্রমের এক প্রবীণ কর্মী বলেন, “ওনার উপস্থিতি মানেই ছিল শান্তির আবহ। আজ মনে হচ্ছে যেন আমাদের আশ্রয়ভূমির একটা স্তম্ভ ভেঙে গেল।” অনেক ভক্ত মনে করছেন, যোগমায়া মায়ের মহাপ্রয়াণ মানেই সীতারাম ভক্তবৃন্দের আধ্যাত্মিক পরিবারে এক নক্ষত্রপতন। কারণ তিনি শুধু গুরুসেবার ধারক ছিলেন না, ছিলেন গুরু, ভক্তির জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল গুরুবাণীর প্রতিফলন। একজন প্রবীণ সাধিকা চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “তিনি বলতেন, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সাধনা হলো সেবা। আজ তাঁর সেবা-প্রতিজ্ঞার পূর্ণচ্ছেদ হল।”
তাঁর দেহত্যাগ সীতারাম নামসংকীর্তন ও নামপ্রচার আন্দোলনের এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করল। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়েছেন বা আশ্রয় খুঁজেছেন, তাঁরা জানাচ্ছেন যোগমায়া মায়ের মতো সহজ-সরল অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্ব পাওয়া বিরল। চুঁচুড়ায় জগন্নাথ নিবাসে এখন গভীর শোকের পরিবেশ। ভক্তদের ভিড় থামছেই না। অনেকে নীরবে বসে শুধু স্মরণ করছেন, তার সেই স্নেহমাখা হাসি, তার হাতে রাখা নামমালা, কিংবা তাঁর সেই অটল উচ্চারণ, “নামই মুক্তির পথ।”
সাধন-ভক্তির আকাশে সত্যিই যেন একটি দীপশিখা নিভে গেল। কিঙ্করী যোগমায়া দেবীর মহাপ্রয়াণে শ্রীশ্রীঠাকুরের ভক্তসমাজে শুধুই শোক ও স্মৃতিবহুল আবেগের ঢেউ। তাঁর রেখে যাওয়া সেবা-সাধনার পথ আগামী প্রজন্মের জন্য আলো হয়ে থাকবে, এই বিশ্বাসই সকলের।
ছবি : সংগৃহীত




