সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গান্ধীনগর, ১৭ অক্টোবর: গুজরাতে ফের একবার রাজনৈতিক চিত্রপটে বড় পরিবর্তন। মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পটেল (Bhupendra Patel) নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার শুক্রবার একেবারে নতুন করে মন্ত্রিসভা সাজাল। বৃহস্পতিবারই ভূপেন্দ্র পটেল ছাড়া মন্ত্রিসভার সমস্ত সদস্যই পদত্যাগ করেছিলেন। সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন ছিল, গুজরাত বিজেপি এবার ২০২৭ সালের বিধানসভা ভোটের আগে বড়সড় কৌশলগত পরিবর্তন আনতে চলেছে। শুক্রবার দুপুরে গান্ধীনগরের রাজভবনে রাজ্যপাল আচার্য দেবরাটের (Acharya Devvrat) উপস্থিতিতে ২৫ জন বিধায়ক নতুন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের ক্রিকেট তারকা রবীন্দ্র জাডেজার (Ravindra Jadeja) স্ত্রী তথা জামনগর উত্তর কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক রিভাবা জাডেজা (Rivaba Jadeja)। নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে ১৯ জন একেবারে নতুন মুখ, আর আগের মন্ত্রিসভার ছয়জনকে রাখা হয়েছে তাঁদের পদে। এবারই প্রথমবারের মতো গুজরাতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হর্ষ সাঙ্ঘভি (Harsh Sanghavi) উপমুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলেন। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের পর এই প্রথম গুজরাতে আবার একজন উপমুখ্যমন্ত্রী পাওয়া গেল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, বরং নির্বাচনী কৌশলের অংশ। শুক্রবার সকালে মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পটেল রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগী মন্ত্রীদের ও হবু মন্ত্রীদের তালিকা জমা দেন। দলীয় সূত্রে খবর, এই পরিবর্তনটি আসন্ন ২০২৭ সালের নির্বাচনের আগে বিজেপির ‘ঘর গোছানোর’ পরিকল্পনারই অঙ্গ। বিজেপির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গুজরাত বিজেপির এই মন্ত্রিসভা পরিবর্তন একেবারে উচ্চপর্যায়ের পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)-এর পরামর্শেই এই নতুন মন্ত্রিসভার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, আগামী নির্বাচনে আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ সংগঠন তৈরি।”
বিজেপির ‘এক পদ, এক ব্যক্তি’ নীতি অনুসারে আগের মন্ত্রিসভার সদস্য এবং বর্তমান রাজ্য বিজেপি সভাপতি জগদীশ বিশ্বকর্মা (Jagdish Vishwakarma) নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। চলতি মাসের শুরুতেই তাঁকে সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলে, এই রদবদলের সঙ্গে সাংগঠনিক দিকও জোরদার হচ্ছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। গুজরাতের রাজনীতিতে মন্ত্রিসভার রদবদল নতুন কিছু নয়। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর রাজ্যের নেতৃত্বে আসেন আনন্দীবেন পটেল (Anandiben Patel)। কিন্তু ২০১৬ সালের আগস্টে ‘শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে’ তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়েন। এরপর বিজয় রূপাণী (Vijay Rupani) দায়িত্ব নেন এবং ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে কড়া লড়াইয়ে বিজেপিকে জয় এনে দেন। তবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনিও দলীয় নির্দেশে পদত্যাগ করেন। তাঁর জায়গায় প্রভাবশালী পটেল সম্প্রদায়ের ভূপেন্দ্র পটেলকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়। সেই সময়ও বিজেপি একইভাবে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করে এবং ২০২২ সালের নির্বাচনে বিপুল জয় পায়।

রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপির এই পুরনো কৌশল আবারও প্রয়োগ করা হচ্ছে, অর্থাৎ নির্বাচনের একদম আগেই প্রশাসনিক দল বদল করে নতুন মুখ ও সম্প্রদায়ভিত্তিক ভারসাম্য তৈরি করা। গুজরাতের নতুন মন্ত্রিসভায় এই সামাজিক সমীকরণ স্পষ্ট। মোট ২৫ জন মন্ত্রীর মধ্যে আট জন ওবিসি (OBC) সম্প্রদায়ের, ছয়জন পটিদার (Patidar) গোষ্ঠীর, চারজন আদিবাসী (Tribal), তিনজন তফসিলি জনজাতি (SC/ST) সম্প্রদায়ের। এছাড়া দুইজন ক্ষত্রিয় (Kshatriya), একজন ব্রাহ্মণ (Brahmin) ও একজন জৈন (Jain) সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি রয়েছেন। এই সামাজিক ভারসাম্যকে বিজেপির ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক হিসাব’ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্লেষক মিহির দাভে (Mihir Dave) বলেন, “বিজেপি গুজরাতে জানে, পটিদার ও ওবিসি ভোটব্যাঙ্কই মূল ভিত্তি। রিভাবা জাডেজার মতো জনপ্রিয় মুখকে অন্তর্ভুক্ত করে তাঁরা তরুণ ভোটারদের কাছেও পৌঁছাতে চাইছে।” গুজরাতের আইন অনুসারে ১৮২ আসনের বিধানসভায় সর্বাধিক ২৭ জন মন্ত্রী থাকতে পারেন। আগের মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন মাত্র ১৭ জন, মুখ্যমন্ত্রীসহ আটজন পূর্ণমন্ত্রী ও আটজন প্রতিমন্ত্রী। ফলে এবার শুধু রদবদল নয়, বরং মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণও হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে গুজরাতের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিজেপির সংগঠনভিত্তিক নেতৃত্ব যেমন একদিকে শক্তিশালী হচ্ছে, তেমনই নতুন মন্ত্রীরা সরকারে প্রশাসনিক প্রাণশক্তি যোগ করবেন বলে দলীয় মহলের দাবি।এদিকে, কংগ্রেস এবং আম আদমি পার্টি (AAP) অবশ্য এই রদবদলকে ‘রাজনৈতিক নাটক’ বলে কটাক্ষ করেছে। কংগ্রেস নেতা অমিত চাওলা (Amit Chawla) মন্তব্য করেছেন, “বিজেপি জানে, গুজরাতে ক্ষোভ বাড়ছে। তাই মুখ বদলে মূল সমস্যাগুলো ঢাকার চেষ্টা চলছে।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গুজরাতে বিজেপির সংগঠন কাঠামো এতটাই মজবুত যে, এই রদবদল আরও সংগঠিত প্রশাসন গড়ে তুলবে। রিভাবা জাডেজা ও হর্ষ সাঙ্ঘভির অন্তর্ভুক্তি সেই বার্তাই দিচ্ছে, একদিকে নারী নেতৃত্বের উত্থান, অন্যদিকে তরুণ নেতৃত্বকে প্রাধান্য। ২০২৭ সালের ভোটের আগে বিজেপি এখন থেকেই শক্ত ঘাঁটি মজবুত করার পথে নামল, এবং এই মন্ত্রিসভা রদবদলই তার প্রথম ধাপ।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : India Seychelles relations, Narendra Modi tweet | ভারত-সেশেলস সম্পর্কের নতুন দিগন্তে আস্থা: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অভিনন্দন বার্তা বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন সুর তোলে



