শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বলিউডে সাহসী দৃশ্য এখন আর নতুন কিছু না। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের যুগে দর্শক অনেক বেশি খোলামেলা গল্প ও উপস্থাপনায় অভ্যস্ত। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এমন একটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল, যা সে সময়ের সামাজিক মানসিকতায় ঝড় তুলেছিল। ছবিটির নাম ‘আস্থা: ইন দ্য প্রিজন অব স্প্রিং’ (Aastha: In the Prison of Spring)। ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিকে ঘিরে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে জনপ্রিয় অভিনেত্রী ‘রেখা’ (Rekha) -এর সাহসী অভিনয় এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নিয়ে তৎকালীন দর্শকমহলে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়। এই ছবির পরিচালক ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ‘বাসু ভট্টাচার্য’ (Basu Bhattacharya)। মূল চরিত্রে অভিনয় করেন ‘রেখা’ (Rekha), ‘ওম পুরী’ (Om Puri) এবং ‘নবীন নিশ্ছল’ (Navin Nischol)। সে সময়ের মূলধারার হিন্দি সিনেমায় যে ধরনের বিষয়বস্তু সচরাচর দেখা যেত না, সেই পথেই হেঁটেছিল ‘আস্থা’। নারী আকাঙ্ক্ষা, বিবাহিত জীবনের একঘেয়েমি, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং পতিতাবৃত্তির মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ছবির কাহিনি দর্শকদের চমকে দিয়েছিল।

ছবির কেন্দ্রে রয়েছে মানসী নামের এক মধ্যবিত্ত গৃহবধূর জীবন। মানসী স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে সংসার করেন, স্বামীকে ভালোবাসেন, সংসারের দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভিতরে ভিতরে তিনি এক ধরনের অদৃশ্য শূন্যতা অনুভব করেন। ছোট ছোট ইচ্ছেপূরণ না হওয়া, আর্থিক অস্বচ্ছলতা এবং দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। সেই দুর্বলতার মুহূর্তেই জীবনে প্রবেশ করে এক বিত্তশালী ব্যক্তির প্রলোভন। ধীরে ধীরে মানসি এমন এক পথে পা বাড়ান, যা তাঁর নিজের নৈতিক বোধের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। পরিচালক ‘বাসু ভট্টাচার্য’ (Basu Bhattacharya) চরিত্রটিকে কোনওভাবেই একমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করেননি। মানসিকে খলনায়িকা বা নীতিভ্রষ্ট নারী হিসেবে দেখানোর বদলে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর মানসিক টানাপোড়েন, অপরাধবোধ এবং আত্মসমালোচনার যন্ত্রণা। ছবিতে মানসির পতিতাবৃত্তির জগতে জড়িয়ে পড়া যেমন দেখানো হয়েছে, তেমনই দেখানো হয়েছে তাঁর দ্বিধা, অস্বস্তি এবং ভেতরের ভাঙন। নব্বইয়ের দর্শকদের কাছে বিবাহিত এক নারীর এমন সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ও বিতর্কিত।
এই ছবির সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল ‘রেখা’ (Rekha) এবং ‘নবীন নিশ্ছল’ (Navin Nischol) -এর ঘনিষ্ঠ দৃশ্য। বহু দর্শক তখন ধরে নিয়েছিলেন, রেখার সঙ্গে পর্দায় ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে হয়ত ‘অমিতাভ বচ্চন’ (Amitabh Bachchan) রয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই দৃশ্যে ছিলেন নবীন নিশ্ছল (Navin Nischol)। মূলধারার হিন্দি ছবিতে এতটা স্পষ্টভাবে যৌনতা ও শারীরিক ঘনিষ্ঠতা আগে খুব কমই দেখানো হয়েছিল বলে মত অনেকের। ফলে মুক্তির পরই সেন্সর, নৈতিকতা এবং সমাজের পরিবর্তিত মানসিকতা নিয়ে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। উল্লেখ্য, ওম পুরী (Om Puri) ছবিতে মানসীর স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনয়ে ফুটে ওঠে এক সাধারণ, সৎ, পরিশ্রমী মধ্যবিত্ত পুরুষের প্রতিচ্ছবি, যিনি আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সূক্ষ্ম দূরত্ব, অনুচ্চারিত অভিমান এবং আবেগের অভাব ছবির অন্যতম শক্তিশালী দিক। এই বাস্তবধর্মী উপস্থাপনাই ‘আস্থা’কে নিছক বিতর্কিত ছবি হিসেবে নয়, বরং সমাজমনস্ক চলচ্চিত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তৎকালীন সময়ে অনেকেই ছবিটিকে গ্রহণ করতে পারেননি। একাংশের মতে, এটি ‘অতিরিক্ত সাহসী’ এবং ‘পারিবারিক মূল্যবোধবিরোধী’। আবার অন্য একটি অংশের দর্শক ও সমালোচকের মতে, ছবিটি নারী মানসিকতার জটিল দিকগুলোকে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছে। বিশেষ করে নারী আকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিগত চাওয়ার প্রসঙ্গকে সামনে আনা সে সময়ের জন্য নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক পদক্ষেপ ছিল। অন্যদিকে, ‘রেখা’ (Rekha) -এর কেরিয়ারে এই ছবি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হয়। গ্ল্যামারাস ও রহস্যময় ইমেজের বাইরে গিয়ে তিনি একটি জটিল, দ্বন্দ্বে জর্জরিত নারীর চরিত্রে অভিনয় করে প্রমাণ করেন তাঁর অভিনয়ক্ষমতার বিস্তার। অনেক সমালোচকই বলেন, মানসির চরিত্রে তাঁর সংযত কিন্তু গভীর অভিনয় ছবির আবেগঘন মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ‘আস্থা: ইন দ্য প্রিজন অব স্প্রিং’ (Aastha: In the Prison of Spring) নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। যে বিষয়গুলো নব্বইয়ের দশকে অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল, আজ তা সমাজের আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নারী স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত পছন্দ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং দাম্পত্য জীবনের বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। ফলে এই ছবিকে শুধুমাত্র ‘বিতর্কিত’ তকমায় সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজমনস্তত্ত্বের দলিল হিসেবেও দেখা যেতে পারে।বলিউডের ইতিহাসে সাহসী ছবির তালিকায় ‘আস্থা’ আজও বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ‘রেখা’ (Rekha) ও ‘নবীন নিশ্ছল’ (Navin Nischol) -এর ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ঘিরে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তা প্রমাণ করে সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, সমাজের চিন্তাভাবনাকেও নাড়া দিতে পারে। নব্বইয়ের সেই বিতর্ক আজ ইতিহাসের অংশ হলেও, ছবির প্রাসঙ্গিকতা এখনও অটুট।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Priyanka Chopra Krrish return | কৃশ ৪-এ ফিরছেন প্রিয়াঙ্কা, প্রীতি ও রেখা! জাদুর প্রত্যাবর্তনেই নতুন চমক




