মেধা পাল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের হেঁশেলে আজ সর্ষে বা সয়াবিন তেলের পাশেই স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে অলিভ অয়েল। ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যসংস্কৃতির এই জনপ্রিয় তেল এখন আর শুধু ইউরোপের রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভারতীয় মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন রান্নার তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছে। কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট, হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী গুণ, ত্বকের বয়স ধরে রাখা থেকে শুরু করে ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর মতো একাধিক বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত উপকারিতার কারণে অলিভ অয়েলের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু এই তেলের ব্যবহার নিয়ে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয় এক জায়গায়, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল (Extra Virgin Olive Oil) না কি ভার্জিন অলিভ অয়েল (Virgin Olive Oil), কোনটি কোন রান্নায় ব্যবহার করবেন? বাজারে অলিভ অয়েলের বোতল দেখলে অনেকেই ধরে নেন, দামি মানেই সেরা। কিন্তু বাস্তবে রান্নার ধরন অনুযায়ী তেল বাছা না হলে স্বাদ যেমন নষ্ট হয়, তেমনই পুষ্টিগুণও কমে যেতে পারে। বিশেষ করে পাস্তার মতো ইতালিয়ান খাবার রান্নার সময় এই পার্থক্য আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ভুল তাপমাত্রায় ভুল তেল ব্যবহার করলে শুধু টাকার অপচয় নয়, খাবারের আসল চরিত্রও হারিয়ে যেতে পারে।

এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল হল অলিভ অয়েলের সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ। এই তেল তৈরি করতে কোনও ধরনের তাপ, রাসায়নিক বা যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাহায্য নেওয়া হয় না। অলিভ ফল চিপে শুধু ফিল্টারিং পদ্ধতিতে এই তেল সংগ্রহ করা হয়। ফলে এর স্বাভাবিক সুবাস ও স্বাদ অক্ষুণ্ণ থাকে। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলে ফ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা সর্বোচ্চ ০.৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উৎকৃষ্ট বলে ধরা হয়। এই তেলে কোনও অতিরিক্ত রং, গন্ধ বা স্বাদ যোগ করা হয় না। তাই কাঁচা অবস্থায় ব্যবহার করলে, যেমন স্যালাড ড্রেসিং, ডিপ, হামাস বা রান্নার শেষে খাবারের উপর ছড়িয়ে দিলে, এর আসল গুণ পুরোপুরি পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ভার্জিন অলিভ অয়েলও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতেই তৈরি হয়, তবে এর অ্যাসিডের মাত্রা এক্সট্রা ভার্জিনের তুলনায় কিছুটা বেশি। স্বাদ ও গন্ধে এটি তুলনামূলকভাবে হালকা এবং গুণগত মানেও সামান্য পিছিয়ে। তবু এটি রান্নার জন্য যথেষ্ট উপযোগী, বিশেষ করে মাঝারি তাপমাত্রায়। যারা প্রতিদিনের রান্নায় অলিভ অয়েল ব্যবহার করতে চান কিন্তু এক্সট্রা ভার্জিনের উচ্চমূল্য বহন করতে চান না, তাদের জন্য ভার্জিন অলিভ অয়েল একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প।
পাস্তা রান্নার প্রসঙ্গে এই দুই ধরনের অলিভ অয়েলের ভূমিকা আলাদা করে বোঝা জরুরি। জনপ্রিয় রন্ধনশিল্পী রণবীর ব্রার (Ranveer Brar)-এর মতে, পাস্তা বানানোর সময় যদি পুরো রান্নাটাই এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলে করা হয়, তা হলে তেলের সূক্ষ্ম সুবাস উচ্চ তাপে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাঁর পরামর্শ, পাস্তা সেদ্ধ করা বা সস রান্নার সময় সাধারণ বা ভার্জিন অলিভ অয়েল ব্যবহার করা উচিত। এতে তেল সহ্য করতে পারে মাঝারি তাপ এবং খাবারের কাঠামো ঠিক থাকে। কিন্তু রান্না শেষ হওয়ার পর, গ্যাস বন্ধ করে একেবারে শেষে অল্প পরিমাণ এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল যোগ করলে পাস্তার স্বাদ ও গন্ধ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই পদ্ধতিতে তেলের প্রাকৃতিক অ্যারোমা বজায় থাকে এবং খাবারে এক ধরনের ফ্রেশ অনুভূতি আসে। পাস্তা স্যালাডের ক্ষেত্রে আবার এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের জুড়ি মেলা ভার। যেহেতু এখানে কোনও উচ্চ তাপ প্রয়োগ করা হয় না, তাই এই তেলের স্বাভাবিক স্বাদ ও পুষ্টিগুণ পুরোপুরি কাজে লাগে। লেবুর রস, ভিনেগার, ভেষজ মশলা আর এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের মিশ্রণে তৈরি ড্রেসিং শুধু স্বাদই বাড়ায় না, হজমেও সহায়ক হয়। একই কথা প্রযোজ্য ম্যারিনেশন বা ডিপ তৈরির ক্ষেত্রেও। সবজি বা মাংস ম্যারিনেট করতে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল ব্যবহার করলে তার স্বাদ ভিতর পর্যন্ত ঢুকে যায়।
তবে মনে রাখতে হবে, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল উচ্চ তাপমাত্রায় ব্যবহার করলে তার পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ধোঁয়া ওঠার ঝুঁকিও থাকে। তাই ডিপ ফ্রাই বা খুব বেশি তাপে ভাজাভুজির জন্য এই তেল উপযুক্ত নয়। সেই ক্ষেত্রে ভার্জিন অলিভ অয়েল বা রিফাইন্ড অলিভ অয়েল ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত। এতে রান্নাও নিরাপদ থাকবে, আবার অলিভ অয়েলের স্বাস্থ্যগুণও অনেকটাই বজায় থাকবে। কিন্তু, অলিভ অয়েল ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটাই নিয়ম, রান্নার ধরন বুঝে তেল বাছুন। কাঁচা বা হালকা তাপে ব্যবহারের জন্য এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, আর মাঝারি তাপে রান্নার জন্য ভার্জিন অলিভ অয়েল। এই সামান্য সচেতনতাই আপনার পাস্তা থেকে শুরু করে প্রতিদিনের রান্নাকে করে তুলতে পারে আরও সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : wedding style chicken kosha- chicken kosha cooking tips, Bengali chicken curry recipe | ঘরোয়া রান্নায় বিয়েবাড়ির স্বাদ! পাঁচটি সহজ উপকরণে বদলে দিন চিকেন কষার চরিত্র




