সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোয় বড় বিনিয়োগের ঘোষণা ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। কলকাতার গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্সকে কেন্দ্র করে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি রাজ্যের একাধিক প্রান্তে প্রতিরক্ষা উৎপাদন পরিকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে রাজ্য সরকারের সূত্রে খবর। প্রায় ৩৪০০ কোটি টাকার এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্রে প্রতিরক্ষা উৎপাদন একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। গার্ডেনরিচ, খিদিরপুর, শালিমার, রায়চক ও ইছাপুর এই পাঁচটি এলাকার সঙ্গে যুক্ত একাধিক প্রকল্পের কাজের সূচনা ঘিরে তাই আগ্রহ তৈরি হয়েছে।কলকাতার গার্ডেনরিচে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (Rajnath Singh)। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও (Suvendu Adhikari) অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে রাজ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পের পরিকাঠামো বাড়ানোর পক্ষে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স ও যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেডের একাধিক প্রকল্পের ভূমিপুজো ও শিলান্যাসকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানে শিল্প, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে আসে। রাজ্য সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের অন্যতম বড় লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গকে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
ইতিমধ্যেই কলকাতার গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য একাধিক যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করেছে। নতুন পরিকাঠামো তৈরি হলে সেই সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। জাহাজ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত শিল্পের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও পরিষেবা ক্ষেত্রেও নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রবিবারের অনুষ্ঠানে মোট পাঁচটি প্রকল্পের কাজের সূচনা করা হয়েছে বলে উল্লেখ।গার্ডেনরিচ ও খিদিরপুরের পাশাপাশি শালিমার, রায়চক ও ইছাপুরকেও এই পরিকল্পনার আওতায় রাখা হয়েছে। ফলে কলকাতা ও তার আশপাশের শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে উত্তর ২৪ পরগনার ইছাপুরও প্রতিরক্ষা উৎপাদনের নতুন পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে। দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সঙ্গে ইছাপুরের নাম জড়িয়ে রয়েছে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে সেই শিল্পভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘বাংলার মাটিতে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এত বড় বিনিয়োগ রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনাকে নতুন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে।’ কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় রেখে প্রকল্পগুলি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথাও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে শিল্পের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোর গুরুত্বও উঠে আসে।
রাজ্যের শিল্পনীতির প্রসঙ্গও অনুষ্ঠানে আসে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সমন্বয়ের অভাবের কারণে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে কেন্দ্রের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে বড় প্রকল্প আনার চেষ্টা চলছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, শিল্পের পরিকাঠামো যত বাড়বে, ততই নতুন সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে পশ্চিমবঙ্গের আকর্ষণ বাড়তে পারে। প্রতিরক্ষা উৎপাদনের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তার প্রসঙ্গও জুড়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী জমি ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও রাজ্য সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, নিরাপত্তা ও শিল্প, দুই ক্ষেত্রের পরিকাঠামো পাশাপাশি এগোলে রাজ্যের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও পশ্চিমবঙ্গে একসঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরুর বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন রাজ্যে উৎপাদন কেন্দ্র ও পরিকাঠামো বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং যুদ্ধজাহাজ তৈরির ক্ষমতা বাড়ানো কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গে নতুন প্রকল্পের সূচনাকেও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনাথ সিংয়ের বক্তব্যে শিল্পক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে। তাঁর দাবি, একটা সময়ে রাজ্য থেকে শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর বেশি শোনা যেত। এখন নতুন প্রকল্প, বিনিয়োগ এবং উৎপাদন পরিকাঠামো তৈরির খবর সামনে আসছে। নীতি, প্রশাসনিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের পরিবেশ ঠিক থাকলে রাজ্যে আরও শিল্প আসতে পারে বলে তিনি জানান।
প্রায় ৩৪০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব শুধু সরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থা বা জাহাজ নির্মাণ সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। একটি বড় যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে বহু ছোট ও মাঝারি সংস্থা যুক্ত থাকে। ইস্পাত, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, যন্ত্রাংশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ পরিষেবা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কলকাতা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের জন্য তাই এই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।
গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্সের (GRSE) ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগের গুরুত্ব আরও বেশি। কলকাতাভিত্তিক এই সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধজাহাজ তৈরি করে আসছে। নতুন পরিকাঠামো যুক্ত হলে বড় জাহাজ নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগও বাড়বে। দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানোর যে নীতি কেন্দ্র নিয়েছে, তার সঙ্গে এই উদ্যোগের সামঞ্জস্য রয়েছে। অন্যদিকে, ইছাপুরের ক্ষেত্রেও নতুন প্রকল্পের তাৎপর্য কম নয়। যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত এই এলাকার শিল্পপরিকাঠামো বহু পুরনো। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইছাপুরের ঐতিহ্য রয়েছে। নতুন বিনিয়োগ এলে পুরনো শিল্পভিত্তির সঙ্গে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে শুধু কলকাতাকেন্দ্রিক নয়, বৃহত্তর শিল্পাঞ্চলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
কিন্তু, শুধু প্রকল্প ঘোষণা করলেই বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যাবে না। জমি, পরিবহণ, বিদ্যুৎ, দক্ষ কর্মী, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রশাসনিক অনুমোদনের মতো বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রকল্পগুলির কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গেলে রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত দেশীয় সংস্থাগুলির সংখ্যা বাড়লে স্থানীয় স্তরেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্রে কলকাতা ও হাওড়ার পাশাপাশি ইছাপুর, শালিমার এবং রায়চকের মতো এলাকাকে নতুন করে প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা তাই তাৎপর্যপূর্ণ। গার্ডেনরিচের পুরনো জাহাজ নির্মাণ পরিকাঠামোর সঙ্গে নতুন প্রকল্প যুক্ত হলে রাজ্যে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের পরিসর আরও বাড়তে পারে। প্রসঙ্গত, শিল্পের পাশাপাশি রাজনীতির দিক থেকেও এই প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। অন্য দিকে, কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। ফলে ৩৪০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পকে শুধু একটি শিল্প বিনিয়োগ হিসেবে না দেখে প্রতিরক্ষা উৎপাদনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বাংলায় এর আগে থেকেই গার্ডেনরিচ, ইছাপুর-সহ একাধিক এলাকায় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের পরিকাঠামো রয়েছে। এবার নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে সেই পরিকাঠামোকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে রাজ্যের ভূমিকা বাড়লে কলকাতার শিল্পপরিচিতিতেও নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। প্রকল্পগুলি বাস্তবে কত দ্রুত এগোয়, কতটা বিনিয়োগ আসে এবং কতগুলি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। রাজ্য সরকারের দাবি, প্রায় ৩৪০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ শুধু কয়েকটি নতুন ভবন বা উৎপাদন কেন্দ্র তৈরির প্রকল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, শিল্পসংযোগ ও কর্মসংস্থানের বিস্তৃত পরিকল্পনা। গার্ডেনরিচ থেকে ইছাপুর, খিদিরপুর থেকে রায়চক, একাধিক শিল্পাঞ্চলকে একই পরিকল্পনার আওতায় এনে পশ্চিমবঙ্গকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এখন প্রকল্পের পরবর্তী ধাপে কাজ কত দ্রুত এগোয়, তার উপরই নির্ভর করবে এই বড় শিল্পঘোষণার বাস্তব ফল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Northern Sea Route India, India Russia Maritime Trade | ২০২৭-এই রাশিয়ামুখী ভারতের নতুন সমুদ্রপথ! নর্দার্ন সি রুটে প্রথম কার্গো জাহাজ পাঠানোর প্রস্তুতি




