সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ স্টকহোম : বিশ্ব অর্থনীতিতে উদ্ভাবনের শক্তিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে ২০২৫ সালের অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার (The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel 2025) অর্জন করলেন তিন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ জোয়েল মকিয়ার (Joel Mokyr), ফিলিপ আগিওন (Philippe Aghion) ও পিটার হাওইট (Peter Howitt)। রয়্যাল সুইডিশ আকাডেমি অব সায়েন্সেস (The Royal Swedish Academy of Sciences) ঘোষণা করেছে, এ বছরের পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে তাঁদের গবেষণার জন্য ‘উদ্ভাবন-নির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য। অর্থনীতির জগতে এ ত্রয়ী অর্থনীতিবিদ দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও ‘Creative Destruction’ ধারণা একটি সমাজে স্থায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলে। তাদের গবেষণা আধুনিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করেছে, উন্নতির মূলমন্ত্র হলো উদ্ভাবন, পরিবর্তন, ও নতুন জ্ঞানের প্রতি উন্মুক্ততা।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের জোয়ারে বদলে যাওয়া অর্থনীতি
দুই শতাব্দী আগে পর্যন্ত পৃথিবী একটি দীর্ঘ স্থবিরতার যুগে ছিল। মানুষের জীবনযাত্রা তখন প্রায় অপরিবর্তিত ছিল হাজার বছরের মতোই। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর থেকে ইতিহাসের গতি পাল্টে যায়। গত দুই শতাব্দীতে বিশ্ব দেখেছে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, যা কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে। এই ধারাবাহিক উন্নতির পেছনে কী কাজ করছে, সেটাই গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এ বছরের নোবেলজয়ীরা। তাদের ব্যাখ্যা অনুসারে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও নতুন ধারণার বিনিময় হল সেই মূল চালিকাশক্তি, যা মানবসভ্যতাকে ক্রমাগত এগিয়ে নিচ্ছে। যখন নতুন প্রযুক্তি বা পণ্য পুরনোকে প্রতিস্থাপন করে, তখন অর্থনীতি নতুন দিক পায়। এই প্রক্রিয়াকেই পিটার হাওইট ও ফিলিপ আগিওন বলেছিলেন ‘Creative Destruction’ সৃষ্টিশীল ধ্বংস।
জোয়েল মকিয়ারের ইতিহাসভিত্তিক গবেষণা
জোয়েল মকিয়ার। নেদারল্যান্ডসের লেইডেনে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৬ সালে। ইতিহাস ও অর্থনীতির মেলবন্ধনে নতুন আলোকপাত করেছেন। জোয়েল ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় (Yale University) থেকে ১৯৭৪ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি (Northwestern University) এবং তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের (Tel Aviv University) অধ্যাপক। তার গবেষণার মূল বক্তব্য, ‘প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সফল হতে হলে শুধু জানা যথেষ্ট নয়, এর পেছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও জানা জরুরি।’ শিল্পবিপ্লবের পূর্বে এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার অভাবেই বহু আবিষ্কার ও উদ্ভাবন স্থায়ীভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। মকিয়ার দেখিয়েছেন, জ্ঞানের প্রতি উন্মুক্ত সমাজই ধারাবাহিক উন্নতির ভিত্তি। নতুন ধারণাকে স্বাগত জানানো ও পুরনো ধ্যানধারণাকে প্রশ্ন করার মানসিকতা ছাড়া কোনও সমাজই টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। তাঁর মতে, ‘উদ্ভাবন তখনই প্রসারিত হয়, যখন সমাজ জ্ঞানকে ভাগ করে নিতে শেখে, বাধা নয় বরং উন্মুক্ততার চর্চা করে।’
ফিলিপ আগিওন ও পিটার হাওইটের যুগান্তকারী মডেল
অন্যদিকে, ফিলিপ আগিওন (জন্ম ১৯৫৬, প্যারিস, ফ্রান্স) ও পিটার হাওইট (জন্ম ১৯৪৬, কানাডা) যৌথভাবে অর্থনীতিতে এক বিপ্লব এনেছেন ১৯৯২ সালের এক প্রভাবশালী গবেষণাপত্রে। তাঁরা গড়ে তোলেন ‘Creative Destruction’ -এর গাণিতিক মডেল, যেখানে দেখানো হয়, প্রতি নতুন উদ্ভাবন পুরনো শিল্প বা প্রযুক্তিকে প্রতিস্থাপন করে, ফলে একদিকে অগ্রগতি ঘটে, অন্যদিকে পুরনো ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উদ্ভাবন একই সঙ্গে সৃষ্টি ও ধ্বংসের প্রতীক। একদিকে এটি নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, অন্যদিকে পুরনো প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ও পণ্যকে অচল করে দেয়। তাই উদ্ভাবনকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকার ও সমাজকে এই দ্বন্দ্বগুলো সুষ্ঠুভাবে মোকাবিলা করতে হবে। ফিলিপ আগিওন বর্তমানে ফ্রান্সের কলেজ দ্য ফ্রান্স (Collège de France), আইএনএসইএড (INSEAD) এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস (London School of Economics and Political Science) -এর অধ্যাপক। অন্যদিকে, পিটার হাওইট যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে (Brown University) অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কখনও স্বতঃসিদ্ধ নয়
নোবেল কমিটির চেয়ারপারসন জন হ্যাসলার (John Hassler) বলেছেন, ‘এই নোবেলজয়ীদের গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্বয়ংক্রিয় নয়। আমাদের সবসময় সৃজনশীল ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে রক্ষা করতে হবে, নয়ত আমরা আবার স্থবিরতার যুগে ফিরে যাব।’ অর্থাৎ, উদ্ভাবনের ধারাকে টিকিয়ে রাখতে হলে, বড় কর্পোরেশন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার নামে নতুন ধারণাকে দমন করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় নীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যা নতুন চিন্তাধারাকে উৎসাহিত করে।
এই বছরের নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য নির্ধারিত হয়েছে ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা। এর অর্ধেক পাচ্ছেন জোয়েল মকিয়ার, আর বাকি অর্ধেক ভাগ করে নিচ্ছেন ফিলিপ আগিওন ও পিটার হাওইট। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস (The Royal Swedish Academy of Sciences) জানায়, ‘তাদের গবেষণা আমাদের দেখিয়েছে যে উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতা কেবল অর্থনীতিকে নয়, মানবসভ্যতার জীবনমানকেও বদলে দিতে পারে। তাদের তত্ত্ব আগামী শতাব্দীর উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবে।’
উদ্ভাবনের দর্শন ও ভবিষ্যতের বার্তা
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই পুরস্কার আরও তাৎপর্যপূর্ণ। জোয়েল মকিয়ার যেমন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে বলেন, তেমনই আগিওন ও হাওইট ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে উদ্ভাবনের বাধা দূর করার আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, ‘প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি সমাজে উত্তেজনা সৃষ্টি করে, কিন্তু সঠিক নীতিমালা থাকলে সেই উত্তেজনাই উন্নতির ইঞ্জিন হয়ে ওঠে।’ বিশ্বের বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা মনে করছেন, ২০২৫ সালের এই নোবেল পুরস্কার শুধু একাডেমিক সাফল্য নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার উদ্ভাবন-নির্ভর ভবিষ্যতের প্রতি এক বিশ্বাসের স্বীকৃতি। উল্লেখ্য যে, জোয়েল মকিয়ার, ফিলিপ আগিওন ও পিটার হাওইট আমাদের শিখিয়েছেন, ‘উদ্ভাবন থেমে গেলে, উন্নতি থেমে যায়।’ অর্থনীতি তখনই টেকসই হয়, যখন সমাজ নতুন ধারণাকে ভয় না পেয়ে তাকে গ্রহণ করে। আজকের এই পুরস্কার তাই কেবল তিনজন বিজ্ঞানীর নয়, তা সকল চিন্তাশীল সমাজের জয়, যারা বিশ্বাস করে উদ্ভাবনই মানবজাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, অর্থনীতিতে উদ্ভাবনের শক্তিকে ব্যাখ্যা করে ২০২৫ সালের নোবেল পুরস্কার জয় করলেন জোয়েল মকিয়ার, ফিলিপ আগিওন ও পিটার হাওইট। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতির ধারাবাহিক উন্নতির মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে।
ছবি: সংগৃহীত




