দেবব্রত সরকার: সাশ্রয় নিউজ: বাংলার উৎসব-সংস্কৃতিতে ভূত চতুর্দশীর একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। কালীপূজার আগের দিন, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে এই দিনটি পালিত হয়। লোকবিশ্বাস, আচার, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ, আর সাংস্কৃতিক প্রতীকের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন এই দিনটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে যা বাংলার মাটিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহমান। ভূত চতুর্দশী শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে ভুতুড়ে কোনো পরিবেশ, অদ্ভুত আলো-আঁধারি রাত, আর প্রদীপের কাঁপা কাঁপা শিখা। কিন্তু এর পেছনে শুধু ভয় বা রহস্য নেই আছে গভীর সাংস্কৃতিক বোধ এবং সামাজিক প্রজ্ঞা। প্রাচীন বাংলায় এই দিনটিকে ‘অশুভ শক্তি’ দূর করার দিন বলে মানা হতো। বিশ্বাস করা হতো, কালীপূজার প্রাক্কালে এই রাতে পূর্বপুরুষদের আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসেন, আর অশুভ আত্মারাও ঘুরে বেড়ায়। তাই বাড়ির প্রতিটি কোণে জ্বালানো হতো ১৪টি প্রদীপ এই ১৪ প্রদীপই ভূত চতুর্দশীর মূল প্রতীক।

এই ১৪টি প্রদীপের প্রতিটি জ্বালানো হতো এক একটি উদ্দেশ্যে বাড়ির অন্ধকার কোণ, উঠোন, ছাদ, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, বাথরুম, এমনকি কুয়োর ধারে। বিশ্বাস করা হতো, প্রদীপের আলো অশুভ আত্মা দূরে রাখে, আর পূর্বপুরুষের আত্মাদের পথ আলোকিত করে। আলো এখানে কেবল একটি বস্তুগত শক্তি নয়, বরং অজ্ঞান ও অশুভের ওপর জ্ঞানের ও শুভের জয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভূত চতুর্দশীর দিন অনেক পরিবারে চৌদ্দ শাক খাওয়ার প্রথা। ১৪ রকম শাক একত্রে রান্না করে খাওয়ার মধ্যে যেমন আছে শরীর পরিশুদ্ধির বৈজ্ঞানিক যুক্তি, তেমনি আছে ঐতিহ্যের প্রতীকী ব্যাখ্যা। কৃষিজীবী বাংলায় এই সময় নতুন ধানের চাষের আগে শরীরকে রোগপ্রতিরোধী করে তোলা ছিল জরুরি। ভেষজ গুণে ভরপুর এই শাক শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, মৌসুমি সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। একই সঙ্গে, প্রকৃতির বৈচিত্র্য ও সম্পদকে সম্মান জানানোরও এক প্রতীকী ভাষা এতে নিহিত। ধর্মীয় দিক থেকেও এই দিনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, চতুর্দশী তিথিতে পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের আশীর্বাদ কামনা করলে পরিবারে সুখ-শান্তি বজায় থাকে। অনেকে তাই প্রদীপ জ্বালিয়ে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে ধূপ-ধুনো দেন, পিণ্ডদান করেন বা নিঃশব্দে তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। আবার লোককথায় বলা হয়, ভূত চতুর্দশীর রাতে ভূতেরা মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায়, তাই এই রাতে বাড়ির বাইরে বেরোনো ভালো নয় এই বিশ্বাস শিশুদের মধ্যে ভয় জাগিয়ে তাদের ঘরে রাখারও এক ধরনের সামাজিক পদ্ধতি ছিল। আজকের নগর জীবনে, এই সমস্ত বিশ্বাস ও আচার অনেক ক্ষেত্রেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎবাতির আলোয় প্রদীপের প্রাসঙ্গিকতা অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন। ১৪ শাক খাওয়ার রীতি এখন অনেক জায়গায় শুধুই রেস্তোরাঁর মেনুতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি এই দিনটির প্রকৃত অর্থকে হারিয়ে ফেলছি?
ভূত চতুর্দশী আসলে ভয় বা অন্ধবিশ্বাসের উৎসব নয়; বরং এটি হল অন্ধকারে আলোর আহ্বান, অজ্ঞানতার ওপর প্রজ্ঞার জয়, আর পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক ঐতিহ্যবাহী উপলক্ষ। প্রদীপ জ্বালানোর মধ্যে দিয়ে যেমন আমরা আমাদের ঘর আলোকিত করি, তেমনি নিজেদের অন্তরের অন্ধকারকেও আলোকিত করার বার্তা পাই। ১৪ শাক খাওয়ার মাধ্যমে শরীর ও প্রকৃতির মধ্যে এক যোগসূত্র স্থাপন করি। এই সময়ে যখন সমাজ দ্রুত আধুনিকতার পথে এগোচ্ছে, তখন ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে বাঁচিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভূত চতুর্দশীর প্রদীপ যেমন বাতাসে কাঁপলেও নেভে না, তেমনি আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়কেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে সময়ের ঝড়ের মধ্যেও। ছোটদের এই দিনটির গল্প বলা, ঘরে প্রদীপ জ্বালানো, কিংবা একসঙ্গে ১৪ শাক রান্না করে খাওয়া—এগুলোই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখতে পারে। একটা সমাজ তার উৎসব ও ঐতিহ্য দিয়েই চেনা যায়। ভূত চতুর্দশী সেই উৎসবগুলির মধ্যে এক নিঃশব্দ অথচ গভীরতর বার্তা বহন করে “অন্ধকার যত গভীরই হোক, একটিমাত্র আলোই যথেষ্ট পথ দেখাতে।”




