সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ইম্ফল : মণিপুরে (Manipur) সংঘাতের আবহে ফের এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করল। কুকি সম্প্রদায়ের স্ত্রীকে দেখতে গিয়ে অপহরণ ও নৃশংসভাবে খুন হলেন মেইতেই সম্প্রদায়ের একজন যুবক বলে উল্লেখ। নিহত যুবকের নাম মালাংলাম্বাম ঋষিকান্ত সিংহ (Malanglambam Rishikanta Singh)। অভিযোগ, অপহরণের পর তাঁকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যার একটি ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই নতুন করে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়েছে (যদিও ভিডিয়োর সত্যতা সাশ্রয় নিউজ যাচাই করেনি)। ঘটনার গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে ইতিমধ্যেই জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ-কে (NIA) তদন্তভার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে মণিপুরের চূড়াচাঁদপুর (Churachandpur) জেলায়। পুলিশ সূত্রে খবর, ঋষিকান্ত কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন নেপালে (Nepal) ছিলেন। তাঁর স্ত্রী কুকি সম্প্রদায়ের হওয়ায় সাম্প্রতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেও পারিবারিক কারণে তিনি মণিপুরে ফেরেন। গত ১৯ জানুয়ারি চূড়াচাঁদপুরে এসে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু সেই সফরই যে তাঁর জীবনের শেষ সফর হয়ে দাঁড়াবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, বুধবার রাতে চূড়াচাঁদপুরের একটি বাড়ি থেকে ঋষিকান্ত ও তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করা হয়। অভিযোগ, কুকি সম্প্রদায়ের একদল সশস্ত্র বিদ্রোহী তাঁদের তুলে নিয়ে যায়। পরে একটি নির্জন গ্রামে নিয়ে গিয়ে ঋষিকান্তকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর দেহে একাধিক গুলির চিহ্ন মিলেছে। কিছুক্ষণ পর অন্য একটি গ্রাম এলাকা থেকে তাঁর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয়। যদিও ওই রাতেই তাঁর স্ত্রীকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিয়ো বৃহস্পতিবার সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের সেই ভিডিয়োতে দেখা যায়, অন্ধকারের মধ্যে হাতজোড় করে বসে রয়েছেন ঋষিকান্ত। মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। তিনি কিছু বলার চেষ্টা করছেন বলেও অনুমান করা হচ্ছে। তবে ভিডিয়োটিতে শব্দ না থাকায় তাঁর কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে না। পর মুহূর্তেই একের পর এক গুলির শব্দে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তাঁর দেহ। যদিও এই ভিডিয়োর সত্যতা এখনও সরকারিভাবে যাচাই করা হয়নি, তবু তার নৃশংসতা ঘিরে প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
এই হত্যার নেপথ্যে ঠিক কী কারণ, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে পুলিশ সূত্রের দাবি, এটি জাতিগত বিদ্বেষের ফল হতে পারে। প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে, এই ঘটনার সঙ্গে কুকি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘ইউনাইটেড কুকি ন্যাশনাল আর্মি’ -এর (United Kuki National Army) সদস্যদের যোগ থাকতে পারে। যদিও স্থানীয় কিছু সূত্র জানাচ্ছে, ওই গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের কোনও যোগ নেই বলে দাবি করেছে। ফলে তদন্ত আরও জটিল আকার নিচ্ছে।
মণিপুরে গত কয়েক মাস ধরেই মেইতেই (Meitei) ও কুকি (Kuki) সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে উত্তপ্ত পরিস্থিতি চলছে। বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, ঘরছাড়া হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এই আবহে ঋষিকান্তের হত্যাকাণ্ড নতুন করে জাতিগত বিভাজনের ক্ষত উসকে দিল বলেই মত পর্যবেক্ষকদের।
উল্লেখ্য, ওই ঘটনার পর রাজ্যের শীর্ষ মহলেও তৎপরতা বেড়েছে। মণিপুরের রাজ্যপাল অজয়কুমার ভল্লা (Ajay Kumar Bhalla) এই ঘটনায় গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন। লোকভবন (Lok Bhavan, সাবেক রাজভবন) থেকে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে রাজ্যপাল জানান, চূড়াচাঁদপুরের এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ-কে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতেই এনআইএ তদন্ত করবে।’ একই সঙ্গে তিনি নিহত যুবকের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
রাজ্য পুলিশের একজন আধিকারিক জানান, ‘এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘটনা। সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ ইতিমধ্যেই চূড়াচাঁদপুর ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে বলেও প্রশাসন সূত্রে খবর। অন্যদিকে, ঋষিকান্তের পরিবার এই ঘটনায় শোকস্তব্ধ। তাঁদের দাবি, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা হোক। মানবাধিকার সংগঠনগুলিও এই হত্যার তীব্র নিন্দা করেছে এবং অবিলম্বে শান্তি ফেরানোর দাবি তুলেছে।
প্রসঙ্গত, মণিপুরে শান্তি ফেরানোর চেষ্টার মাঝেই এই ঘটনা রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল। এনআইএ তদন্তে কী উঠে আসে, তার দিকেই এখন তাকিয়ে গোটা দেশ।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Republic Day 2026 India | ইউরোপের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে কর্তব্যপথে ইতিহাস গড়তে চলেছে ভারত, ‘বন্দে মাতরম’ থিমে তুঙ্গে প্রস্তুতি




