সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পাটনা : নিট পরীক্ষার্থীর রহস্যমৃত্যুকে (NEET Student death) ঘিরে পটনায় উত্তেজনা চরমে। সদ্য প্রকাশ্যে আসা ফরেন্সিক রিপোর্ট এই ঘটনার তদন্তে একেবারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, ফরেন্সিক পরীক্ষায় মৃত ছাত্রীর পোশাকে বীর্যের নমুনা মিলেছে। এই তথ্য সামনে আসতেই গোটা ঘটনায় ফের প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রাথমিক তদন্ত ও পুলিশের ভূমিকা। অভিযোগ উঠেছে তদন্তে গুরুতর গাফিলতির। তারই জেরে কদমকুয়াঁ থানার অতিরিক্ত ওসি হেমন্ত ঝা (Hemant Jha) এবং চিত্রগুপ্ত নগর থানার সাব-ইনস্পেক্টর রোশনি কুমারীকে (Roshni Kumari) সাসপেন্ড করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু করেছে পুলিশ প্রশাসন। ঘটনাটি পটনার চিত্রগুপ্ত নগর এলাকার একটি মেয়েদের হোস্টেলকে কেন্দ্র করে। চলতি মাসের শুরুতে ওই হোস্টেল থেকেই নিট পরীক্ষার্থী তরুণীকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। বিশেষ সূত্রে জানা যায়, তিনি নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং সেই কারণেই বাড়ি থেকে দূরে ওই হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছিলেন। উদ্ধার করার পর তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। দীর্ঘ কয়েক দিন কোমায় থাকার পর গত ১১ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে।
মৃত ছাত্রীর পরিবার প্রথম থেকেই দাবি করে আসছে, এটি কোনও স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। তাঁদের অভিযোগ, তরুণীর উপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল এবং সেই ঘটনার প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করা হয়। পরিবারের আরও অভিযোগ, হোস্টেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দিতে উদ্যোগী হয়েছিল। এই অভিযোগ সামনে আসতেই পটনার বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রসমাজ, অভিভাবক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে কড়া পদক্ষেপ করতে হয়। চাপে পড়ে তদন্তভার দেওয়া হয় বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট-কে(SIT)। সিট তদন্ত শুরু করার পর ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। পটনা পুলিশ সুপারের দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, মৃত ছাত্রীর পোশাক ফরেন্সিক পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছিল এবং সেখান থেকেই বীর্যের নমুনা মিলেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গত ১০ জানুয়ারি মৃতার পরিবার পুলিশের হাতে ওই পোশাক তুলে দেয়। তার পরেই তা ফরেন্সিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। বীর্যের নমুনা থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সেই ডিএনএ ধৃত অভিযুক্ত ও সন্দেহভাজনদের ডিএনএ-র সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই ফরেন্সিক রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসক পরীক্ষার পর দাবি করা হয়েছিল, অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খাওয়ার ফলেই তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। সেই সময় যৌন হেনস্থার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। কিন্তু পরবর্তী ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ছবিটা অনেকটাই বদলে যায়। ময়নাতদন্তে তরুণীর যৌনাঙ্গে ক্ষতচিহ্নের পাশাপাশি শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নখের আঁচড়ের দাগ পাওয়া গিয়েছে। এই সব তথ্য যৌন নির্যাতনের আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। উল্লেখ্য যে, মৃত্যুর পর থেকেই পটনার পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ক্ষোভের আঁচ ছড়িয়েছে প্রশাসন ও পুলিশের বিরুদ্ধেও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ইতিমধ্যেই হস্টেল মালিককে গ্রেফতার করেছে। তদন্তকারীদের একাংশের মতে, ঘটনার পরপরই যদি আরও সক্রিয় ও সংবেদনশীল তদন্ত করা হত, তবে অনেক তথ্য আগেই সামনে আসতে পারত। সেই কারণেই এখন তদন্তে গাফিলতির অভিযোগে দুই পুলিশকর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে, এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও কম নয়। মৃতার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেছেন জন সুরাজ পার্টির প্রধান প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishor)। তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, পরিবারকে সব রকম আইনি সহায়তা দেওয়া হবে এবং প্রকৃত দোষীরা যেন কোনও ভাবেই রেহাই না পায়, সে জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে। তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, নিট পড়ুয়ার মৃত্যু ঘিরে তৈরি হওয়া এই ঘটনা এখন শুধুই একটি রহস্যমৃত্যুর মামলা নয়, প্রশাসনিক দায়িত্ব, পুলিশের ভূমিকা এবং নারী সুরক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ফরেন্সিক রিপোর্টের তথ্য তদন্তকে কোন দিকে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত কারা দায়ী প্রমাণিত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা পটনা তথা দেশবাসী। এই মামলার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন নজরদারির আওতায়, কারণ একটি তরুণীর অকালমৃত্যুর ন্যায়বিচারই হয়ে উঠেছে সমাজের বড় দাবি।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Purulia rape case, POCSO arrest Purulia | পুরুলিয়ায় গণধর্ষণের অভিযোগে চাঞ্চল্য, দ্রুত অভিযানে ৭ জনকে গ্রেফতার করল জেলা পুলিশ




