সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : আনন্দপুরের নাজিরাবাদ (Nazirabad) শিল্পাঞ্চলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার প্রায় ৬০ ঘণ্টা পরে অবশেষে মুখ খুলল বহুল প্রচারিত মোমো প্রস্তুতকারী সংস্থা (Momo)। বুধবার দুপুরে প্রকাশিত একটি দীর্ঘ বিবৃতিতে সংস্থার তরফে দাবি করা হয়েছে, তাদের গুদামে আগুনের সূত্রপাত হয়নি। বরং পাশের একটি গুদামে ‘অননুমোদিত ভাবে রান্নাবান্না’ চলছিল, সেখান থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ওয়াও মোমোর গুদামে। এই ঘটনায় সংস্থার তিন জন কর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। মৃতদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ, আজীবন মাসিক ভাতা এবং সন্তানদের শিক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার গভীর রাতে। নাজিরাবাদ এলাকার পাশাপাশি থাকা দু’টি গুদামে পর পর আগুন লাগে। সেই সময় ভিতরে রাতের শিফটে কর্মরত ছিলেন একাধিক শ্রমিক ও নিরাপত্তারক্ষী। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই ভিতরে আটকে পড়েন। দমকল (Fire Services) -এর অন্তত ১২টি ইঞ্জিন দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সরকারি ভাবে মৃতের সংখ্যা তখনও স্পষ্ট ছিল না। বেসরকারি সূত্রে মৃতের সংখ্যা ১১ জন পর্যন্ত হতে পারে বলে দাবি করা হয়। ওই বিশেষ মোমো সংস্থার গুদামের পিছনের দিক থেকে পাওয়া যায় কয়েকটি দেহাংশ, যেগুলি এ জনের না কি একাধিক মানুষের, তা নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে ঘটনার পর থেকে ওই মোমো সংস্থার ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। সমাজমাধ্যমে (Social Media) সংস্থার অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, কর্মীদের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বহু মানুষ। অনেকে আবার সংস্থাটিকে বয়কট করার ডাক দেন। এই চাপের মধ্যেই ৬০ ঘণ্টার দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে সংস্থার তরফে বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
ওই বিশেষ মোমো সংস্থার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘২৬ জানুয়ারি ভোর আনুমানিক ৩টে নাগাদ পাশের গুদাম থেকে আগুন আমাদের গুদামে ছড়িয়ে পড়ে। আনন্দপুরে অবস্থিত আমাদের একটি গুদাম সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে। এই ঘটনায় আমাদের দু’জন স্থায়ী কর্মী এবং একজন চুক্তিভিত্তিক নিরাপত্তারক্ষীর মৃত্যু হয়েছে। আমরা এই অপূরণীয় ক্ষতিতে গভীর ভাবে শোকাহত।’ একই সঙ্গে সংস্থার অভিযোগ, পাশের গুদামে অনুমোদন ছাড়াই রান্নার কাজ চলছিল, যা থেকেই আগুনের সূত্রপাত। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এই আগুন শুধু আমাদের কর্মীদের প্রাণ কাড়েনি, আমাদের বিশ্বাস, আমাদের সত্তাকেও গভীর ভাবে আঘাত করেছে।’ সংস্থার এই বক্তব্যের পরেই নতুন করে বিতর্ক দানা বাঁধে। কারণ, অনেকের মতে, পাশের গুদামের দিকে আঙুল তুললেও নিজেদের গুদামের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায় এড়ানো যায় না।
মৃত কর্মীদের পরিবারগুলির প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ওই মোমো সংস্থার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যেই শোকাহত পরিবারগুলির সঙ্গে দেখা করেছেন। সংস্থার তরফে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, ‘প্রতি পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে এককালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি আজীবনের জন্য মাসিক বেতন দেওয়া হবে, যাতে পরিবারগুলির আর্থিক নিরাপত্তা বজায় থাকে। মৃত কর্মীদের সন্তানদের শিক্ষার সম্পূর্ণ খরচও আমরা বহন করব।’ এই ঘোষণাকে কেউ কেউ ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, অনেকের মতে, আর্থিক ক্ষতিপূরণ কোনও ভাবেই প্রাণহানির দায় মুছে দিতে পারে না। এ দিকে নাজিরাবাদের ধ্বংসস্তূপে এখনও কাজ চালাচ্ছে কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal Corporation) এবং দমকল বাহিনী। আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এলেও সব জায়গায় এখনও পৌঁছোনো সম্ভব হয়নি বলে জানা যাচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পুলিশ (Police) এবং প্রশাসনের তরফে তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে। ওয়াও মোমো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা প্রশাসনের তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
এই অগ্নিকাণ্ড শুধুমাত্র একটি সংস্থার সংকট নয়, তা শহরের শিল্পাঞ্চলগুলিতে গুদাম ও কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, অনুমোদন ছাড়াই কী ভাবে রান্না বা উৎপাদন চলছে, কর্মীদের সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত, এই সব প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। নাজিরাবাদের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ভবিষ্যতে আরও কঠোর নজরদারি ও নিয়মকানুনের প্রয়োজনীয়তার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Elon Musk Ryanair Poll | স্টারলিংক বিতর্কে নতুন মোড়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘রায়ানএয়ার কিনে নেওয়া উচিত কি না’ : ভোটাভুটি খুলে দিলেন ইলন মাস্ক




