সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পেটব্যথা ও বমির যন্ত্রণা দীর্ঘ দিন ধরে সহ্য করছিলেন ৭৩ বছরের এক বৃদ্ধা। সাধারণ সমস্যা ভেবে প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও ধীরে ধীরে উপসর্গ বাড়তে থাকায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সামনে আসে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য, তাঁর গলব্লাডারে জমে রয়েছে প্রায় দু’হাজারটি পাথর। বয়স ও শারীরিক জটিলতার কারণে অস্ত্রোপচার ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় সফল অপারেশন সম্পন্ন হল কলকাতার MR Bangur Hospital -এ। হাসপাতাল সূত্রে খবর, কয়েক মাস ধরে পেটের ডান দিকে তীব্র ব্যথা, অরুচি ও বমির মতো উপসর্গে ভুগছিলেন ওই বৃদ্ধা। পরিবার প্রথমে সাধারণ ওষুধে উপশমের চেষ্টা করলেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আল্ট্রাসোনোগ্রাফি ও অন্যান্য পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তাঁর গলব্লাডার প্রায় পূর্ণ অসংখ্য ক্ষুদ্র পাথরে। চিকিৎসকদের কথায়, ‘এত বিপুল সংখ্যক গলস্টোন একসঙ্গে পাওয়া খুবই বিরল ঘটনা।’
কিন্তু, অস্ত্রোপচার অবিলম্বে করা যায়নি। রোগীর উচ্চ রক্তচাপ ও বয়সজনিত নানা সমস্যা থাকায় ঝুঁকি ছিল প্রবল। চিকিৎসক দল কয়েক দিন ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে প্রথমে তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন। ওষুধ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাঁকে অপারেশনের উপযোগী করে তোলা হয়। চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ সার্জন নীলনারায়ণ সরকার (Nilnarayan Sarkar)। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত দল পরিকল্পনা করে অস্ত্রোপচারের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে। বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হয় অপারেশন। চিকিৎসকদের সামনে ছিল দ্বৈত চ্যালেঞ্জ, একদিকে বিপুল সংখ্যক পাথর অপসারণ, অন্যদিকে প্রবীণ রোগীর শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দীর্ঘ সময় ধরে সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় একে একে পাথরগুলি বের করা হয়। শেষ পর্যন্ত গুনে দেখা যায়, সংখ্যা প্রায় দু’হাজার। হাসপাতালের এক কর্তার কথায়, ‘গলব্লাডারে এত সংখ্যক পাথর সচরাচর দেখা যায় না। অপারেশন সফল হয়েছে, সেটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য।’
অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে আইসিইউ-তে রাখা হয় পর্যবেক্ষণের জন্য। হাসপাতালের সুপার শিশির নস্কর (Shishir Naskar) বলেন, ‘অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল। চিকিৎসক ও নার্সিং টিম নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছেন।’ তাঁর বক্তব্যে ধরা পড়ে স্বস্তির সুর। উল্লেখ্য, চিকিৎসাবিজ্ঞানে গলস্টোন বা পিত্তপাথর নতুন বিষয় নয়। তবে সাধারণত এক বা একাধিক বড় পাথর অথবা কিছু ছোট পাথর দেখা যায়। হাজারের ঘরে সংখ্যা পৌঁছনো অস্বাভাবিক। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উপসর্গ অবহেলা করলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। পিত্তথলিতে কোলেস্টেরল বা বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে পাথর তৈরি হয়। সময়মতো পরীক্ষা না করালে তা বাড়তে থাকে।
এই ঘটনার পর চিকিৎসক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। একজন চিকিৎসক জানান, ‘অপারেশনের সময় আমরা ধৈর্য ধরে প্রতিটি পাথর সরিয়েছি। রোগীর বয়স বিবেচনায় অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল।’ অস্ত্রোপচারের সময় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ সহায়ক দল বড় ভূমিকা নিয়েছে বলেও হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে। রোগীর পরিবারও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের কথায়, ‘প্রথমে খুব ভয় পেয়েছিলাম। বয়সের কারণে ঝুঁকি ছিল। কিন্তু চিকিৎসকরা সাহস জুগিয়েছেন।’ বর্তমানে বৃদ্ধা ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কয়েক দিন পর্যবেক্ষণে রেখে তারপর বাড়ি পাঠানো হবে।
কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলিতে প্রতিদিনই নানা জটিল অস্ত্রোপচার হয়। তবে দু’হাজার পাথর অপসারণের ঘটনা ব্যতিক্রমী বলেই মনে করা হচ্ছে। রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় চিকিৎসকরা আশাবাদী, তিনি দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। এই ঘটনা নাগরিকদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা বহন করছে। দীর্ঘ দিন পেটব্যথা, অরুচি বা বমির মতো উপসর্গ অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা ধরা পড়লে চিকিৎসা সহজ হয় এবং জটিলতা কমে। প্রসঙ্গত, এম আর বাঙুর হাসপাতালে সফল এই অস্ত্রোপচার চিকিৎসা পরিষেবায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা থাকল। প্রবীণ রোগীর ক্ষেত্রে ঝুঁকি সত্ত্বেও যে পরিকল্পিত চিকিৎসা ও দক্ষ দলগত প্রচেষ্টায় বড় সাফল্য সম্ভব, তার প্রমাণ মিলল এই ঘটনায়।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী।
আরও পড়ুন :Pakistan Imran Khan health update | ইমরানকে সম্মান দিন: জেলে অসুস্থ ‘কাপ্তান’-এর চিকিৎসা চেয়ে পাক সরকারকে চিঠি গাভাসকর-কপিলদের




