সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বাঁকুড়া: রাজ্যের শিল্পায়ন নিয়ে বড় ঘোষণা ও তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ, এক মঞ্চেই মিলল দুই সুর। বাঁকুড়ার মেজিয়ায় শ্যাম স্টিল (Shyam Steel) -এর সম্প্রসারণ প্রকল্পের উদ্বোধনে উপস্থিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) একদিকে যেমন বিপুল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কথা তুলে ধরলেন, অন্যদিকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-কে উদ্দেশ করে করলেন কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য। তাঁর কথায়, ‘আপনার হাতে সময় আছে, একবার প্ল্যান্টে এসে দেখে যান, প্রয়োজন হলে হেলিকপ্টার পাঠাব।’ এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে।
প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার এই শিল্প বিনিয়োগ এবং প্রায় ২০ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তুলে ধরে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের পরিবেশ দ্রুত বদলাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে শিল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও বাস্তব চিত্র আলাদা বলেই দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘যাঁরা বলেন শিল্প হচ্ছে না, তাঁরা একবার এসে দেখে যান। বাস্তবে কী হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারবেন।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনিববিরোধী শিবিরের সমালোচনার জবাব দিতে চান। শ্যাম স্টিলের এই প্রকল্প ঘিরে রাজ্যের শিল্প মানচিত্রে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলছে বলে দাবি সরকারের। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার পাশাপাশি এই প্রকল্পে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকগুলিও গুরুত্ব পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। কারখানা চত্বরে মন্দির, নন্দী মহারাজের প্রতিমা, গোশালা এবং পাশাপাশি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Subhas Chandra Bose) ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) -এর মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু বলেন, ‘শুধু শিল্প নয়, আমাদের ঐতিহ্যও এখানে সম্মান পাচ্ছে।’
শিল্পপতিদের নিয়ে অতীতের বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একসময় তাঁদের ‘বহিরাগত’ বলে আক্রমণ করা হলেও এখন বাংলার প্রতি দেশ-বিদেশের শিল্পগোষ্ঠীর আগ্রহ বাড়ছে। তাঁর কথায়, ‘আজ বিভিন্ন সংস্থা বাংলায় বিনিয়োগ করছে। এটা প্রমাণ করে, রাজ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে।’ এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে রাজ্যের শিল্প পরিবেশ নিয়ে ইতিবাচক বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি। শুধু শ্যাম স্টিল নয়, সাম্প্রতিক সময়ে আরও একাধিক শিল্প বিনিয়োগের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, লাক্স কোজি (Lux Cozi) ইতিমধ্যেই রাজ্যে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি হাওড়ার ধুলাগড়ে আমুল (Amul)-এর প্রায় ৭০০ কোটি টাকার দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ কারখানা উদ্বোধনের পথে। এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থানের নতুন দরজা খুলবে বলে দাবি করেন তিনি।
দুর্গাপুরেও বড় শিল্প প্রকল্পের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে আদানি গোষ্ঠী (Adani Group) দাদনপাত্রবাড় এলাকায় গভীর সমুদ্রবন্দর গড়তে আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি নিউটাউনে (Newtown) প্রায় ২ হাজার শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন। অন্যদিকে গোয়েঙ্কা গোষ্ঠী (Goenka Group) ব্যাটারি উৎপাদন প্রকল্পে আগ্রহী বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
কিন্তু, তাজপুর (Tajpur) সমুদ্রবন্দর নিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে সরকারি জমি না থাকায় প্রকল্পটি এগোবে না। পরিবর্তে অন্য জায়গায় বিকল্প বন্দরের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘোষণা শিল্প সংক্রান্ত পরিকল্পনায় নতুন দিক নির্দেশ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। মেজিয়ার এই অনুষ্ঠান ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপও কম নয়। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে শুভেন্দুর ‘হেলিকপ্টার পাঠানোর’ মন্তব্য নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে জোর চর্চা। শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই মন্তব্য শুধুই কটাক্ষ নয়, বরং শিল্প নিয়ে চলা বিতর্ককে নতুন করে সামনে আনার চেষ্টা।
অন্যদিকে, শিল্প সংক্রান্ত এই ঘোষণাগুলিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়লে রাজ্যের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। বিশেষ করে গ্রামীণ ও শিল্পাঞ্চলে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হলে তার প্রভাব পড়বে সামগ্রিক উন্নয়নের ওপর। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে একদিকে যেমন শিল্প বিনিয়োগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বার্তাও দেওয়া হয়েছে। তাঁর ‘একবার এসে দেখে যান’ মন্তব্য কার্যত বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার সমান বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে আগামী দিনে এই ইস্যু ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়তে পারে বলেই ধারণা। উল্লেখ্য, রাজ্যের শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ কোন দিকে এগোবে, তা নির্ভর করবে এই ঘোষণাগুলির বাস্তবায়নের ওপর। তবে মেজিয়ার এই মঞ্চ থেকে দেওয়া বার্তা ইতিমধ্যেই রাজনীতির অন্দরমহলে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : UKPSC Deputy Collector Success Story Meenakshi Bhatia | টিফিন পৌঁছে দেওয়া থেকে প্রশাসনের শীর্ষে : PSC-তে বাজিমাত করে ডেপুটি কালেক্টর মীনাক্ষী ভাটিয়া, সংগ্রামের গল্পে চমক




