তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, ঋষিকেশ: জীবনের শুরুটা ছিল কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে সংসারের দায় কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল মাকে। সেই পরিবারের মেয়েই আজ প্রশাসনিক পদে বসে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। উত্তরাখণ্ডের ঋষিকেশের বাসিন্দা মীনাক্ষী ভাটিয়া (Meenakshi Bhatia) উত্তরাখণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা ইউকেপিএসসি (UKPSC) -এর পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করে ডেপুটি কালেক্টর পদে নিযুক্ত হয়েছেন। ২০২৪ সালের পরীক্ষায় তিনি জেনারেল বিভাগে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। তাঁর এই সাফল্যে এখন বহু তরুণ-তরুণীর আলোচনার কেন্দ্রে। কীভাবে সম্ভব হল? মীনাক্ষীর জীবনের শুরুতেই আসে বড় ধাক্কা। ২০০৩ সালে তাঁর বাবার আকস্মিক মৃত্যু পরিবারের উপর নেমে আনে গভীর সঙ্কট। তখন তিনি একেবারেই ছোট।
সংসারের দুঃসময়ে দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তাঁর মা নীলম ভাটিয়া (Neelam Bhatia)। পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি একটি ছোট টিফিন পরিষেবা শুরু করেন। এই ব্যবসাই হয়ে ওঠে তাঁদের আয়ের একমাত্র ভরসা। শুধু মা নীলম একা নন, ছোট্ট মীনাক্ষীও সেই লড়াইয়ে অংশ নেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি মায়ের কাজে হাত লাগাতে শুরু করেন। নীলম রান্না করতেন আর মীনাক্ষী সেই টিফিন পৌঁছে দিতেন বিভিন্ন বাড়ি ও সরকারি দফতরে। প্রতিদিনের এই কাজ ছিল পরিশ্রমসাধ্য, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ হারাননি।
এই টিফিন পৌঁছে দেওয়ার অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিভিন্ন সরকারি অফিসে যেতে-যেতে তিনি কাছ থেকে দেখতেন প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাজকর্ম। সেই পরিবেশ তাঁর মনে নতুন স্বপ্নের জন্ম দেয়। মীনাক্ষী পরে বলেন, ‘প্রতিদিন অফিসে গিয়ে অফিসারদের কাজ করতে দেখতাম। তখনই মনে হত, একদিন আমাকেও এই জায়গায় পৌঁছতে হবে।’ এই ভাবনাই ধীরে ধীরে তাঁর লক্ষ্য নির্ধারণ করে। শিক্ষাজীবনেও মীনাক্ষী ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। স্কুলজীবন থেকেই তাঁর ফলাফল ছিল নজরকাড়া। দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় তিনি ঋষিকেশে প্রথম স্থান অধিকার করেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি পড়াশোনায় কোনও রকম দাঁড়ি পড়তে দেননি। পরিবারের পরিস্থিতি তাঁকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
ইউকেপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কঠোর নিয়ম মেনে পড়াশোনা করেছেন তিনি। দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা ছিল তাঁর রুটিন। নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এসব কিছু থেকেই নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘যখন লক্ষ্য স্থির করি, তখন আর অন্য দিকে তাকাইনি। শুধু পড়াশোনা আর প্রস্তুতিই ছিল আমার কাজ।’
এই ধারাবাহিক পরিশ্রমই মীনাক্ষীকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয়। ২০২৪ সালের ইউকেপিএসসি পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অর্জন করে তিনি প্রমাণ করে দেন যে প্রতিকূল পরিস্থিতি সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। বর্তমানে মীনাক্ষী ভাটিয়া ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মীনাক্ষীর এই সাফল্য সমাজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করছে। আর্থিক অসুবিধা, পারিবারিক চাপ পাশে রেখে কীভাবে লক্ষ্যপূরণ সম্ভব, তাঁর জীবন তার উদাহরণ। তাঁর লড়াই শুনে অনেকেই নতুন করে নিজেদের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন।
মীনাক্ষীর মা নীলম ভাটিয়া তাঁর এই সাফল্যে গর্বিত। তিনি বলেন, ‘ও ছোট থেকেই খুব পরিশ্রমী। অনেক কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছে, কিন্তু কখনও হার মানেনি।’ মায়ের এই লড়াই ও ত্যাগই মীনাক্ষীর জীবনের অন্যতম ভিত্তি। বর্তমানে মীনাক্ষী তাঁর দায়িত্বের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, লক্ষ্য স্থির করে নিয়মিত পরিশ্রম করলে সাফল্য আসবেই। তিনি মনে করেন, প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রচেষ্টাই বড় সাফল্যের পথ তৈরি করে। অন্যদিকে, এখন যখন সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া হাজার হাজার পরীক্ষার্থী নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, তখন মীনাক্ষীর এই গল্প তাঁদের কাছে এক বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। টিফিন পৌঁছে দেওয়া থেকে প্রশাসনিক পদে পৌঁছনোর এই যাত্রা দেখিয়ে দেয় ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে কোনও লক্ষ্যই অসম্ভব নয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Meenakshi Seshadri comeback Bollywood | ৩০ বছর পর মুম্বইয়ে ফেরা, নতুন করে কাজের খোঁজে প্রাক্তন তারকা মীনাক্ষী শেষাদ্রি



