সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: বহু বছর ধরে দূষণে জর্জরিত যমুনা নদী (Yamuna River) নিয়ে এবার বড় সিদ্ধান্তের পথে কেন্দ্র। ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে যমুনায় কোনও অশোধিত বর্জ্য প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না, এই নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে তৎপরতা বেড়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) -এর উদ্যোগে এই পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। দিল্লির পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দিল্লি জুড়ে প্রায় ৮০টি সিউয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (STP) ও শিল্প বর্জ্য শোধনাগার তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পগুলি সম্পূর্ণ হলে রাজধানীর বিপুল পরিমাণ নোংরা জল শোধন করে তবেই যমুনায় ফেলা সম্ভব হবে। বর্তমানে দিল্লির বিপুল অংশের অশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে, যা দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। নতুন পরিকল্পনায় সেই প্রবাহ বন্ধ করার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ‘২০২৮ সালের মধ্যে যমুনায় একফোঁটা অশোধিত বর্জ্যও পড়তে দেওয়া হবে না। এই লক্ষ্য পূরণে সমস্ত দফতরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’ এই ঘোষণার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। দিল্লির জল ব্যবস্থাপনায় এই প্রকল্প বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল পশুপালন থেকে উৎপন্ন বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা। দিল্লিতে প্রায় ১.২৫ লক্ষ গরু ও মহিষ রয়েছে, যাদের গোবর ও অন্যান্য বর্জ্যের একটি বড় অংশ এতদিন সরাসরি যমুনায় গিয়ে মিশত। এবার সেই প্রবণতা বন্ধ করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মাধ্যমে এই বর্জ্যকে জৈব সার, বায়োগ্যাস এবং অন্যান্য উপযোগী পণ্যে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগকে অনেকেই নদী পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করছেন।
দিল্লি জল বোর্ড (Delhi Jal Board) -এর আধিকারিকদের বক্তব্য, নতুন যে শোধনাগারগুলি তৈরি হচ্ছে, সেগুলি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। এগুলি শুধু দূষণ কমাবে না, তা নদীর জলের গুণমান উন্নত করতেও সাহায্য করবে। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্ল্যান্ট পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে এবং প্রাথমিক ফল ইতিবাচক বলেই সূত্রের খবর। পূর্ণমাত্রায় চালু হলে প্রতিদিন কয়েকশো কোটি লিটার বর্জ্য জল শোধন করা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, যমুনা নদী দিল্লির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অথচ বছরের পর বছর ধরে অবাধ দূষণের ফলে এই নদী প্রায় প্রাণহীন অবস্থায় পৌঁছেছে। শীতকালে নদীর ওপর সাদা ফেনার স্তর জমে যায় এবং তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতেই এবার সময়সীমা নির্ধারণ করে কাজ শুরু করা হয়েছে।
পরিবেশ বিদ মহলের একাংশ সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, শুধুমাত্র পরিকাঠামো গড়ে তুললেই হবে না, সেগুলিকে নিয়মিত চালু রাখা এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায়, শোধনাগার তৈরি হলেও বিদ্যুৎ সমস্যা বা ব্যবস্থাপনার অভাবে সেগুলি অচল হয়ে পড়ে। ফলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। তাই এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক নজরদারি অপরিহার্য। এই ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। আসন্ন দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ধরনের পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে প্রশাসনিক মহলের দাবি, এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, তা দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশ রক্ষা।
যমুনা নদীকে দূষণমুক্ত করা একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। বহু বছর ধরে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। এবার নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সরকার সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চেষ্টা করছে। আগামী কয়েক বছরে এই প্রকল্প কতটা সফল হয়, তার ওপর নির্ভর করবে দিল্লির পরিবেশের ভবিষ্যৎ। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু যমুনা নয়, দেশের অন্যান্য দূষিত নদী পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে। ফলে ২০২৮ সালের এই ডেডলাইন এখন শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়, বরং পরিবেশ রক্ষার একটি বড় পরীক্ষাও বটে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Yamuna water agreement, Haryana Rajasthan dispute, Amit Shah MoU | যমুনার জল নিয়ে ৩২ বছরের বিবাদে ইতি, হরিয়ানা-রাজস্থানের ঐতিহাসিক চুক্তি



