সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মাণ্ড্য: জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কেটেছে মানুষের কাছে হাত পেতে। কর্নাটকের মাণ্ড্যের (Mandya) বিভিন্ন রাস্তায় বসে তাঁর ভিক্ষা করেই দিন চলত। পোশাক-পরিচ্ছদ, জীবনযাপন কিংবা থাকার জায়গা কোনও কিছুতেই ছিল না বিলাসিতার ছাপ। অথচ মৃত্যুর পর তাঁর ছোট্ট ভাড়া ঘরে ঢুকে এমন দৃশ্য দেখলেন প্রতিবেশীরা, যা তাঁদের কল্পনারও বাইরে। একের পর এক বস্তা খুলতেই বেরিয়ে এল নোটের বান্ডিল এবং অসংখ্য মুদ্রা। মোট ৩০টি বস্তার ভিতর থেকে উদ্ধার হল প্রায় ৮ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। মৃত ওই বৃদ্ধার নাম হুর উন্নিসা (Hoor Unnisa)। বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। স্থানীয় সূত্রে খবর, মাণ্ড্য শহরের একটি ভাড়া ঘরে বোনের সঙ্গে তিনি থাকতেন। দুই বোনেরই বিয়ে হয়নি। জীবিকার জন্য দু’জনেই রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করতেন। দিনের পর দিন মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে যে টাকা তাঁরা পেতেন, তার একটি বড় অংশ খরচ না করে জমিয়ে রাখতেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা খবর। সেই সঞ্চয়ের পরিমাণ যে এতটা হতে পারে, তা অবশ্য প্রতিবেশীদের কেউই ভাবতে পারেননি।
প্রায় দু’বছর আগে হুর উন্নিসার বোন মারা যান। এরপর ওই ভাড়া ঘরে হুর উন্নিসা একাই বসবাস করতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শারীরিক সমস্যাও বেড়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বেশ কিছু দিন ধরেই বয়সজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন বৃদ্ধা। রবিবার আচমকাই তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। এরপর প্রতিবেশীরা তাঁর ঘরে যান। ঘরের ভিতরে ঢুকে প্রথমে তাঁদের নজরে আসে বেশ কয়েকটি বস্তা। সংখ্যাটা কম নয়, প্রায় ৩০টি। বস্তাগুলি কেন রাখা হয়েছে, তার ভিতরে কী রয়েছে, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয় স্থানীয়দের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত বস্তাগুলি খুলতেই বদলে যায় গোটা ছবিটা। ভিতরে ছিল বহু বছরের জমিয়ে রাখা টাকা। বেশির ভাগই ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট। এর পাশাপাশি ছিল প্রচুর কয়েন। কোথাও নোটের গুচ্ছ, কোথাও আবার মুদ্রার স্তূপ। ছোট্ট ঘরটি দীর্ঘ জীবনের সঞ্চয়ের ইতিহাস। টাকা গোনার কাজ শুরু হলে আরও বিস্ময় তৈরি হয়। সব নোট ও মুদ্রা মিলিয়ে পাওয়া যায় প্রায় ৮ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ জীবনের অধিকাংশ সময় ভিক্ষা করে কাটানো একজন বৃদ্ধার ঘরে মৃত্যুর পর উদ্ধার হল কয়েক লক্ষ টাকার সঞ্চয়। বড় অঙ্কের নোট না, তবে অল্প অল্প করে পাওয়া টাকা জমিয়েই এত বড় অঙ্ক তৈরি করেছিলেন হুর। এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নও উঠেছে। কেন এত টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন ওই বৃদ্ধা? কী উদ্দেশ্যে টাকা রেখে গিয়েছিলেন? নিজের জীবদ্দশায় সেই সঞ্চয়ের কোনও অংশ ব্যবহার করেছিলেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু তাঁর ঘরে পাওয়া টাকার পরিমাণ থেকে বোঝা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে সামান্য আয় থেকেও তিনি নিয়মিত টাকা সরিয়ে রাখতেন।
হুর উন্নিসার জীবনযাত্রার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া টাকার অঙ্কের এই বৈপরীত্যই ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় এনেছে। রাস্তায় বসে ভিক্ষা করা এক বৃদ্ধার কাছে এত টাকা থাকতে পারে, এমন ধারণা স্থানীয়দের অনেকেরই ছিল না। কারণ বাইরে থেকে তাঁকে দেখে সাধারণত একজন দরিদ্র বৃদ্ধা বলেই মনে হত। তাঁর জীবনের সঞ্চয় যে এভাবে বস্তায় বস্তায় জমে রয়েছে, তা মৃত্যুর আগে কেউ জানতে পারেননি। উল্লেখ্য, হুরের মৃত্যুর পর তাঁর দুই ভাইয়ের হাতে ওই টাকা তুলে দেওয়া হয় বলে উল্লেখ। স্থানীয়দের তরফে জানানো হয়েছে, মোট ৮ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে এক ভাইকে দেওয়া হয়েছে ৬ লক্ষ টাকা। অন্য ভাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বোনের বহু বছরের সঞ্চয় শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিবারের কাছেই পৌঁছেছে।
কর্ণাটকের এই ঘটনার আরও একটি দিক রয়েছে। দ্বিতীয় ভাই নিজের ভাগে পাওয়া ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা একটি মসজিদে দান করে দিয়েছেন বলে সূত্রের খবর। ফলে বৃদ্ধার সঞ্চিত অর্থের একটি অংশ ধর্মীয় কাজে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের কাছে বিষয়টি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, হুর উন্নিসার জীবনযাত্রা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি মাণ্ড্যের বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করতেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বোন। দুই বোনের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। নিজেদের জন্য বড় কোনও খরচ না করে তাঁরা টাকা জমিয়ে রাখতেন। বোনের মৃত্যুর পর হুর আরও একা হয়ে পড়েন। তারপরও নিজের মতো করে হুর জীবন কাটিয়ে গিয়েছেন। প্রসঙ্গত, এখানে ১০, ২০ কিংবা ৫০ টাকার মতো ছোট অঙ্কের নোটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি একটি করে পাওয়া সামান্য অর্থই বছরের পর বছর জমতে জমতে কয়েক লক্ষ টাকায় পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অসংখ্য কয়েন। ফলে টাকার পরিমাণ বড় হলেও তা একসঙ্গে পাওয়া কোনও বড় অঙ্কের অর্থ নয়। দীর্ঘ সময়ের ছোট ছোট সঞ্চয়ের ফল।
মৃত্যুর পরে ৩০টি বস্তার ভিতর থেকে টাকা উদ্ধারের ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, এত দিন ওই ঘরে টাকা থাকার বিষয়টি কারও নজরে এল না কেন। বৃদ্ধার জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সাধারণ হওয়ায় তাঁর আর্থিক সঞ্চয়ের বিষয়ে প্রতিবেশীদের ধারণাও ছিল না বলে জানা গিয়েছে। ঘটনাটি আরও একটি সামাজিক বাস্তবতার দিক সামনে এনেছে। সামান্য আয় করা মানুষের কাছে নিয়মিত অল্প অল্প করে সঞ্চয়ও একদা সময় বড় অঙ্কে পৌঁছতে পারে। হুর উন্নিসার ক্ষেত্রে সেই সঞ্চয় এতটাই বেড়েছিল যে মৃত্যুর পর তা গুনতে গিয়ে প্রতিবেশীদেরই অবাক হতে হয়। তবে জীবদ্দশায় সেই অর্থ কী ভাবে ব্যবহার করবেন বা কাদের জন্য রেখে যাবেন, সে বিষয়ে তিনি কাউকে কিছু জানিয়েছিলেন কি না, তা জানা যায়নি।
মাণ্ড্যের এই ঘটনা, একজন বৃদ্ধার দীর্ঘ জীবনের চুপচাপ সঞ্চয়ের ছবিও সামনে এনেছে। প্রতিদিনের ভিক্ষা থেকে পাওয়া ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকা কিংবা হাতে আসা কয়েন ইত্যাদি সবকিছুকে জমিয়ে রেখে শেষ পর্যন্ত প্রায় ৮ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার সঞ্চয় করেছিলেন হুর উন্নিসা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই অর্থের কথা প্রকাশ্যে আসেনি। মৃত্যুর পর ৩০টি বস্তা খুলতেই প্রকাশ্যে এল তাঁর গোপন সঞ্চয়ের কাহিনি। পরিবারের হাতে সেই টাকা পৌঁছেছে, আর তার একটি অংশ মসজিদে দানও করা হয়েছে। মাণ্ড্যের এই ঘটনা তাই স্থানীয় মানুষের মধ্যে এখনও আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sugar Price Hike India 2026, Narendra Modi Government Decision | চিনির দাম কমাতে মোদী সরকারের বড় পদক্ষেপ, আমদানি করা চিনি দু’মাসের মধ্যে বাজারে বিক্রির নির্দেশ




