Ajit Doval China visit, Ajit Doval Wang Yi meeting | অজিত ডোভালের সঙ্গে বৈঠকে চিনের বার্তা, ‘দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিকোণে’ ভারত-চিন সম্পর্ক চান হান

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ভারত-চিন সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই কূটনৈতিক স্তরে ফের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়েছে। দু’দিনের চিন সফরের দ্বিতীয় দিনে চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই (Wang Yi) -এর সঙ্গে ২৫তম বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে বসেছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল (Ajit Doval)। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা থেকে শুরু করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ সহ বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে বলে উল্লেখ। ডোভালের সঙ্গে আলাদা ভাবে সাক্ষাৎ করেছেন চিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংও (Han Zheng)। তাঁর বক্তব্যে ভারত-চিন সম্পর্ককে ‘কৌশলগত ও দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টিকোণ’ থেকে দেখার আহ্বান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বেজিঙে (Beijing) ভারতীয় দূতাবাসের তরফে জানানো হয়েছে, অজিত ডোভাল এবং ওয়াং ই সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি-তে (LAC) শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই দেশের মধ্যে যে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে, তার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বহুপাক্ষিক মঞ্চে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।

আরও পড়ুন : Operation Sindoor latest news, Ajit Doval Operation Sindoor : ‘ভারতের সহনশীলতাকে দুর্বলতা ভাববেন না’, অপারেশন সিঁদুর নিয়ে পাকিস্তানকে কড়া বার্তা অজিত ডোভালের

ডোভালের সঙ্গে বৈঠকের পরে হান ঝেং বলেন, ‘চিন ও ভারতের উচিত কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে দেখা ও পরিচালনা করা।’ পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যে যে গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করার কথাও বলেন তিনি। চিনের তরফে দেওয়া এই বক্তব্যকে কেবল সীমান্ত আলোচনার মধ্যে আটকে না রেখে ভারত-চিন সম্পর্কের বৃহত্তর কাঠামোর দিকে তাকানোর উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলির একটি। ২০০৩ সাল থেকে ভারত ও চিনের মধ্যে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ে সীমান্ত আলোচনা চলছে। বর্তমানে ভারতের হয়ে সেই আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন অজিত ডোভাল এবং চিনের হয়ে দায়িত্বে রয়েছেন ওয়াং ই। ফলে তাঁদের বৈঠক দুই দেশের সীমান্ত সংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চিন সম্পর্কের পরিস্থিতি গভীর ভাবে বদলে যায়। পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় ও চিনা সেনার সংঘর্ষের পরে দীর্ঘ সময় ধরে এলএসি-তে সামরিক উত্তেজনা বজায় ছিল। সীমান্তে বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন, পরিকাঠামো নির্মাণ ও সামরিক প্রস্তুতি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তোলে। সেই পরিস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা শুরু হয় কূটনৈতিক ও সামরিক স্তরে। সীমান্ত বিরোধের পূর্ণ সমাধান এখনও হয়নি। তবে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা কমানো ও এলএসি-তে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ডোভাল-ওয়াং বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ায় এর দিকে নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের।

চিনের বিদেশ দফতরের মুখপাত্র লিন জিয়ান (Lin Jian) বলেছেন, বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনা ভারত-চিন সীমান্ত প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে মতবিনিময়ের প্রধান মাধ্যম। পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলিতে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই মঞ্চের গুরুত্ব রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ বেজিঙের তরফে বিশেষ প্রতিনিধি ব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে ধরে রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এই বৈঠকের সময় নিয়েও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিক্‌স (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা। ভারত এবার এই সম্মেলনের আয়োজক ও সভাপতি দেশ। সেখানে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping) যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা রয়েছে। তাঁর ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে এখনও বেজিঙের তরফে নিশ্চিত কোনও ঘোষণা করা হয়নি। তবে শি এলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের সম্ভাবনা থাকবে বলে উল্লেখ।

ভারত ও চিনের দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠক হলে সেটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব পেতে পারে। এর আগে ২০২৫ সালের অগস্টে তিয়ানজিনে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনের সময় মোদী এবং শি জিনপিংয়ের মধ্যে পার্শ্ববৈঠক হয়েছিল। ফলে পরবর্তী ব্রিক্‌স সম্মেলনকে ঘিরে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগের সম্ভাবনাও নজরে রয়েছে। ব্রিক্‌স সম্মেলনের আগে ডোভালের চিন সফর তাই আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। সীমান্ত নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন পথে এগোনো যায়, তা নিয়েও কথাবার্তা হয়েছে। অর্থনীতি ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রসঙ্গ উঠে আসা থেকে বোঝা যায়, আলোচনার পরিধি কেবল এলএসি-তে সীমাবদ্ধ ছিল না।

ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সীমান্তে উত্তেজনার প্রভাব দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কেও পড়েছে। আবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কারের মতো একাধিক বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে কখনও মিল, কখনও মতপার্থক্য দেখা যায়। ফলে সীমান্তের বাইরে বৃহত্তর সম্পর্কের কাঠামো নিয়েও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা নয়াদিল্লি ও বেজিঙের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অন্য দিকে, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে মাঝেমধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ সংলগ্ন এলএসি নিয়ে চিনের সেনার গতিবিধি ঘিরে বিভিন্ন সময়ে ভারত আপত্তি জানিয়েছে। সীমান্তে পরিকাঠামো নির্মাণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক স্তরে যোগাযোগ বজায় থাকলেও মাটির পরিস্থিতি নিয়ে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

গালওয়ান পরবর্তী সময়ে দুই দেশই বুঝেছে, সীমান্তে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলে। সেই কারণে সামরিক কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক, একাধিক স্তরে কথাবার্তা চালু রাখা হয়েছে। ডোভাল ও ওয়াংয়ের বৈঠক সেই ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এক্ষেত্রে চিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংয়ের বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ’ থেকে সম্পর্ক দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে তাৎক্ষণিক মতবিরোধের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। পাশাপাশি আগে হওয়া ঐকমত্য বাস্তবায়নের উপর জোর দিয়েছেন। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ চালু রাখার চিনা অবস্থানও এতে উঠে এসেছে।

ভারতের পক্ষ থেকেও সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখা হয়। নয়াদিল্লির অবস্থান বরাবরই, সীমান্তে শান্তি না থাকলে সম্পর্কের অন্য ক্ষেত্রগুলিতে স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা কঠিন। ফলে সীমান্তে উত্তেজনা কমানো ও পূর্ববর্তী চুক্তি ও বোঝাপড়া কার্যকর রাখার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন লক্ষ্য থাকবে ডোভাল-ওয়াং বৈঠকের পরবর্তী ফলাফল এবং আগামী দিনে সীমান্তে তার কোনও বাস্তব প্রভাব পড়ে কি না, তার দিকে। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরের ব্রিক্‌স সম্মেলনে শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য উপস্থিতি এবং সেখানে মোদীর সঙ্গে তাঁর কোনও বৈঠক হয় কি না, সেটিও ভারত-চিন সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সীমান্ত প্রশ্নের সমাধান এখনও বহু দূরে হলেও, কূটনৈতিক যোগাযোগ সচল রাখা ও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়াস যে দুই পক্ষই চালিয়ে যাচ্ছে, বেজিঙের সাম্প্রতিক বৈঠক থেকে তারই ইঙ্গিত মিলছে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India paddy cultivation 2026, paddy cultivation area decline, ভারতে ধান চাষের জমি কমেছে ৩.৬৫ শতাংশ : তিন রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতিতে ধান চাষে বড় ধাক্কা

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন