সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দেশের বাজারে চিনির দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় এবার আমদানি করা চিনির মজুত নিয়ে কড়া অবস্থান নিল কেন্দ্রীয় সরকার। বিদেশ থেকে আমদানি করা চিনি দীর্ঘদিন গুদামে রেখে দেওয়া যাবে না। আমদানির পরে সর্বোচ্চ দু’মাসের মধ্যে সেই চিনি প্রক্রিয়াজাত বা পরিশোধন করে খোলা বাজারে বিক্রি করতে হবে বলে নতুন নির্দেশ জারি করেছে নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) সরকার। বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের (Ministry of Commerce and Industry) তরফে সোমবার প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজারে জোগান বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো এবং মজুতদারি ও কালোবাজারির সম্ভাবনা ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সময়ে চিনির দাম দ্রুত বেড়েছে। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে খুচরো ও পাইকারি বাজারে চিনির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। উৎসবের মরসুমে চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি আখ উৎপাদনে আবহাওয়াজনিত ক্ষতির প্রভাবও বাজারে পড়েছে। ফলে জোগান ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কেন্দ্র এবার আমদানি করা পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সময়সীমাও বেঁধে দিল। কেন্দ্রের আগের নির্দেশে আমদানি করা চিনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধন করার কথা বলা হলেও সেই প্রক্রিয়ার জন্য আলাদা করে কত দিনের সময় দেওয়া হবে, তা নির্দিষ্ট ছিল না। তবে বাজারে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি করা চিনি ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বিক্রি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সেই ব্যবস্থাকে আরও কড়া করা হয়েছে। এখন আমদানির পর দু’মাসের মধ্যেই প্রক্রিয়াজাত করে তা বাজারে ছাড়তে হবে। ফলে আমদানিকারক বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি দীর্ঘ সময় চিনি মজুত করে রেখে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করতে পারবে না, এমনটাই সরকারের উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে চলতি চিনি উৎপাদন মরসুমের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে চিনি উৎপাদনের অর্থবর্ষ সাধারণত অক্টোবর থেকে পরের বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধরা হয়। চলতি চিনি অর্থবর্ষ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর এবং তা শেষ হবে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। মরসুমের শুরুতে ধারণা ছিল, এ বার দেশে চিনি উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় অনেকটা বাড়তে পারে। উৎপাদন বেশি হলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত চিনি থাকার সম্ভাবনা ছিল। ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো-এনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (Indian Sugar & Bio-Energy Manufacturers Association) মরসুমের শুরুতে অনুমান করেছিল, আগের অর্থবর্ষের তুলনায় চিনি উৎপাদন প্রায় ১৮.৩ শতাংশ বাড়তে পারে। উৎপাদন বৃদ্ধির সেই সম্ভাবনার উপর নির্ভর করেই কেন্দ্র বছরের শুরুতে সীমিত পরিমাণে চিনি রফতানির অনুমতি দিয়েছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ১৫ লক্ষ টন চিনি রফতানির অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আরও ৫ লক্ষ টন চিনি রফতানির ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু, কয়েক মাসের মধ্যেই উৎপাদন নিয়ে আগের হিসাব বদলে যায়। মে মাসে সরকার এবং শিল্পমহলের পূর্বাভাসে পরিবর্তন আসে। উৎপাদনের সম্ভাবনা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা বিবেচনা করে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে চিনি রফতানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করে কেন্দ্র। অর্থাৎ দেশের বাজারে পর্যাপ্ত চিনি রাখার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর পর জুলাই মাসে চিনিকলগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ানো হয়। অগস্টে কেন্দ্র মাসিক চিনি বিক্রির পরিমাণ ২২.৫ লক্ষ টনে সীমাবদ্ধ করে দেয়। আগের বছরের তুলনায় এই সীমা খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি। কিন্তু মরসুমের শুরুতে উৎপাদন বৃদ্ধির অনুমান থাকায় শিল্পমহলের একাংশ আশা করেছিল, বাজারে মাসিক বিক্রির অনুমোদিত পরিমাণ বাড়তে পারে। পরে উৎপাদন ও সরবরাহের পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা আর বাস্তবায়িত হয়নি। এ দিকে চিনির দাম বাড়ার সঙ্গে ইথানল উৎপাদনের বিষয়টিও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় এসেছে। পেট্রলে ইথানল মেশানোর নীতি নিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে কেন্দ্রের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিতে পেট্রলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ইথানল তৈরির একটি উৎস হল আখ এবং চিনি শিল্পের বিভিন্ন উপাদান। ফলে চিনি উৎপাদনের একটি অংশ জ্বালানি তৈরির কাজে চলে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী শিবির এবং ব্যবসায়ী মহলের একাংশ।
চিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মহলের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে প্রায় ৩২ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি ইথানল উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে মানুষের খাদ্য হিসাবে বাজারে থাকা চিনির পরিমাণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ইথানল উৎপাদনের নীতি খাদ্যশস্য ও চিনির বাজারে চাপ তৈরি করছে। যদিও কেন্দ্র এই অভিযোগ মানতে নারাজ। খাদ্য মন্ত্রকের (Ministry of Consumer Affairs, Food and Public Distribution) তরফে জানানো হয়েছে, ইথানল উৎপাদনে চিনির ব্যবহার বরং সময়ের সঙ্গে কমেছে। ২০২২-২৩ সালে ইথানল তৈরিতে প্রায় ১২ শতাংশ চিনি ব্যবহার করা হলেও ২০২৫-২৬ সালে সেই হার কমে ৯ শতাংশ হয়েছে বলে সরকারের দাবি। পাশাপাশি মোট ইথানল উৎপাদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভুট্টার মতো দানাশস্য থেকে তৈরি হচ্ছে বলেও কেন্দ্র জানিয়েছে। ফলে ইথানল নীতির কারণে সরাসরি চিনির দাম বেড়েছে, এই যুক্তির সঙ্গে কেন্দ্র একমত নয়।
তবে বাজার পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত বিদেশ থেকে চিনি আমদানির পথ খুলতে হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় পরে ভারতকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চিনি আমদানির অনুমতি দিতে হয়েছে বলে সরকারি সিদ্ধান্তে উঠে এসেছে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টন চিনি আমদানি করা যাবে। এই আমদানির ক্ষেত্রে কোনও শুল্ক দিতে হবে না। ফলে বিদেশি চিনি দ্রুত দেশে এনে বাজারের সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, কেন্দ্রের নতুন দু’মাসের সময়সীমা তাই আমদানি নীতির পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি করা চিনি যদি দীর্ঘদিন গুদামে পড়ে থাকে, তা হলে বাজারে তার সরবরাহ বাড়বে না। বরং মজুত করে রেখে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেই আশঙ্কা কমাতেই আমদানির পরে দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উৎসবের মরসুম সামনে থাকায় চিনির বাজার নিয়ে কেন্দ্রের নজর আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতীয় রান্নাঘরে সারা বছর চিনির চাহিদা থাকলেও উৎসবের সময়ে মিষ্টি ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা আরও বাড়ে। সেই সময় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে দাম বৃদ্ধির চাপ সাধারণ মানুষের উপর পড়তে পারে। তাই আমদানি করা ১০ লক্ষ টন চিনির দ্রুত বাজারজাতকরণকে সরকার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
এখন লক্ষ্য থাকবে নতুন নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং আমদানি করা চিনি কত দ্রুত বাজারে পৌঁছয় তার দিকে। একই সঙ্গে দেশের আখ উৎপাদন, চিনিকলগুলির মজুত, মাসিক বিক্রির সীমা এবং ইথানল উৎপাদনে চিনির ব্যবহার, এই সব বিষয়ও আগামী দিনে চিনির দামের গতিপথ নির্ধারণ করবে। কেন্দ্রের লক্ষ্য বাজারে পর্যাপ্ত জোগান বজায় রেখে চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। আমদানি করা চিনির ক্ষেত্রে দু’মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া সেই প্রচেষ্টারই নতুন পদক্ষেপ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi | মোদীর পর কে? ২০৩৪-এর ভারত, বিজেপির উত্তরসূরি নিয়ে জল্পনা, যুব নেতৃত্ব বনাম অভিজ্ঞতার লড়াই




