সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ড থেকে হাজরা মোড়, শুক্রবার কলকাতার রাজপথ রূপ নিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের মঞ্চে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর নেতৃত্বে শুরু হল দীর্ঘ মিছিল, যার বার্তা একটাই, ‘রাস্তাই আমাদের রাস্তা’। দিল্লির বঞ্চনা, লাঞ্ছনা এবং বাংলার মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে এই কর্মসূচীকে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) তরফে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। দুপুর গড়াতেই যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ড চত্বরে জমতে শুরু করে ভিড়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দলীয় কর্মী, সমর্থক সকলের উপস্থিতিতে উত্তাল হয়ে ওঠে এলাকা। মিছিল শুরুর আগে মঞ্চবিহীন বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এই অঞ্চলের সকল নাগরিকবৃন্দকে, মা-মাটি-মানুষকে প্রণাম জানাই। নতুন বছরের শুভেচ্ছা। আপনাদের সমর্থন বাংলার মানুষকে বিশ্বের দরবারে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’ তাঁর কণ্ঠে ছিল কৃতজ্ঞতার সুর, একই সঙ্গে ছিল প্রতিবাদের দৃঢ়তা।

মমতার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে দিল্লির বিরুদ্ধে ক্ষোভ। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী বাংলার মানুষের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘দিল্লির বঞ্চনা, লাঞ্ছনা, অত্যাচার, অপমানের বিরুদ্ধে রাস্তাই আমাদের রাস্তা। দুই কোটি মানুষের ভোট কেটে দেওয়া হচ্ছে, গণতন্ত্রকে দুর্বল করা হচ্ছে।’
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji Subhas Chandra Bose) -এর উক্তি, যেখানে আন্দোলনের পথ হিসেবেই রাস্তাকে বেছে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। যাদবপুরের মাটিকে ‘লড়াইয়ের মাটি’ বলে অভিহিত করেন মুখ্যমন্ত্রী। উদ্বাস্তু আন্দোলন থেকে শুরু করে ছাত্ররাজনীতি, এই এলাকার ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যাদবপুরের মাটি প্রতিবাদের মাটি। এখান থেকেই বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছে।’ তাঁর এই বক্তব্যে উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে।

বিকেল তিনটে নাগাদ মিছিল শুরু হয়। মমতার এক পাশে ছিলেন তৃণমূল সাংসদ দেব (Dev), অন্য পাশে বিধায়ক সোহম চক্রবর্তী (Soham Chakraborty)। সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim), অরূপ বিশ্বাস (Aroop Biswas) -সহ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। মিছিলে অংশ নেন একাধিক সাংসদ, বিধায়ক, কাউন্সিলর এবং টেলি-তারকারাও। রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি এই মিছিল যেন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সমর্থনের প্রতীক হয়ে ওঠে। রাস্তার দু’পাশে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে পড়েন। কেউ হাত নাড়েন, কেউ স্লোগান দেন, কেউ মোবাইলে ছবি ও ভিডিও বন্দি করেন এই মুহূর্ত। ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ’, ‘বাংলার অধিকার ফিরিয়ে দাও’ এমন নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। পুলিশি নিরাপত্তা ছিল চোখে পড়ার মতো, তবে কোথাও কোনও বিশৃঙ্খলার ছবি দেখা যায়নি। উল্লেখ্য, এই মিছিলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বৃহস্পতিবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (Enforcement Directorate) -এর তরফে আইপ্যাক (I-PAC) সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈন (Pratik Jain) -এর লাউডন স্ট্রিটের ফ্ল্যাট এবং সল্টলেকের দফতরে তল্লাশি চালানো হয়। সেই ঘটনার পরেই মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, তাঁর দলের নির্বাচনী কৌশল ও গুরুত্বপূর্ণ নথি হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই অভিযান। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে কাজ করছে।
মমতা পরিষ্কার ভাষায় আঙুল তোলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) -এর দিকে, যাঁর অধীনেই ইডি কাজ করে বলে তিনি দাবি করেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘এই ধরনের হামলার জবাব জনগণই দেবে।’ সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতরের বাইরে দাঁড়িয়েই তিনি শুক্রবারের এই মিছিলের ডাক দেন। সেই ঘোষণারই বাস্তব রূপ দেখা গেল যাদবপুর থেকে হাজরা পর্যন্ত রাজপথে। বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ হাজরা মোড়ে এসে মিছিল শেষ হয়। সেখানে কোনও বড় মঞ্চসভা না হলেও, গোটা কর্মসূচী জুড়ে ছিল প্রতিবাদের স্পষ্ট সুর। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদযাত্রা শুধু একটি দিনের প্রতিবাদ নয়, বরং আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রস্তুতির ইঙ্গিত। দিল্লির সঙ্গে রাজ্যের টানাপড়েন, কেন্দ্রীয় সংস্থার ভূমিকা এবং গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্ন, এই মিছিল ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, ‘রাস্তাই আমাদের রাস্তা’ স্লোগানকে সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও দেখিয়ে দিলেন, রাজপথই তাঁর রাজনীতির প্রধান ভরসা। যাদবপুর থেকে হাজরা পর্যন্ত এই পদযাত্রা শুধুই একটি মিছিল নয়, বরং বাংলার রাজনীতিতে এক শক্তিশালী বার্তার প্রতিফলন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suryakumar Yadav | সূর্যকুমার যাদবের ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা, গিলের সহ-অধিনায়ক হওয়া বাড়াল চাপ




