সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে রাজনৈতিক অবস্থানের নাটকীয় পরিবর্তন, এই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে জাতীয় ও রাজ্য রাজনীতিতে। এপ্রিলে যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস -এর নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে কাঠগড়ায় তুলেছিল কংগ্রেস, জুনে সেই একই দল তাঁকেই শীর্ষ নেতৃত্বে আনার প্রস্তাব দিচ্ছে বলে খবর। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে উঠছে প্রশ্ন, এ কি কৌশলগত পরিবর্তন, না কি সুবিধাবাদী অবস্থান?
বিধানসভা নির্বাচনের সময় বাংলার রাজনৈতিক মঞ্চ ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। তৃণমূল, বিজেপি (BJP) এবং কংগ্রেস তিনটি দলই ভোটের লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মরিয়া ছিল। সেই সময় লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) বাংলায় এসে একাধিক সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘রাজ্যে একের পর এক দুর্নীতির ঘটনায় তৃণমূলের ভূমিকা রয়েছে।’ এমনকী তিনি মমতাকে ‘বিজেপির সহায়ক’ বলেও কটাক্ষ করেছিলেন। আরজিকর (RG Kar) কাণ্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিতর্ক সব কিছু নিয়েই তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল কংগ্রেস। সেই সময় রাহুলের বক্তব্যে ছিল কড়া সুর, যা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছিল। কিন্তু ভোটের ফল প্রকাশের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের অপ্রত্যাশিত পরাজয় এবং দলের অন্দরে বড়সড় ভাঙনের ঘটনা রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে সাজাতে শুরু করে। বিদ্রোহী বিধায়কদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব তৃণমূল শিবিরে চাপ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতেই কংগ্রেসের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে শুরু করে।
সূত্রের খবর, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজেদের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। সোনিয়া গান্ধী -এর (Sonia Gandhi) ১০ জনপথের বাসভবনে মমতার সঙ্গে একটি বৈঠক হয়েছে বলেও সূত্রের খবর। সেই বৈঠক ঘিরেই জল্পনা আরও জোরদার হয়েছে। রাজনৈতিক অন্দরে শোনা যাচ্ছে, ওই বৈঠকে কংগ্রেস নেতৃত্ব মমতাকে জাতীয় স্তরে একটি বড় দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা হয়নি, তবে মমতা এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করেননি বলেই খবর। তিনি সময় চেয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
একই দিনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) -এর সঙ্গে রাহুল গান্ধীর বৈঠকও নজর কেড়েছে। এই ধারাবাহিক বৈঠকগুলির ফলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে, তৃণমূলের বর্তমান সংকটকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস নতুন একটি সমীকরণ গড়ে তুলতে চাইছে। কিন্তু এই প্রস্তাব ঘিরে সকলের প্রতিক্রিয়া এক নয়। তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তারা কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা করছে না। বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) বলেন, ‘আমরা কংগ্রেসে মার্জ হচ্ছি না।’ তাঁর এই মন্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন কংগ্রেসের প্রস্তাব দিয়ে সহজে মেটার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল শিবির এখনও এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। এই নীরবতাই জল্পনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মমতার সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। একদিকে তাঁকে নিজের দলের ভাঙন সামাল দিতে হবে, অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থানও বিবেচনা করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের ভোলবদল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও যাঁকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছিল, তাঁকেই এখন শীর্ষে বসানোর প্রস্তাব, এই পরিবর্তনকে অনেকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা বলছেন। আবার অনেকেই এটিকে ‘দ্বিচারিতা’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। বিজেপি শিবিরও এই ইস্যুতে কংগ্রেসকে নিশানা করতে শুরু করেছে। তাদের মতে, কংগ্রেস নিজের সুবিধামতো অবস্থান বদলাচ্ছে। যদিও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই সমালোচনার সরাসরি জবাব এখনও পাওয়া যায়নি।
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। তৃণমূলের ভাঙন, কংগ্রেসের নতুন প্রস্তাব, এবং জাতীয় স্তরের সমীকরণ—সব কিছু মিলিয়ে আগামী দিনগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী সিদ্ধান্ত নেন, তার উপর অনেকটাই নির্ভর করবে রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, মমতা কী কংগ্রেসের প্রস্তাবে সাড়া দেবেন, না কি নিজের দলকে পুনর্গঠনের পথেই এগোবেন? উত্তর সময়ই দেবে, তবে তার আগে পর্যন্ত এই ইস্যু ঘিরে উত্তাপ বাড়তেই থাকবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee Dev statement | তৃণমূল ছাড়ছেন না দেব, ‘দিদির সঙ্গেই আছি’! শুভেন্দুর বৈঠকের পর ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে বড় বার্তা




