সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পূর্ব বর্ধমান : পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাটে প্রশাসনিক বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন জোর জল্পনা, তখনই সমস্ত বিতর্কে ইতি টানার চেষ্টা করলেন ঘাটালের তিন বারের সাংসদ দেব (Deepak Adhikari)। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) বৈঠক থেকে বেরিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘নতুন তৃণমূলে যাচ্ছি না, আমার ভালবাসা সারা জীবন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) জন্য থাকবে।’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছেসাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) অন্দরেই একাংশ সাংসদের অবস্থান নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের (Bhupender Yadav) সঙ্গে বৈঠক এবং তার পরেই রাজ্যের প্রশাসনিক বৈঠকে দেবের উপস্থিতি ঘিরে প্রশ্ন উঠছিল। এই আবহেই দেব নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি নতুন তৃণমূলে যাচ্ছি না। যত দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে রয়েছেন, তাঁর সঙ্গেই আছি।’
তবে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রেখেছেন অভিনেতা-সাংসদ। তাঁর কথায়, ‘ভবিষ্যতে আমার রাজনৈতিক জীবনে কী ঘটবে, আমি এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না।’ যদিও তিনি এটাও জানান যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যত দিন নেতৃত্বে আছেন, তত দিন তাঁর পাশে থাকার সিদ্ধান্তে কোনও পরিবর্তন নেই। দেব তাঁর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যদি দিল্লি গিয়ে থাকি বা মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিয়ে থাকি, সেটা করেছি ঘাটালের নির্বাচিত সাংসদ হিসেবে।’ তাঁর বক্তব্য, ‘আমাকে যারা ভোট দিয়েছেন, তারা যেন কোনও অবস্থাতেই না ভাবেন যে ভুল মানুষকে নির্বাচিত করেছেন। আমি দিল্লি বা নবান্ন, যেখানেই গিয়েছি, ঘাটালের মানুষের অধিকার ও উন্নয়নের দাবিতেই গিয়েছি।’
এই প্রশাসনিক বৈঠকে ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে বন্যা সমস্যায় জর্জরিত ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের মানুষের জন্য এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেব বলেন, ‘আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে যে স্বপ্নের প্রকল্প শুরু হয়েছিল, তা এ বার সফল ভাবে শেষ হবে বলেই আমার বিশ্বাস। উনি আমাকে কথা দিয়েছেন।’ তিনি আরও জানান, ঘাটালের সবচেয়ে বড় সমস্যা বন্যা, আর তার স্থায়ী সমাধান এই মাস্টার প্ল্যান। ‘২০১৪ সাল থেকে এই লড়াই চলছে। ২০২৪ সালে আমি যখন ভোটে দাঁড়াব না বলেছিলাম, তখন দিদি কথা দিয়েছিলেন এবং সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল,’ বলেন দেব।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেবের বক্তব্যে সৌজন্যের সুরও ধরা পড়েছে। তিনি বলেন, ‘শুভেন্দু অধিকারী এই রাজ্যের গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী, এই সত্যিটা সবাইকে মানতেই হবে।’ এই মন্তব্য রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’ বাস্তবায়ন নিয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ঘাটালের সাংসদ বলেছেন, এটা তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি ছিল। আমরাও নির্বাচনে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমরা এই কাজ করব। এখানে কে কৃতিত্ব পাবে, সেটা বড় কথা নয়, উন্নয়নই আসল বিষয়।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার হয়েছে।
উল্লেখ্য, তৃণমূলের প্রায় ২০ জন সাংসদের একটি তথাকথিত ‘বিদ্রোহী’ তালিকা ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সেই তালিকায় দেবের নামও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দিল্লিতে ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে যে বৈঠক হয়েছিল, সেখানে কাকলি ঘোষদস্তিদার (Kakoli Ghosh Dastidar), শতাব্দী রায় (Satabdi Roy) -এর সঙ্গে দেবও উপস্থিত ছিলেন বলে সূত্রের খবর। পরে ওই বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারীও যোগ দেন। সেই বৈঠকের পর খবর ছড়ায়, এই সাংসদেরা আলাদা ব্লক তৈরি করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-কে সমর্থন করতে পারেন। তবে এই জল্পনার মাঝেই পরদিন দেবের মন্তব্য পরিস্থিতিকে নতুন মোড় দিয়েছে। তিনি একদিকে যেমন তৃণমূল নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন, অন্যদিকে উন্নয়নমূলক কাজের স্বার্থে সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করার বার্তাও দিয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেবের এই অবস্থান একদিকে দলীয় সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল, অন্যদিকে নিজের সাংসদ হিসেবে দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তা শুধু এলাকার মানুষকেই স্বস্তি দেবে না, রাজ্যের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে দেবের বার্তা যে তাৎপর্যপূর্ণ, তা বলাই যায়। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, বিজেপির সঙ্গে সম্ভাব্য সমীকরণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প, সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনীতি এখন নতুন সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে। আর সেই সমীকরণের কেন্দ্রেই রয়েছেন ঘাটালের সাংসদ দেব।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Adhir Chowdhury on TMC crisis | মমতাকে তীব্র কটাক্ষ করে তৃণমূল কর্মীদের কংগ্রেসে ডাক অধীর চৌধুরীর, বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ




