সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ২৮ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার এত বড় আকারে বিভাজনের মুখে পড়ল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই দলের অন্দরে যে অশান্তি তৈরি হয়েছিল, তা এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়েছে। একাধিক বিধায়ক একযোগে বিদ্রোহ ঘোষণা করে আলাদা শক্তি গড়ে তুলেছেন, যা ঘিরে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি। ঘটনার সূত্রপাত ৩ জুন। বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) ও সন্দীপন সাহা -এর (Sandipan Saha) নেতৃত্বে প্রথম দফায় ৫৮ জন বিধায়ক প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান জানান। তাঁরা বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বোস (Rathindranath Bose) -এর কাছে লিখিত সমর্থন জমা দিয়ে দাবি করেন, ‘আমরাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দল।’ দলত্যাগ বিরোধী আইনের বিধি অনুযায়ী দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হয়, যার সংখ্যা ৫৪। বিদ্রোহী শিবির সেই শর্ত পূরণ করেছে বলেই জানানো হয়।
এর পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। ১০ জুন পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিদ্রোহী বিধায়কের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪। আরও কয়েকজন বিধায়ক এই শিবিরে যোগ দেওয়ার পথে রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে সংখ্যার হিসেবে এই ভাঙন আরও বড় আকার নিতে পারে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বোস (Rathindranath Bose)। তিনি বিদ্রোহীদের দাবিকে গ্রহণ করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Ritabrata Banerjee) বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর নেতৃত্বাধীন মূল শিবির এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছে। সূত্রের খবর, এই মামলার শুনানি ১১ জুন নির্ধারিত হয়েছে।
বিদ্রোহী শিবিরের অবস্থানও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁরা জানিয়েছেন, ‘আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে দেখতে চাই, কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) -এর কোনও ভূমিকা চাই না।’ এই বক্তব্য থেকেই দলের ভিতরে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা বোঝা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই দলের মধ্যে ‘পরিবারকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত’ নিয়ে ক্ষোভ জমছিল বলে খবর, যা এবার প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। শুধু বিধানসভাতেই নয়, এই ভাঙনের প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় রাজনীতিতেও। সূত্রের দাবি, লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্তত ২০ থেকে ২২ জন সাংসদ পৃথক ব্লক তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা এনডিএ (NDA)-কে সমর্থনের দিকেও ঝুঁকতে পারেন বলে ইঙ্গিত মিলেছে। এই পরিস্থিতি বাস্তবে রূপ নিলে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। উল্লেখ্য, দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সাংগঠনিক অসন্তোষ এবং বিভিন্ন বিতর্কিত ঘটনার জেরে তৃণমূল এখন তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মূল শিবির, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের নেতৃত্বে বিদ্রোহী গোষ্ঠী, এবং তৃতীয় দিকে নীরব পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকা কিছু নেতা যাঁরা এখনও কোনও পক্ষ বেছে নেননি।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে আরও একাধিক প্রশ্ন। রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোয় এর প্রভাব কতটা পড়বে? সরকার পরিচালনায় কোনও জটিলতা তৈরি হবে কি? যদিও এখনও পর্যন্ত সরকার ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, তবে সংখ্যার হিসেবে এই বিদ্রোহ যে বড় চাপ তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যে দল রাজ্যে শক্ত ভিত গড়ে তুলেছিল, সেই দলের এই অবস্থায় অনেকেই দিশাহারা। বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান দেখা যাচ্ছে। কোথাও বিদ্রোহীদের সমর্থন বাড়ছে, আবার কোথাও মূল শিবির নিজেদের শক্তি ধরে রাখার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, আগামী কয়েকদিন এই পরিস্থিতির মোড় ঘোরাতে পারে। বিশেষ করে হাইকোর্টের রায় এবং আরও বিধায়কদের অবস্থান, এই দুই বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদি বিদ্রোহী শিবির তাদের সংখ্যা আরও বাড়াতে পারে, তা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
কিন্তু, এই লড়াই শুধু সংখ্যার নয়, নেতৃত্বেরও। কে প্রকৃত তৃণমূল! এই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। বিদ্রোহীরা নিজেদের ‘আসল’ দল দাবি করছে, আবার মূল শিবির সেই দাবি অস্বীকার করছে। ফলে আইনি এবং রাজনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই সংঘাত বাড়তে চলেছে। রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনা এক নতুন অধ্যায় খুলে দিল। তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) -এর ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নির্ধারণ করবে আগামী কয়েকটি দিন। আপাতত রাজ্য রাজনীতি উত্তপ্ত, আর নজর রয়েছে প্রতিটি নতুন আপডেটের দিকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ritabrata Banerjee Visits Sandipan Saha House, Kolkata Protest Controversy | বিক্ষোভ ঘিরে উত্তাপ, সন্দীপন সাহার বাড়িতে ঋতব্রতের টিম, রাজ্য রাজনীতিতে নতুন জল্পনা




