সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা: দোল পূর্ণিমার আবহে আকাশে দেখা গেল বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দৃশ্য। উপছায়ার গ্রাস পেরিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতায় ফিরে এল পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ। চন্দ্রগ্রহণ (Lunar Eclipse) শেষ হওয়ার পর রাতের আকাশে ফের জ্বলজ্বল করতে দেখা যায় চাঁদকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন শহরের ছাদ, সর্বত্রই ছিল এই মহাজাগতিক ঘটনার উচ্ছ্বাস।
চাঁদের নিজস্ব আলো নেই; সূর্যের আলো তার পৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছয়। কিন্তু যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে এসে পড়ে, তখন সূর্যের আলো সরাসরি চাঁদের গায়ে লাগে না। বদলে পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়তে শুরু করে। এই ঘটনাকেই বলা হয় চন্দ্রগ্রহণ। জ্যোতির্বিদ্যার ভাষায়, পৃথিবীর ছায়া দু’ভাগে বিভক্ত। উপছায়া ও গাঢ় ছায়া। উপছায়ার অংশে চাঁদ প্রবেশ করলে আলো কিছুটা ম্লান হয়, আর পূর্ণগ্রাসের সময় চাঁদ ঢেকে যায় গভীর ছায়ায়। পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের রং অনেক সময় লালচে দেখায়। এই অবস্থাকে ‘রক্ত চাঁদ’ বা ‘ব্লাড মুন’ (Blood Moon) বলা হয়। লাল আভা তৈরি হয় মূলত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যের আলোকে ভেঙে দিয়ে দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের লাল আলোকে চাঁদের দিকে পাঠানোর ফলে। ফলে সম্পূর্ণ অদৃশ্য না হয়ে চাঁদ তামাটে আভা নিয়ে দৃশ্যমান থাকে। এবারের গ্রহণে সেই লালচে আভা বহু জায়গা থেকেই দেখা গিয়েছে বলে খবর।
দোল পূর্ণিমার রাতেই এই গ্রহণ হওয়ায় তা ঘিরে আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। বহু মানুষ বিশ্বাস ও সংস্কৃতির কারণে গ্রহণের সময় বিশেষ নিয়ম মেনে চলেন। তবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা। গ্রহণ চলাকালীন চাঁদ ধীরে ধীরে পৃথিবীর উপছায়ায় ঢুকে আলো হারায়, পরে পূর্ণছায়া থেকে বেরিয়ে আবার স্বাভাবিক জ্যোৎস্নায় ফিরে আসে। গত রাতেও সেই ধাপে ধাপে পরিবর্তন নজরে এসেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, চন্দ্রগ্রহণ কেবল পূর্ণিমাতেই সম্ভব। কারণ, সেই সময় সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করে। তবে প্রতি পূর্ণিমায় গ্রহণ হয় না; কক্ষপথের সামান্য হেলানের কারণে অধিকাংশ সময় চাঁদ পৃথিবীর ছায়া এড়িয়ে যায়। নির্দিষ্ট জ্যামিতিক অবস্থান তৈরি হলেই তবেই গ্রহণ ঘটে। এবারের ঘটনাও ছিল সেই বিরল সমাপতনের ফল।
গ্রহণের শেষ পর্বে দেখা যায়, চাঁদের এক প্রান্ত থেকে ধীরে ধীরে ছায়া সরে যাচ্ছে। উপছায়া থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসার পর চাঁদ ফের পূর্ণ উজ্জ্বলতায় ধরা দেয়। দোলের রঙিন আবহের সঙ্গে আকাশের এই রূপ যেন অন্য মাত্রা যোগ করে। বহু শহরে মানুষ খালি চোখেই গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। চন্দ্রগ্রহণ দেখার জন্য কোনও বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না, কারণ এটি সূর্যগ্রহণের মতো চোখের জন্য ক্ষতিকর নয়। এই গ্রহণ ঘিরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থাও অনলাইন সম্প্রচারের আয়োজন করে। ছাত্রছাত্রী ও আকাশপ্রেমীরা সরাসরি সম্প্রচারে গ্রহণের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য ছবি ও ভিডিও। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই-সহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে লালচে চাঁদের ফ্রেম ভাইরাল হয়। আবার ঐতিহাসিক দিক থেকেও ‘রক্ত চাঁদ’ নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহু পুরনো। প্রাচীন কালে লাল চাঁদকে ঘিরে নানা কাহিনি ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এই ঘটনার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যালোককে ছড়িয়ে দেয়; নীল আলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, আর লাল আলো বেঁকে গিয়ে চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছায়। সেই কারণেই পূর্ণগ্রাসের সময় চাঁদ লাল দেখায়।
গ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক জ্যোৎস্নায় আলোকিত হয় চারদিক। দোল পূর্ণিমার রাতে সেই উজ্জ্বল চাঁদ যেন উৎসবের আবহকে আরও গাঢ় করে তোলে। আকাশ পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে আরও কয়েকটি চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে, কিন্তু প্রত্যেকটির দৃশ্যমানতা ভৌগোলিক অবস্থানের উপর নির্ভর করবে।উল্লেখ্য, চন্দ্রগ্রহণ প্রকৃতির অনন্য খেলা। সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের নির্ভুল অবস্থানগত সমন্বয় ছাড়া এই দৃশ্য সম্ভব নয়। দোল পূর্ণিমার রাতে উপছায়ার গ্রাস পেরিয়ে চাঁদের ফিরে আসা তাই শুধু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাই নয়, আকাশপানে তাকিয়ে বিস্মিত হওয়ার এক দুর্লভ মুহূর্তও বটে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Why say Cheers | গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে ‘চিয়ার্স’, রাজদরবারের প্রাণরক্ষার কৌশল থেকে আধুনিক পার্টির আচার




