সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতা থেকে আগরতলা রাজনীতির উত্তাপ যেন সীমান্ত ছাড়িয়ে গিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে আগরতলার তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress – TMC) কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের পর বুধবার সকালেই ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পাঠায় তৃণমূল। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh), সঙ্গে ছিলেন সাংসদ সুস্মিতা দেব (Sushmita Dev) ও যুবনেত্রী সায়নী ঘোষ (Sayani Ghosh)। আগরতলায় পা রাখার আগেই কুণাল ঘোষ বলেছিলেন, “আমাদের শবও ফিরতে পারে।” আর ঠিক সেই আশঙ্কাকেই সত্যি করে তুলল ত্রিপুরা প্রশাসনের আচরণ, অভিযোগ তৃণমূল নেতৃত্বের।
বুধবার সকাল থেকেই আগরতলা বিমানবন্দরে শুরু হয় নাটকীয় পরিস্থিতি। বিমান থেকে নামতেই কুণাল ঘোষ এবং তাঁর সহকর্মীদের আটকায় ত্রিপুরা পুলিশ। তাঁদের নিতে যাওয়া প্রিপেইড ট্যাক্সি ও গাড়ি আটকানো হয়। এমনকী অটো নিয়েও যেতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন কুণাল। অগত্যা বিমানবন্দরের বাইরেই বসে পড়েন কুণাল ঘোষ, সুস্মিতা দেব, সায়নী ঘোষসহ তৃণমূলের প্রতিনিধি দল। সেখানেই ধর্নায় বসে প্রতিবাদ জানানো হয় পুলিশের এই ‘অগণতান্ত্রিক’ আচরণের বিরুদ্ধে।
এক্সে (X) বিস্ফোরক পোস্ট কুণালের
এরপরেই কুণাল ঘোষ নিজের সরকারি এক্স (X) হ্যান্ডেলে বিস্তারিত লিখে জানান দিনের ঘটনাপ্রবাহ। তিনি লেখেন, “আমরা বলি হেঁটে যাব। হাঁটা শুরু করি। পুলিশ বাধা দেয়। তখন বলি, গাড়ি চাই। আমাদেরটি আসতে দিন। না হলে অন্য কোথাও থেকে আনুন। শেষে পুলিশ রাজি হয়। দুটি গাড়ি আসে।” তাঁর পোস্ট অনুযায়ী, এই দীর্ঘ জেরার পর অবশেষে প্রতিনিধি দল পৌঁছয় তৃণমূলের রাজ্য দফতরে। সেখানে তারা সরেজমিন পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন এবং পরে সাংবাদিক বৈঠক করেন। সাংবাদিক বৈঠকে কুণাল ঘোষ স্পষ্ট অভিযোগ তোলেন, ত্রিপুরা প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁদের পথ রোধ করেছে। “আমাদের ভয় দেখাতে চায় বিজেপি (BJP)। কিন্তু আমরা ভয় পাই না। আজ যা ঘটেছে, তা গণতন্ত্রের ওপর আঘাত,” বলেন কুণাল। এরপর প্রতিনিধি দল যান ত্রিপুরার পুলিশ ডিজি (DGP)-এর দপ্তরে। সেখানে তাঁরা আগরতলা তৃণমূল কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত শুরু ও হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানান। পাশাপাশি, আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) কনভয়ের ওপর হামলা হয়েছিল, সেই মামলার অগ্রগতি নিয়েও রিপোর্ট চান কুণালরা।

‘মাননীয়া দলনেত্রী খবর রেখেছেন’
একইসঙ্গে কুণাল ঘোষ লেখেন, “আজকের ঘটনাক্রম সম্পর্কে মাননীয়া দলনেত্রী (Mamata Banerjee) এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) সারাদিন খোঁজ নিয়েছেন। রাজ্যপালের সময় চাওয়া হয়েছে। কাল যদি সময় পাই, দেখা করব।” তাঁর পোস্টে মোট সাতটি পয়েন্টে দিনভর ঘটনাক্রম তুলে ধরেন কুণাল। পোস্টের শেষে লেখেন, “আপাতত আজকের কর্মসূচি শেষ। রাজ্যপালের সময় চাওয়া হয়েছে। পেলে কাল যাব।” তৃণমূল সূত্রে খবর, দল আগরতলার হামলার ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) -এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলবে। তাঁদের অভিযোগ, “ত্রিপুরায় বিজেপির সরকার থাকায় প্রশাসন পুরোপুরি দলদাসে পরিণত হয়েছে।”
‘দরকার হলে আমি যাব’ : মমতার হুঁশিয়ারি
এদিন কলকাতায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) আগরতলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অমিত শাহকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, “দরকার হলে আমি নিজেই যাব। দেখি কার কত দম আছে!” তাঁর কথায়, “উৎসবের মধ্যে এসআইআর-এর নির্দেশ দিয়েছে। সবই অমিত শাহের খেলা। উনি এখন অ্যাক্টিং প্রাইম মিনিস্টারের কাজ করছেন।” উল্লেখ্য, মমতার এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে রাজনৈতিক মহলে। তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, বিজেপি বিরোধী দলগুলিকে ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দিতে চাইছে, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগরতলার এই ঘটনা শুধুমাত্র ত্রিপুরা রাজনীতির সীমায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি আসলে উত্তর-পূর্বে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিস্তার রুখতে বিজেপির কৌশল। তৃণমূল কংগ্রেস গত কয়েক বছরে ত্রিপুরায় উল্লেখযোগ্য সংগঠন তৈরি করেছে। রাজ্যজুড়ে যুব নেতৃত্বের মধ্যে সায়নী ঘোষ (Sayani Ghosh), সুস্মিতা দেব (Sushmita Dev)–এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তাই বিজেপি এই প্রভাবকে ঠেকাতে চাইছে বলেই মনে করা হচ্ছে। কুণাল ঘোষের আগরতলা সফর ও পুলিশের বাধা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা শুধু ত্রিপুরা নয়, সমগ্র দেশের রাজনৈতিক পরিসরে আলোচিত হচ্ছে। বিজেপি যেখানে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জারি রাখতে চায়, সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনাকে ব্যবহার করছেন গণতন্ত্র ও বিরোধী ঐক্যের বার্তা দেওয়ার জন্য।

তৃণমূল সূত্রে খবর, তৃণমূল নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দল চাইছে আগরতলা হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংসদীয় স্তরেও প্রতিবাদ তোলা হোক। পাশাপাশি, ত্রিপুরার রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিনিধি দলের। অন্যদিকে, তৃণমূলের এই অবস্থান নিয়ে বিজেপির পাল্টা বক্তব্য, “সবটাই নাটক। ত্রিপুরায় তৃণমূল নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।” কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যে স্পষ্ট, এই লড়াই শুধু সংগঠন রক্ষার নয়, বরং রাজনৈতিক দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।প্রসঙ্গত, আগরতলার ঘটনা নিছক একটি হামলা নয়, এটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। কুণাল ঘোষের (Kunal Ghosh) সফর, পুলিশের বাধা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যা-এর (Mamata Banerjee) হুঁশিয়ারি, সবকিছু মিলিয়ে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে উত্তর-পূর্বের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল। তৃণমূল এখন আগরতলা থেকে দিল্লি, দু’দিকেই এক নতুন রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করছে। অন্যদিকে, ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন ও ২০২৯ লোকসভা ভোটের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।গণতন্ত্রের নামে ভয়, ভয় দেখানোর মধ্যে প্রতিবাদের স্বর আরও জোরালো করেই তুলতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস।
ছবি : সংগৃহীত



