সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা, ৮ অক্টোবর: পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হাওয়া বইতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলগুলি যখন মাঠে-ময়দানে প্রচারে ব্যস্ত, ঠিক তখনই প্রশাসনিক দিক থেকে চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে নেমেছে নির্বাচন কমিশন (Election Commission)। পশ্চিমবঙ্গের ভোট প্রক্রিয়া যাতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করতেই কমিশনের ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতী (Jarnesh Bharti) -সহ চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বুধবার বিকেলে কলকাতা পৌঁছেছে। সূত্রের খবর, বিহারের পর এবার পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্র করে স্ট্যান্ডার্ড ইনস্ট্রাকশন রিপোর্ট (Standard Instruction Report – SIR) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনা করাই তাঁদের সফরের মূল উদ্দেশ্য। কমিশনের এই সফরকে ঘিরে রাজ্য প্রশাসনের মধ্যে তৎপরতা বেড়েছে বহুগুণে।

সত্যজিৎ রায় ভবনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
বুধবার বিকেলে প্রতিনিধি দলটি পৌঁছন রাজারহাটের সত্যজিৎ রায় ভবনে, সেখানে আয়োজিত হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মনোজ আগরওয়াল (Manoj Agarwal), উত্তর ২৪ পরগনা জেলার জেলাশাসক শরৎকুমার দ্বিবেদী (Sharad Kumar Dwivedi) ও রাজ্য প্রশাসনের আরও একাধিক শীর্ষ আধিকারিক।এই বৈঠকে মূলত আলোচিত হয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ভোটার তালিকা পর্যালোচনা, ইভিএম (EVM) ও ভিভিপ্যাট (VVPAT) মেশিনের প্রস্তুতি, নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন, এবং ভোট পর্যবেক্ষকদের নিয়োগ। ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতী বৈঠকে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “নির্বাচনের সময় যাতে কোনও রকম অনিয়ম বা সহিংসতা না ঘটে, তার জন্য কমিশন সর্বদা তৎপর। প্রতিটি জেলার প্রশাসনকে বলা হয়েছে, যেন সময়মতো সব ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়।” বিশেষ সূত্রে খবর, কমিশনের প্রতিনিধি দল বৃহস্পতিবার বারাসতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেবে বলে জানা গিয়েছে। সেখানেও জেলা প্রশাসন, পুলিশ, ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হবে। নির্বাচনের সময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং প্রতিটি ভোটারকে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগে সাহায্য করাই হবে সেই বৈঠকের মূল লক্ষ্য। একজন কমিশন আধিকারিক জানিয়েছেন, “পশ্চিমবঙ্গে অতীতে কিছু অঞ্চলে ভোটকেন্দ্র ঘিরে সংঘর্ষ ও হিংসার ঘটনা ঘটেছে। তাই এবারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে SIR রিপোর্টে। যাতে প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় থাকে।”
নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব
নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা এবারই হবে নজিরবিহীন, বলছেন নির্বাচন কমিশন সূত্র। রাজ্যের সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে আগে থেকেই মোতায়েন করা হবে কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে থাকবে পর্যবেক্ষক (Observer) ও র্যাপিড রেসপন্স টিম।কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, এবার ডেটা-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও চালু হবে। রাজ্যজুড়ে রিয়েল-টাইম নজরদারি করবে কন্ট্রোল রুম। সন্দেহজনক চলাফেরা বা অভিযোগ পাওয়া মাত্রই সেই এলাকার জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে সতর্ক করা হবে। একজন সিনিয়র অফিসার বলেন, “ভোট শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, এটি নাগরিকের অধিকার। সেই অধিকার সুরক্ষিত রাখতেই আমাদের এই প্রস্তুতি।”
প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতার নতুন অধ্যায়
কমিশন সূত্রে খবর, এবার ভোটে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো হচ্ছে। ভোটার তালিকা আপডেট থেকে শুরু করে ইভিএম মেশিনের স্টোরেজ সব কিছুই ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ে রাখা হবে। এর ফলে অনিয়মের সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে। একইসঙ্গে ভোটকেন্দ্রে বিশেষভাবে সক্ষম ভোটারদের জন্য থাকবে আলাদা প্রবেশ ও সহায়ক ব্যবস্থা। বয়স্ক ভোটারদের জন্য থাকবে হুইলচেয়ার ও স্বাস্থ্যকর্মী সহায়তা।
নির্বাচন কমিশনের এই সফর নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনার ঝড় উঠেছে। শাসক তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress – TMC) বলছে, “আমরা সবসময় স্বচ্ছ ভোট চাই। কমিশনের সফরকে স্বাগত জানাই।” অন্যদিকে বিজেপি (Bharatiya Janata Party – BJP) -এর বক্তব্য, “পশ্চিমবঙ্গে বারবার ভোটে অনিয়ম ও দমননীতি দেখা গেছে। এবার কেন্দ্রীয় কমিশন কঠোর পদক্ষেপ নিক, এটাই জনগণের প্রত্যাশা।” কংগ্রেস (Congress) এবং বামফ্রন্টও (Left Front) জানিয়েছে, কমিশন যেন ভোটের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “এই সফর শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, এর মধ্যে রয়েছে একটি রাজনৈতিক বার্তাও যে, ভোট প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা ফেরাতে কমিশন এবার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রত্যাশা
কমিশন আশা করছে, এবার রাজ্যে শান্তিপূর্ণ ভোট সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। নির্বাচনের সময় ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম খোলা থাকবে, যেখানে যে কেউ ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারবেন। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রের বাইরে মোবাইল টহল ও ড্রোন নজরদারির ব্যবস্থাও রাখা হবে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মনোজ আগরওয়াল (Manoj Agarwal) বলেন, “আমাদের লক্ষ্য একটাই, প্রতিটি ভোটার যেন নিরাপদে ভোট দিতে পারেন। এটাই গণতন্ত্রের প্রাণ।”
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভোটের সময় যত এগিয়ে আসছে, প্রশাসনিক ব্যস্ততাও তত বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কেবল ভোটের লড়াই নয়, এটি গণতন্ত্র, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরীক্ষা। নির্বাচন কমিশনের এই সফর স্পষ্ট করে দিয়েছে, কমিশন এবার কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, এবার তারা এক নতুন স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচনী প্রক্রিয়া চালু করতে চায়। পশ্চিমবঙ্গবাসী এখন অপেক্ষা করছে, নিরাপদ, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ ভোটযজ্ঞের।
ছবি : সংগৃহীত




