সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ডেস্ক, কলকাতা : কলকাতার বুকে ফের একবার সম্পর্কজনিত হিংসার রক্তাক্ত ছবি সামনে এল। দিনের আলোয়, জনবহুল এলাকায় বাড়ির ভিতর ঢুকে বান্ধবীকে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে, তার পর চারতলার বারান্দা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হলেন এক যুবক। মঙ্গলবার দুপুরে উত্তর কলকাতার পোস্তা থানার অন্তর্গত শিবঠাকুর লেনের এই ঘটনাকে ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ওই মহিলা, আর যুবককে মৃত ঘোষণা করেছেন চিকিৎসকেরা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত যুবকের নাম ভিকি শর্মা (Vicky Sharma)। বয়স চল্লিশের গোড়ায়। আক্রান্ত মহিলার নাম শিখা সিংহ (Shikha Singh)। তিনিও একই বয়সি। শিখা সিংহ কয়েক বছর আগে স্বামীকে হারান। তারপর থেকেই পোস্তা থানা এলাকার শিবঠাকুর লেনে ভাড়া বাড়িতে তিনি দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে থাকতেন। জীবিকার জন্য টুকটাক সেলাইয়ের কাজ, শাড়িতে ফল্স-পিকো লাগানো, এই সব কাজ করেই সংসার চালাতেন।স্থানীয় সূত্রের দাবি, শিখার স্বামী বেঁচে থাকাকালীনই ভিকির সঙ্গে তাঁর পরিচয়। সেই পরিচয় পরে কতটা ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছেছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, অতীতে কয়েক বার ভিকিকে শিখার বাড়িতে যাতায়াত করতে দেখা গিয়েছে। যদিও দু’জনের সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে কেউই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। সাম্প্রতিক কালে তাঁদের মধ্যে কোনও ধরনের মনোমালিন্য তৈরি হয়েছিল কি না, সেটাও এখন তদন্তের বিষয়।
প্রতিবেশীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে ভিকির আচরণ বদলে গিয়েছিল। তিনি শিখার বাড়ির পাশ দিয়ে যাতায়াতের সময় নানা ধরনের কুমন্তব্য করতেন। কিন্তু সরাসরি বাড়িতে ঢোকার সাহস করতেন না। এই আচরণে স্থানীয়দের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। কেউ কেউ বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও, অনেকেই মনে করছেন, তখনই পরিস্থিতি বিপজ্জনক দিকে এগোচ্ছিল।
মঙ্গলবার দুপুরে ঘটে যায় সেই ভয়ংকর ঘটনা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দুপুর আনুমানিক ১২টা নাগাদ শিখার দুই সন্তান স্কুলে ছিল। সেই সময় বাড়িতে একাই ছিলেন তিনি। আচমকা ভিকি শর্মা বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়েন। এরপরই কোনও কথা কাটাকাটির মধ্যেই তিনি সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে শিখাকে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে শুরু করেন বলে অভিযোগ। চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে আসার আগেই রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন শিখা। এরপর আচমকাই চারতলার বারান্দার দিকে দৌড়ে যান ভিকি। মুহূর্তের মধ্যে তিনি নিচে ঝাঁপ দেন। বিকট শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা তড়িঘড়ি ছুটে এসে রাস্তায় পড়ে থাকা যুবক ও বাড়ির ভিতরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা মহিলাকে উদ্ধার করেন। খবর দেওয়া হয় পোস্তা থানায় (Posta Police Station)।
পুলিশ ও অ্যাম্বুল্যান্স এসে দু’জনকেই দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে হাসপাতালে পৌঁছনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিকি শর্মাকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা। অন্যদিকে, শিখা সিংহের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর কোপের চিহ্ন রয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তিনি এখনও বিপন্মুক্ত নন।
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি রক্তমাখা ছুরি উদ্ধার করেছে, যেটি এই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক ভাবে অনুমান। গোটা এলাকা ঘিরে তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ জানাচ্ছে, এই ঘটনায় কোনও তৃতীয় পক্ষ জড়িত কি না, কিংবা এটি একতরফা প্রেম, ঈর্ষা বা মানসিক অবসাদের ফল—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একজন পুলিশ আধিকারিক জানান, ‘প্রাথমিক তদন্তে জানা যাচ্ছে, দু’জনের মধ্যে পূর্ব পরিচয় ছিল। তবে কী কারণে যুবক এত চরম পদক্ষেপ নিলেন, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ঘটনার আগে কোনও হুমকি বা অভিযোগ থানায় জানানো হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ উল্লেখ্য, এই ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠছে শহরের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে। দিনের বেলায়, জনবহুল এলাকায় এমন ঘটনা কী ভাবে ঘটল, তা নিয়ে আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেকের বক্তব্য, ‘সম্পর্কের জটিলতা, একতরফা আবেগ আর নিয়ন্ত্রণহীন রাগ, সব মিলিয়ে এমন ঘটনা এখন প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিরোধ কোথায়?’
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পোস্তার এই মর্মান্তিক ঘটনা কলকাতায় নারী সুরক্ষা ও সামাজিক নজরদারি নিয়ে নতুন করে ভাবনার জায়গা তৈরি করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, শিখা সিংহ সুস্থ হলে তাঁর বয়ান নেওয়া হবে। সেই বয়ানই হয়ত স্পষ্ট করবে, এই ভয়াবহ ঘটনার নেপথ্যে ঠিক কী কারণ কাজ করেছিল।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Bengal Election 2026, PM Modi Bengal Strategy | ‘বাংলা জিততেই হবে’ : দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বঙ্গ বিজেপি সাংসদদের স্পষ্ট টার্গেট ঠিক করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




