সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : খসড়া ভোটার তালিকায় নাম উঠে গিয়েছে, এই তথ্য জানলেই আর নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নেই। বরং এখন থেকেই শুরু হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কড়া পর্যায়ের যাচাই-বাছাই। কমিশন স্পষ্ট করে দিচ্ছে, খসড়া তালিকায় নাম থাকলেই যে চূড়ান্ত তালিকায় সেই নাম থাকবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) -এর পরবর্তী ধাপে এখন শুরু হচ্ছে প্রকৃত ‘ফিল্টারিং’ বা ঝাড়াইবাছাই প্রক্রিয়া।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, গত ২৭ অক্টোবর রাজ্যে এসআইআর-এর দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়। ওই দিন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিএলও-রা (BLO) এনুমারেশন ফর্ম সংগ্রহ করেন। কমিশন সূত্রের দাবি, যাঁরা এনুমারেশন ফর্মে সই করেছিলেন, প্রাথমিক ভাবে তাঁদের প্রায় সকলের নামই খসড়া তালিকায় তুলে দেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই মঙ্গলবার প্রকাশিত খসড়া তালিকায় ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩১। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের সবাই যে রাজ্যের বৈধ ভোটার, তা নিয়ে কমিশন পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। বরং কমিশনের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, দেড় কোটিরও বেশি ভোটারের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কমিশনের এক আধিকারিকের কথায়, ‘খসড়া তালিকা মানে চূড়ান্ত তালিকা নয়। এখন থেকেই শুরু হচ্ছে তথ্য যাচাইয়ের আসল কাজ।’
৩০ লক্ষ ভোটারের ‘নো ম্যাপিং’ সমস্যা***
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হল ‘নো ম্যাপিং’ ভোটাররা। কমিশন জানিয়েছে, প্রায় ৩০ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৭৩ জন ভোটার ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে কোনও রকম যোগসূত্র দেখাতে পারেননি। উল্লেখ্য, ২০০২ সালেই রাজ্যে শেষবার পূর্ণাঙ্গ এসআইআর হয়েছিল। যাঁদের নাম বা তাঁদের বাবা-মা কিংবা নিকট আত্মীয়ের নাম ওই তালিকায় নেই, তাঁদের তথ্যকে ‘নন-ম্যাপিং’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ৩০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম আপাতত খসড়া তালিকায় থাকলেও, কমিশন তাঁদের সকলকেই শুনানিতে ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুনানিতে সন্তোষজনক নথি দেখাতে না পারলে, চূড়ান্ত তালিকা থেকে নাম বাদ পড়তে পারে বলেই ইঙ্গিত।
সন্দেহের তালিকায় আরও ১ কোটি ৩৬ লক্ষ***
‘নো ম্যাপিং’ ভোটারদের পাশাপাশি আরও প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারের তথ্য নিয়েও সন্দেহ রয়েছে কমিশনের। এই ভোটারদের ক্ষেত্রেও এনুমারেশন ফর্মে দেওয়া তথ্যে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। যেমন- কোথাও ভোটারের বয়সের সঙ্গে বাবা-মায়ের বয়সের ফারাক মাত্র ১৫ বছর, আবার কোথাও বাবা-মায়ের সঙ্গে বয়সের ব্যবধান ৫০ বছরেরও বেশি। কোথাও আবার ছয়ের বেশি ভোটারের বাবার নাম এক। কমিশনের মতে, এগুলি ‘ডেটা অ্যানোমালি’, যা উপেক্ষা করা যায় না। এই শ্রেণির সব ভোটারকে একসঙ্গে শুনানিতে ডাকা হবে না। প্রথমে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএলও-রা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই করবেন। বাস্তবে ওই ভোটার ও নথির তথ্য মিলছে কি না, তা খতিয়ে দেখবেন তাঁরা। যাঁদের ক্ষেত্রে বিএলও-রা সন্তুষ্ট হবেন না, তাঁদের নাম পাঠানো হবে শুনানির তালিকায়।
শুনানির দায়িত্বে এইআরও-রা***-
শুনানি পর্বে বিএলও-দের কোনও ভূমিকা থাকবে না। নির্বাচন কমিশন প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে ১০ জন করে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা এইআরও (AERO) নিয়োগ করেছে। এই আধিকারিকরাই শুনানি করবেন। সংশ্লিষ্ট ভোটারকে নির্দিষ্ট দিনে সরকারি অফিসে হাজির হয়ে জন্ম, ঠিকানা এবং নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বৈধ নথি পেশ করতে হবে। এইআরও সন্তুষ্ট না হলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ৫৮ লক্ষের বেশি****
মঙ্গলবার প্রকাশিত খসড়া তালিকা থেকে ইতিমধ্যেই বাদ পড়েছে ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৮ জনের নাম। কমিশন জানাচ্ছে, এই বাদ পড়া মূলত প্রাথমিক স্তরের। মৃত, স্থানান্তরিত, নিখোঁজ এবং একাধিক জায়গায় নাম থাকা ভোটারদের নাম সরানো হয়েছে। পাশাপাশি যাঁরা এনুমারেশন ফর্মই পূরণ করেননি, অর্থাৎ যাঁরা ভোটার হিসেবে থাকতে আগ্রহী নন বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, তাঁদের নামও বাদ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, খসড়া তালিকাভুক্ত ভোটারদের তিনটি ভাগে ভাগ করেছে কমিশন।
প্রথমত, ‘নিজস্ব ম্যাপিং’, যাঁদের নাম ২০০২ সালের তালিকায় ছিল। এই সংখ্যাটি প্রায় ২ কোটি ৯৩ লক্ষ ৬৯ হাজার ১৮৮।
দ্বিতীয়ত, ‘প্রজন্ম ম্যাপিং’, যাঁদের বাবা-মা বা আত্মীয়ের নাম ২০০২ সালের তালিকায় ছিল। এই শ্রেণিতে রয়েছেন প্রায় ৩ কোটি ৮৪ লক্ষ ৫৫ হাজার ৯৩৯ জন।
তৃতীয়ত, ‘নন-ম্যাপিং’, যাঁদের নিজেদের বা আত্মীয়ের কারও নামই ২০০২ সালের তালিকায় নেই। এই প্রায় ৩০ লক্ষ ভোটারকেই নিশ্চিত ভাবে শুনানিতে ডাকা হবে।
খসড়া তালিকা দেখবেন যেভাবে***
খসড়া তালিকা ইতিমধ্যেই বিএলও এবং রাজনৈতিক দলের বুথ লেভেল এজেন্টদের (BLA) হাতে পৌঁছে গিয়েছে। সাধারণ ভোটারেরাও কমিশনের ‘ইসিআইনেট’ (ECI Net) মোবাইল অ্যাপ, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO, West Bengal)-এর ওয়েবসাইট থেকে নিজেদের নাম যাচাই করতে পারবেন। প্রসঙ্গত, এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর ঘটনা। হুগলির ডানকুনি পুরসভার তৃণমূল কাউন্সিলর সূর্য দে (Surya Dey)-এর নাম ‘মৃত ভোটার’-এর তালিকায় উঠে যায়। যদিও তিনি জীবিত। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই নির্বাচন কমিশন রিপোর্ট তলব করেছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক হুগলির জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছেন বলে সূত্রের খবর। প্রসঙ্গত, খসড়া তালিকা প্রকাশ মানেই নিশ্চিন্ত হওয়া নয়। বরং এখন থেকেই ভোটারদের সতর্ক থাকতে হবে, নথি প্রস্তুত রাখতে হবে। কারণ সামনে রয়েছে কমিশনের সবচেয়ে কড়া পরীক্ষার পর্ব।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Bhawanipur SIR voter list | ভবানীপুরে ৪৫ হাজার ভোটার নাম ছাঁটাইয়ের ধাক্কা! এসআইআর তালিকা প্রকাশের পর কালীঘাটে জরুরি বৈঠকে মমতা




