তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বিশ্বে স্থূলত্ব বাড়ছে দ্রুত গতিতে। নানা দেশের স্বাস্থ্য-পরিসংখ্যানে তার প্রমাণ মিলছে। অথচ এই প্রবণতার বিপরীত ছবি দেখা যায় জাপানে (Japan)। সেখানে স্থূলত্বের হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। তথ্য দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization)। তুলনায় ভারতে স্থূলত্বের হার প্রায় ২৫ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ প্রতি চার জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে অন্তত একজন ওজনজনিত সমস্যায় ভুগছেন। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে জাপানিরা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখেন? তাঁরা কি কঠোর ডায়েটে থাকেন? নাকি বিশেষ কোনও খাদ্যাভ্যাস মেনে চলেন? আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের বেশির ভাগই বাড়ির স্বাভাবিক রান্নাই খান। তবু গড়নে মেদের আধিক্য দেখা যায় না। আবার, জাপানের দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি সহজ নিয়ম রয়েছে, যা বহু বছর ধরে বেশিরভাগ জাপানিরা মেনে চলেন। প্রথমেই আসে ‘হারা হাচি বু’ (Hara Hachi Bu) নীতি। এর অর্থ, পেট ৮০ শতাংশ ভরলেই খাওয়া বন্ধ করা। অর্থাৎ পুরোপুরি ঠেসে না খেয়ে সংযম বজায় রাখা। খাবার যতই প্রিয় হোক, নির্দিষ্ট সীমা মেনে চলাই তাঁদের অভ্যাস। এতে অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে ঢোকার সুযোগ কমে যায়।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ছোট থালা বা বাটিতে খাবার পরিবেশন। বড় প্লেটে বেশি পরিমাণ খাবার সাজানোর বদলে অল্প অল্প করে নানা পদ পরিবেশন করা হয়। ভাত, মাছ, সবজি সবই থাকে, তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত। এই পদ্ধতিতে ক্যালোরির ভারসাম্য বজায় থাকে। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট প্রতিটি উপাদান মেপে নেওয়া হয়। খাওয়ার সময়ও তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা যেমন অভ্যাস নয়, তেমনই তাড়াহুড়ো করে খাওয়াও এড়িয়ে চলেন। ধীরে ধীরে, ভাল করে চিবিয়ে খাবার খাওয়া এটাই নিয়ম। এতে একদিকে হজম প্রক্রিয়া ভাল থাকে, অন্যদিকে অল্প খাবারেই তৃপ্তি আসে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে। প্রক্রিয়াজাত খাবার জাপানিদের খাদ্যতালিকায় খুব কম। প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, অতিরিক্ত চিনি মেশানো পানীয় বা জাঙ্ক ফুড নিয়মিত খাওয়ার প্রবণতা প্রায় নেই বললেই চলে। পাশাপাশি টাটকা মাছ, সামুদ্রিক শৈবাল, মৌসুমি সবজি, সয়াভিত্তিক খাবার ও ফলই তাঁদের দৈনন্দিন খাদ্যের অংশ। এই ধরনের খাবারে ফাইবার ও পুষ্টিগুণ বেশি থাকে, যা শরীরকে সতেজ রাখে।
আরও একটি অভ্যাস নজরকাড়া। সেটি হল গরম জলে স্নান। জাপানে অনেকে নিয়মিত উষ্ণ জলে ডুবস্নান করেন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এতে শরীরে ‘হিট শক প্রোটিন’ তৈরি হয়, যা কোষের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করে বলে গবেষকরা মনে করছেন। পাশাপাশি রক্তসঞ্চালনও বাড়ায়। খাওয়ার পর বিশ্রাম নেওয়ার বদলে হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাসও রয়েছে জাপানিদের। অফিস বা বাজারে যাওয়া সব ক্ষেত্রেই অনেকেই হাঁটা পছন্দ করেন। এর পাশাপাশি জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি হল ‘হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ওয়াকিং’ (High-Intensity Interval Walking)। এই পদ্ধতিতে প্রথমে ৫ থেকে ১০ মিনিট ধীর গতিতে হাঁটা হয়। শরীর গরম হয়ে গেলে গতি বাড়ানো হয়। পরের ৫ থেকে ১০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, তারপর আবার ধীর গতি। এভাবে অন্তত ২০-৩০ মিনিট হাঁটলে ক্যালোরি খরচ হয় বেশি। নিয়মিত এই অভ্যাস শরীরকে সক্রিয় রাখে।

জাপানে কর্মসংস্কৃতিও ভিন্ন। অনেকেই অফিসে দীর্ঘ সময় বসে থাকলেও সুযোগ পেলেই নড়াচড়া করেন। সিঁড়ি ব্যবহার করা, স্বল্প দূরত্বে হাঁটা এই ছোট ছোট অভ্যাস শরীরে মেদ জমতে দেয় না। শুধু খাদ্যাভ্যাস বা ব্যায়াম নয়, মানসিক প্রশান্তিও একটি কারণ। কাজের ফাঁকে বিশ্রাম, পরিবারকে সময় দেওয়া, প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানো এসবও শরীর ও মনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, বিশ্বে যেখানে স্থূলত্ব বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে, সেখানে জাপানের এই জীবনযাপন পদ্ধতি অনেক দেশের কাছে আগ্রহের বিষয়। কড়া ডায়েট বা চরম অনুশীলনের বদলে সংযম, নিয়মিত হাঁটা এবং পরিমিত খাদ্যগ্রহণ এই সহজ নিয়মই তাঁদের সাফল্যের চাবিকাঠি।ভারতের মতো দেশে যেখানে ফাস্ট ফুডের ব্যবহার বেড়েছে, সেখানে জাপানের অভ্যাস থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। ছোট থালায় অল্প খাবার, ধীরে খাওয়া, নিয়মিত হাঁটা… এই কয়েকটি বদলেই বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে। আসলে, স্বাস্থ্য রক্ষায় বড় কোনও গোপন মন্ত্র না, দৈনন্দিন অভ্যাসের শৃঙ্খলাই জাপানিদের ছিপছিপে গড়নের রহস্য।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত।
আরও পড়ুন : Japanese Kanso philosophy | আবেগের অতল গহ্বর থেকে মুক্তি চাইছেন? জাপানি ‘কানসো’ দর্শন শিখিয়ে দিচ্ছে সহজ জীবনের নতুন মন্ত্র




