সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লী : নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার নতুন সম্ভাবনার দরজা খুললেও, তার সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে একাধিক সঙ্কটের ইঙ্গিত। কৃত্রিম মেধা (AI) ব্যবহার, তথ্যের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাইজেশন এবং বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্র (EVM)-নির্ভর ভোটগ্রহণ এই তিনটি ক্ষেত্র ঘিরে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন পরিচালিত গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান India International Institute of Democracy and Election Management (India International Institute of Democracy and Election Management বা IIIIDEM) -এর আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক কর্মশালায় নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, এই পর্যবেক্ষণ কোনও অসরকারি ভোট পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীর নয়; তা নির্বাচন কমিশনের অধীনেই পরিচালিত একটি সরকারি সংস্থার আলোচনাচক্রে তা উঠে এসেছে। ‘AI and Elections: Innovation, Integrity and Institutional Preparedness’ শীর্ষক কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী গবেষক ও আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
বর্তমানে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার সঙ্কটকে ত্রিমুখী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, তথ্যের সর্বাত্মক ডিজিটাইজেশন তথ্যগোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। ভোটার তালিকা, পরিচয়পত্র, ব্যক্তিগত তথ্য সবই এখন ডিজিটাল ডেটাবেসে সংরক্ষিত। এই বিপুল তথ্যভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখা এবং অনধিকার প্রবেশ রোধ করা এখন অন্যতম বড় দায়িত্ব। প্রযুক্তি-নির্ভর পরিকাঠামো দুর্বল হলে তথ্য ফাঁস বা বিকৃতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্র বা ইভিএম (Electronic Voting Machine) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বারবার ইভিএমের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আস্থা প্রকাশ করেছে, তথাপি ‘অস্বচ্ছ স্বয়ংক্রিয় ভোটব্যবস্থা’ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে। কর্মশালায় আলোচনায় উঠে এসেছে, প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষাযোগ্যতার বিষয়টি আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে ভোটারদের আস্থা অটুট থাকে।
তৃতীয়ত, কৃত্রিম মেধার ব্যবহার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সম্প্রতি বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ায় ভুয়ো ভোটার শনাক্ত করতে এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের এক আধিকারিক জানিয়েছিলেন, ‘আমরা ডেটা এনালিসিস করব, ডেটা স্ক্যান করব। নিখুঁত স্ক্যানের মাধ্যমে অসঙ্গতি ধরা সম্ভব হবে।’ অর্থাৎ তথ্যগত অসামঞ্জস্য বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ চিহ্নিত করতে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তবে এই প্রয়াস ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। কর্মশালায় আলোচনায় উঠে আসে, নির্বাচন সংস্থাগুলি প্রযুক্তিগত ব্যাঘাতের ক্ষেত্রে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে থাকলে চলবে না; আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। ‘বাহ্যিক প্রযুক্তিগত বাস্তুতন্ত্রের উপর নির্ভরতা’ এবং ‘প্রযুক্তিগত দক্ষতার বৈষম্য’ নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ যদি প্রযুক্তি পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতা বা পরিকাঠামোর ঘাটতি থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার কারণ হতে পারে।
একই সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে এআই-জেনারেটেড ‘ডিপফেক’ নিয়ে উদ্বেগ। নির্বাচনী প্রচারে ভুয়ো অডিও-ভিডিও ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার সম্ভাবনা এখন বাস্তব চ্যালেঞ্জ। উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা এমন কনটেন্ট সাধারণ মানুষের পক্ষে আলাদা করা কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কর্মশালায় এই প্রসঙ্গে জোর দেওয়া হয়েছে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও দ্রুত যাচাইকরণ ব্যবস্থার উপর। কিন্তু প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করার আহ্বান জানানো হয়নি। বলা হয়েছে, চিন্তাভাবনা-সহ প্রয়োগ করা হলে কৃত্রিম মেধা ভোটার পরিষেবা উন্নত করতে পারে, পরিকল্পনা প্রণয়ন সহজ করতে পারে এবং ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও নির্ভুল করতে পারে। ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, মানবসম্পদ বণ্টন, লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা এই সব ক্ষেত্রেই এআই সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে। মূল প্রশ্ন হল, প্রয়োগের কাঠামো কতটা স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ। নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির বিস্তার একদিকে সময় ও শ্রম সাশ্রয় করছে, অন্যদিকে নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করছে। তথ্যের নিরাপত্তা, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা এবং প্রচারপর্বে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এই তিনটি দিকেই নজরদারি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে কর্মশালায়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনআস্থা বজায় রাখতে হলে প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে সুসমন্বয় অপরিহার্য, এমন অভিমতও সামনে এসেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র নয়; এটি প্রযুক্তিগত দক্ষতারও পরীক্ষা। ডিজিটাল পরিকাঠামো যত বিস্তৃত হবে, ততই বাড়বে দায়বদ্ধতা। তাই আগাম প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া বজায় রাখাই হতে পারে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রধান উপায়। প্রযুক্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, না কি নতুন সংশয়ের জন্ম দেবে, তার উত্তর নির্ভর করছে প্রয়োগের পদ্ধতি ও নজরদারির উপর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : SIR West Bengal Supreme Court Order, Voter List Revision Bengal 2026 | এসআইআর বিতর্কে ঐতিহাসিক হস্তক্ষেপ: তথ্যগত অসঙ্গতি খতিয়ে দেখবেন বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা, নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের




