প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : আইপিএল (IPL) নিলাম মানেই চোখ ধাঁধানো দর, বিদেশি তারকাদের জন্য হুড়োহুড়ি আর কোটি-কোটি টাকার লড়াই, এই ছবির সঙ্গেই অভ্যস্ত ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা। বিশেষ করে, ছোট নিলাম এলেই নজর থাকত স্যাম কারেন (Sam Curran), ক্রিস মরিস (Chris Morris) -এর মতো বিদেশি অলরাউন্ডারদের দিকে। কিন্তু আইপিএল ২০২৫-এর নিলাম সেই চেনা ছবিতে বড়সড় বদলের ইঙ্গিত দিল। এবার বিদেশিদের পাশাপাশি, তা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ছাপিয়ে, আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন ঘরোয়া অনামী ভারতীয় ক্রিকেটাররা। প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ করে কেন এই পরিবর্তন? কেন আইপিএলের ১০টি দল ভবিষ্যতের জন্য এমন সাহসী বিনিয়োগে নামল?গত মঙ্গলবার আবু ধাবিতে হওয়া নিলামে মোট ৭৭ জন ক্রিকেটার বিক্রি হয়েছেন। তার মধ্যে ৩৯ জনই ঘরোয়া ভারতীয় ক্রিকেটার, যাঁদের অনেকেই এখনও জাতীয় দল তো দূরের কথা, রঞ্জি ট্রফিতেও নিয়মিত মুখ নন। তবুও এই ‘অপরিচিত’ নামগুলিই নিলামে টেক্কা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারদের। এই তালিকা থেকেই স্পষ্ট, আইপিএলের দলগুলো এখন শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
এ বারের নিলামে আট জন ঘরোয়া ক্রিকেটার কোটিপতি হয়েছেন। তালিকার শীর্ষে রয়েছেন কার্তিক শর্মা (Kartik Sharma) ও প্রশান্ত বীর (Prashant Veer)। দু’জনকেই ১৪ কোটি ২০ লক্ষ টাকা দিয়ে দলে নিয়েছে চেন্নাই সুপার কিংস (Chennai Super Kings)। এক সময় যে দলকে ‘ড্যাডিজ় আর্মি’ বলে কটাক্ষ করা হত, সেই চেন্নাইই এবার দুই তরুণের পিছনে এক লাফে ২৮ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা খরচ করেছে। এ ছাড়া আকিব দার (Aqib Dar) ৮ কোটি ৪০ লক্ষ, মঙ্গেল যাদব (Mangel Yadav) ৫ কোটি ২০ লক্ষ, তেজস্বী সিংহ (Tejasvi Singh) ৩ কোটি, অক্ষত রঘুবংশী (Akshat Raghubanshi) ২ কোটি ২০ লক্ষ, সলিল অরোরা (Salil Arora) ১ কোটি ৫০ লক্ষ এবং নমন তিওয়ারি (Naman Tiwari) ১ কোটি টাকায় দল পেয়েছেন।
আরও পড়ুন : Cameron Green KKR | আন্দ্রে রাসেলের বিকল্প কেকেআরে ক্যামেরন গ্রিন, আইপিএলে রেকর্ড দাম
এই পরিকল্পনার নেপথ্যের দর্শন ব্যাখ্যা করেছেন চেন্নাই সুপার কিংসের কোচ স্টিফেন ফ্লেমিং (Stephen Fleming)। তাঁর কথায়, ‘দলে শক্তিশালী ঘরোয়া ক্রিকেটার থাকলে দলের ভিত মজবুত হয়। কখনও কখনও ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতেই হয়। আমরা সেটাই করেছি।’ ফ্লেমিং স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কার্তিক বা প্রশান্তকে হঠাৎ করে চোখ বুজে কেনা হয়নি। ‘গোটা বছর ধরে আমাদের স্কাউট দল দেশের বিভিন্ন রাজ্যের লিগ এবং প্রতিযোগিতা নজরে রাখে। শুধু বর্তমান পারফরম্যান্স নয়, ভবিষ্যতে কে কতটা বড় হতে পারে, সেটাও বিশ্লেষণ করা হয়। ওরা আমাদের কাছে ভবিষ্যতের সম্পদ,’ বলেন তিনি। আসলে গত কয়েক বছরে ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের চরিত্রটাই বদলে গিয়েছে, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। মহারাষ্ট্র, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরল, পাঞ্জাব-সহ অন্তত ১০টি রাজ্যে নিয়মিত টি-টোয়েন্টি লিগ হচ্ছে। এই লিগগুলোই এখন আইপিএলের নতুন খনি। গত মরসুমে দিল্লি প্রিমিয়ার লিগ থেকে উঠে এসে আইপিএলে নজর কেড়েছিলেন দিগ্বেশ রাঠী (Digvesh Rathi) ও প্রিয়াংশ আর্য (Priyansh Arya)। সেই সাফল্যই দলগুলিকে আরও সাহসী করে তুলেছে। সংখ্যাগুলোই আসল গল্প বলে দেয়। ১৪ কোটি ২০ লক্ষ টাকার প্রশান্ত ইউপি টি-টোয়েন্টি লিগে আট ম্যাচে ৩২০ রান করেছেন, সঙ্গে নিয়েছেন ৮ উইকেট। ব্যাটিং গড় ৬৪, বোলিং ইকোনমি ৬.৬৯- এই অলরাউন্ড পারফরম্যান্সই তাঁকে নিলামের তারকা বানিয়েছে। কার্তিক শর্মা শের-ই-পাঞ্জাব লিগে ১০ ইনিংসে ৪৫৭ রান করেছেন ১৬৮.০১ স্ট্রাইক রেটে। কলকাতা নাইট রাইডার্স (Kolkata Knight Riders) -এর নেওয়া তেজস্বী সিংহ দিল্লির হয়ে টি-টোয়েন্টিতে ৫৬.৫০ গড়ে রান করেছেন, স্ট্রাইক রেট ১৭০। দিল্লি প্রিমিয়ার লিগে তাঁর স্ট্রাইক রেট ছিল ১৯০, ১২ বলে অর্ধশতরান ও এক ওভারে ছ’টি ছক্কা মারার নজিরও রয়েছে। সেই কারণেই তাঁকে রিজার্ভ ফিনিশার হিসেবে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে কেকেআর।
শুধু ব্যাটার নয়, বোলারদের ক্ষেত্রেও একই ছবি। ৮ কোটি ৪০ লক্ষে কেনা জম্মু-কাশ্মীরের আকিব দার এবারের রঞ্জি ট্রফিতে নিয়েছেন ২৯ উইকেট, সৈয়দ মুস্তাক আলিতে ৭.৪১ ইকোনমিতে ১৫ উইকেট। বেঙ্গালুরু ৫ কোটি ২০ লক্ষে নিয়েছে মধ্যপ্রদেশের বাঁহাতি পেসার মঙ্গেল যাদবকে, যিনি ইয়র্কারের জন্য ঘরোয়া ক্রিকেটে ইতিমধ্যেই পরিচিত। ভারতে বাঁহাতি পেসারের ঘাটতি থাকায়, তাঁকে ভবিষ্যতের অস্ত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় দলটি। এই ক্রিকেটারেরা সংবাদ শিরোনামে খুব কম আসেন। কিন্তু যাঁদের কাজই প্রতিভা খোঁজা, তাঁরা ঠিকই জানেন কার ভেতরে কী আছে। ফ্লেমিংয়ের কথায়, ‘ওরা সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত হতে পারে, কিন্তু আইপিএলের ১০ দলের কাছে নয়।’ এক সময় ইউরোপীয় ফুটবলে যেমন বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ বা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড তরুণ প্রতিভা তুলে এনে তারকা বানাত, আইপিএলও এখন সেই পথেই হাঁটছে। মুম্বই ইন্ডিয়ান্স (Mumbai Indians) আগেই সেই মডেল দেখিয়েছে- জসপ্রীত বুমরাহ (Jasprit Bumrah), হার্দিক পাণ্ড্যদের (Hardik Pandya) তুলে এনে। আইপিএল না থাকলে হয়ত ভারত পেত না এই ম্যাচ উইনারদের। এখন সেই পথেই এগোচ্ছে বাকি দলগুলো। আইপিএল নিলাম তাই আর শুধু কেনাবেচা নয়, ভবিষ্যৎ ভারতীয় ক্রিকেট গড়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : IPL 2025 Auction, KKR Build Power-Packed Squad Worth Rs 124.55 Crore | IPL 2025 নিলাম: ১২৪ কোটির সুপার টিম গড়ল কেকেআর




