তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : শীতের কুয়াশা ভেজা সকাল। গ্রামের মেঠো রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে দ্রুত পা চালাচ্ছে একটি ছেলে। ট্রেন ধরতে হবে, কারণ শুটিং আছে। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে বয়স্ক মা তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে। শীতের হাওয়ায় চাদর উড়ছে তাঁর। দেখতে দেখতে ছেলে মিলিয়ে যায় দৃষ্টির আড়ালে। এই দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের বিদায়ের ছবি নয়, এ যেন স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা এক লড়াইয়ের প্রতীক। সেই ছেলেটিই আজ বাংলা টেলিভিশনের পরিচিত মুখ, রৌনক খান (Raunak Khan), যাঁকে দর্শক চেনেন ধারাবাহিক ‘জোয়ার ভাঁটা’ -র ভানু চরিত্রে।রৌনকের জীবন কাহিনি শুনলে বোঝা যায়, সাফল্য তাঁর কাছে হঠাৎ ধরা দেয়নি। সুন্দিপুর গ্রামের সাধারণ পরিবারে জন্ম। বাবা একটি বাসের মালিক, দাদা সেই বাসের কন্ডাকটর। দুই বিবাহিত দিদির নিজস্ব দোকান রয়েছে। গ্রামের চেনা ছকে বাঁধা জীবন। কিন্তু রৌনকের স্বপ্ন সেই ছকের বাইরে। ২০১৩ সাল থেকে পেশার তাগিদে কলকাতায় থাকতে শুরু করেন তিনি। টাকা বাঁচাতে নিজের রান্না, ঘর পরিষ্কার, কাপড় কাচা, সবই নিজে করেছেন। সঙ্গে শরীরচর্চা, সুযোগ পেলেই মঞ্চাভিনয়, আর ন’মাসে-ছ’মাসে রামপুরহাটের বগটুই গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়া, এই ছিল তাঁর রুটিন।
আরও পড়ুন :Swarnendu-Shruti : স্বর্ণেন্দু-শ্রুতির বিয়ের ছয় মাস উদযাপন
আজ যাঁকে দর্শক ‘ভানু’ নামে চেনেন, সেই চরিত্রটি রৌনককে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তুলেছে। একতরফা প্রেমে ডুবে থাকা ভানুর আবেগ দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে। তবে এই জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, বারবার প্রত্যাখ্যান আর নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার জেদ। অভিনেতা নিজেই বলেন, ‘আমি প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে। পড়াশোনার থেকেও ক্রিকেটে মন ছিল বেশি। কিন্তু জেদ ছিল, অভিনয়ে আসব। ইংরেজিতে স্নাতক হয়েও স্বপ্ন দেখা ছাড়িনি।’ যদিও শুরুতে মা-বাবার আপত্তি ছিল। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, ‘ছেলের ঘাড়ে এ কী ভূত চাপল!’ তবু স্বপ্ন তাঁকে টেনে এনেছে কলকাতায়। পেশাজীবনের শুরু মডেলিং দিয়ে। কাজের প্রয়োজনে পৌঁছে গিয়েছিলেন মুম্বাই। লম্বা-চওড়া, সুগঠিত শরীরের রৌনককে মডেলিংয়ের দুনিয়া সহজেই গ্রহণ করে। কয়েকটি বিজ্ঞাপনে মুখ দেখানোর পর টলিউডে ডাক আসে। আশ্বাস ছিল, তাঁকে নায়ক করে ধারাবাহিক তৈরি হবে। কিন্তু সেই আশ্বাস বাস্তব রূপ নেয়নি। রৌনক অকপটে স্বীকার করেন, ‘প্রতিভার পাশাপাশি যোগাযোগও দরকার। আমি কাউকে চিনতাম না। ফলে পিআর করতে পারিনি। পরিশ্রমের সঙ্গে ভাগ্যও লাগে।’
বারবার স্বপ্ন ভেঙে গেলেও তিনি হতাশায় ডুবে যাননি। কলকাতায় এক মঞ্চাভিনেতা বন্ধুর সঙ্গে থাকা, মঞ্চে কাজ করা, এগুলোই তাঁকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। অভিনেতার কথায়, ‘মা-বাবা শুরুতে ভয় পেয়েছিলেন। পরে তাঁরাই আমার সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছেন।’ এই ব্যর্থতাই তাঁকে শিখিয়েছে, ভাল অভিনেতা হতে গেলে অভিনয়ের গভীরে ঢুকতে হবে। তাই হাতিবাগানের একটি নাট্যদলে যোগ দেন রৌনক। টানা মঞ্চাভিনয় করেছেন। পেট চালানোর জন্য মডেলিং চলেছে পাশাপাশি। ধীরে ধীরে ছোটপর্দায় কাজ এসেছে। কালার্স বাংলার ‘জয় জগন্নাথ’ -এ মহাদেব চরিত্র, স্টার জলসার ‘রোশনাই’ -এ পার্শ্বচরিত্র, এই সব কাজ তাঁকে অভিজ্ঞ করেছে। অবশেষে জ়ি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিকে দ্বিতীয় নায়ক হিসেবে জায়গা পান তিনি। এখান থেকেই দর্শকের নজর পড়ে রৌনকের উপর।ধারাবাহিকের প্রয়োজনে তাঁকে রুদ্রাক্ষ পরতে হয়েছে, কপালে তিলক কেটেছেন। গ্রামবাসী বা পরিবারের আপত্তি ছিল কি না? প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই রৌনক থামিয়ে দেন, ‘কিচ্ছু না! টলিউডে এই ছুতমার্গ নেই। গ্রামের ছেলে বলেও কেউ মুখ ফেরাননি।’ তাঁর মতে, এই ইন্ডাস্ট্রি পরিশ্রম আর প্রতিভাকে সম্মান করে।
সহ-অভিনেত্রী শ্রুতি দাস (Sruti Das) -এর কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন রৌনক। বলেন, ‘ওর লড়াই আমি কাছ থেকে দেখেছি। মফস্সলের মেয়ে হয়েও কখনও হার মানেনি। ওর থেকে অনেক কিছু শিখছি।’ এই পারস্পরিক সম্মান ও শেখার মানসিকতাই তাঁকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। টেলিপাড়ায় গুঞ্জন, পর্দার ভানু আর বাস্তবের রৌনক নাকি একাকার। একতরফা প্রেম কি তাঁর জীবনেও আছে? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অভিনেতা বলেন, ‘তেমন কিছু থাকলেও সমস্যা কোথায়? যাকে ভালবাসি, তাকে নিয়েই বাঁচছি। নিজের মতো করে।’ এই আত্মবিশ্বাসই যেন তাঁর জীবনের মূল চাবিকাঠি। উল্লেখ্য, গ্রামের মেঠো রাস্তা থেকে টেলিভিশনের আলোঝলমলে পর্দা, রৌনক খানের এই যাত্রাপথ আসলে হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণের গল্প। লড়াই, ধৈর্য আর বিশ্বাস থাকলে যে রুপোলি পর্দার গল্প বাস্তবেও লেখা যায়, রৌনক তারই প্রমাণ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Akshay Kumar Raveena Tandon controversy | অক্ষয় কুমার ও রবিনা ট্যান্ডন বিতর্ক: বিয়ের প্রতিশ্রুতি ও বিস্ফোরক অভিযোগ




