কৌশিক রায় চৌধুরী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: ভারত-নিউ জিল্যান্ড দ্বৈরথ শুরু হতে এখনও প্রায় দু’মাস বাকি। কিন্তু তার আগেই ভারতীয় দলের দুই অভিজ্ঞ তারকাকে নিয়ে ভাবনা শুরু করে দিয়েছে কিউয়ি শিবির। রোহিত শর্মা (Rohit Sharma) ও বিরাট কোহলি (Virat Kohli) এক দিনের ক্রিকেটে যাঁদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে খেলেছে নিউ জিল্যান্ড (New Zealand), সেই দুই ব্যাটারকে নিয়েই এবার আগেভাগে পরিকল্পনা সাজাতে চাইছে ঘরের দল। বিশেষ করে এক দিনের সিরিজ়কে ঘিরে নিউ জিল্যান্ডের অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার (Mitchell Santner) -এর কথায় ধরা পড়েছে বাড়তি সতর্কতা।

আরও পড়ুন : Rohit Sharma | নতুন রূপে রোহিত শর্মা : ফিটনেসে বদলে গেল হিটম্যান, ক্রিকেট দুনিয়া মুগ্ধ
আগামী ৪ নভেম্বর প্রথম এক দিনের ম্যাচে মুখোমুখি হওয়ার কথা ভারত ও নিউ জিল্যান্ডের। তার আগে তিন ফরম্যাটের পূর্ণাঙ্গ সিরিজ় খেলতে ভারতীয় দল যাবে নিউ জিল্যান্ডে। টেস্ট, এক দিনের ম্যাচ ও টি-টোয়েন্টি তিন ধরনের ক্রিকেটেই দুই দলের লড়াই হওয়ার কথা। তবে কিউয়ি অধিনায়কের কাছে এক দিনের সিরিজের গুরুত্ব আলাদা। কারণ এই ফরম্যাটেই রোহিত এবং কোহলির অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য নিউ জিল্যান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। রোহিত-কোহলির বিরুদ্ধে কী ভাবে পরিকল্পনা করা যায়, তা নিয়ে স্যান্টনার ইতিমধ্যেই নিজের মনোভাব জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কঠিন সিরিজ় হতে চলেছে। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা দেখেছি ওরা দু’জনে কত ভাল ক্রিকেটার। এক দিনের ক্রিকেটে দাপট দেখিয়েছে। অতীতে দেখেছি নিউ জিল্যান্ডের পিচ ওদের কাছে বিশেষ পছন্দের। আশা করি এ বার যেন তা না হয়।’
স্যান্টনারের এই মন্তব্যে মূলত উঠে এসেছে রোহিত ও কোহলির নিউ জিল্যান্ডের পরিবেশে অতীতের পারফরম্যান্সের প্রসঙ্গ। বিদেশের মাটিতে এক দিনের ক্রিকেটে পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এই দুই অভিজ্ঞ ব্যাটারের অন্যতম বড় শক্তি। নিউ জিল্যান্ডের পিচ ও পরিবেশ তাঁদের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে অনেক সময় মানিয়ে গিয়েছে। তাই এবার ঘরের মাঠে তাঁদের সেই সুবিধা দিতে নারাজ কিউয়ি দল। ভারতের বিরুদ্ধে আসন্ন সিরিজ শুধু চলতি মরসুমের আর একটি দ্বিপাক্ষিক লড়াই না। ২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপকে (2027 ODI World Cup) সামনে রেখে দুই দলের কাছেই এই সিরিজ়ের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বকাপের আগে দলকে কতটা গুছিয়ে নেওয়া যাচ্ছে, কোন ক্রিকেটার কোন ভূমিকার জন্য উপযুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে চাপ সামলানোর মতো দল তৈরি হয়েছে কি না, সেই পরীক্ষার অংশ হিসাবেই ভারত-নিউ জিল্যান্ড সিরিজ়কে দেখা হচ্ছে। নিউ জিল্যান্ডের পরিকল্পনাতেও তাই ভারত সিরিজ়কে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভারতের বিরুদ্ধে পাঁচটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর শ্রীলঙ্কার (Sri Lanka) বিরুদ্ধে খেলবে কিউয়িরা। এরপর ইংল্যান্ডে (England) গিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই কারণে ঘরের মাঠে ভারতের বিরুদ্ধে সিরিজ় থেকেই নিজেদের কাঠামো আরও ভালো ভাবে যাচাই করে নিতে চাইছে নিউ জিল্যান্ড।
স্যান্টনার বলেছেন, ‘ভারতের বিরুদ্ধে পাঁচটা ম্যাচের পর শ্রীলঙ্কা আসবে। তার পরে সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডে প্রস্তুতির লক্ষ্যে যাব। কিন্তু সবার আগে ভারতকে হারাতেই হবে। কাজটা করতে পারলে দারুণ হবে। পরের বছর অক্টোবরের দলটা কেমন হবে সেটা দ্রুত বুঝে নিতে হবে।’ কিউয়ি অধিনায়কের কথায় বোঝা যাচ্ছে, ভারতের বিরুদ্ধে সিরিজকে তাঁরা ভবিষ্যতের দল গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন। বিশ্বকাপের জন্য চূড়ান্ত দল বাছাইয়ের আগে ক্রিকেটারদের ভূমিকা নির্ধারণ করা ও ম্যাচ পরিস্থিতিতে তাঁদের কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। ফলে ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিটি ম্যাচেই ফলাফলের পাশাপাশি দল গঠনের দিকটিও নজরে থাকবে।
ভারতের ক্ষেত্রেও নিউ জিল্যান্ড সফর একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বর্তমান ভারতীয় দলে বেশ কিছু ক্রিকেটারের জন্য নিউ জিল্যান্ডের মাটিতে খেলার অভিজ্ঞতা নতুন হতে পারে। বিদেশের পরিবেশে নতুন ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স, দ্রুত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ও আন্তর্জাতিক মানের চাপ সামলানোর ক্ষমতা এই সিরিজ়ে পরীক্ষা হবে। স্যান্টনারও সেই বিষয়টির দিকে লক্ষ্য রাখছেন। ভারতীয় দলের বর্তমান কাঠামোকে তুলনামূলক ভাবে নতুন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘দ্রুত মানিয়ে নেওয়াই আমাদের আসল কাজ। ভারতের দলটা নতুন। অনেকেই প্রথম বার নিউ জিল্যান্ডে খেলতে আসবে। এখানকার পিচে খেলার অভিজ্ঞতা প্রথম হবে। তাই এখানে এসে নিজেদের প্রমাণ করার তাগিদ ওদের মধ্যে বেশি থাকবে।’
ভারতের দলের নতুন মুখ থাকলেও কিউয়ি অধিনায়ক প্রতিপক্ষকে কোনও ভাবেই হালকা ভাবে দেখছেন না। ভারতীয় দলের ভারসাম্য নিয়েই তাঁর প্রশংসা। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিং বিভাগেও ভারতের হাতে একাধিক আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার থাকায় নিউ জিল্যান্ডের কাজ কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করছেন। ভারতের পেস আক্রমণের নেতৃত্বে থাকবেন জসপ্রীত বুমরাহ (Jasprit Bumrah)। তাঁর সঙ্গে মহম্মদ সিরাজ (Mohammed Siraj) ও প্রসিদ্ধ কৃষ্ণর (Prasidh Krishna) মতো পেসারদের উপস্থিতি নিউ জিল্যান্ডের ব্যাটিংয়ের সামনে বড় পরীক্ষা তৈরি করতে পারে। নতুন বলে সুইং কিংবা পুরনো বলে নিয়ন্ত্রিত বোলিং দুই ক্ষেত্রেই ভারতের হাতে একাধিক বিকল্প রয়েছে। শুধু পেস নয়, স্পিন বিভাগেও ভারতকে শক্তিশালী মনে করছেন স্যান্টনার। রবীন্দ্র জাডেজা (Ravindra Jadeja) ও মানব সুতারের (Manav Suthar) মতো স্পিনারদের পাশাপাশি দলের চূড়ান্ত ভারসাম্য অনুযায়ী আরও এক পেসার যুক্ত হতে পারেন বলে তিনি মনে করছেন। ফলে ভারতীয় দলের বোলিং আক্রমণ নিয়ে কিউয়ি শিবিরকে একাধিক দিক বিবেচনা করতে হবে।
স্যান্টনার বলেছেন, ‘ওদের দলটা দেখুন। অনেক ভারসাম্য রয়েছে। জসপ্রীত বুমরাহের মতো ক্রিকেটার বোলিং বিভাগের নেতৃত্ব দেবে। মহম্মদ সিরাজ, প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ রয়েছে। রবীন্দ্র জাডেজা, মানব সুতারের মতো স্পিনার রয়েছে। চতুর্থ পেসারও থাকতে পারে। আশা করি দুর্দান্ত একটা সিরিজ় হতে চলেছে।’ ভারত ও নিউ জিল্যান্ডের সাম্প্রতিক ক্রিকেট ইতিহাসেও এই লড়াই যথেষ্ট আকর্ষণীয়। দুই দলই একে অপরের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে ভালভাবে জানে। ফলে সিরিজ় শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে রোহিত ও কোহলির মতো অভিজ্ঞ ব্যাটার দলে থাকলে তাঁদের জন্য আলাদা বোলিং পরিকল্পনা তৈরি করতেই হবে কিউয়িদের। এর আগে নিউ জিল্যান্ডের মাটিতে রোহিত-কোহলি একাধিক স্মরণীয় ইনিংস খেলেছেন। ফলে স্যান্টনারের কাছে তাঁদের অভিজ্ঞতা শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। ঘরের মাঠের পরিবেশ কীভাবে কাজে লাগাতে হবে আর কোন পরিস্থিতিতে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে হবে, তা দুই অভিজ্ঞ ভারতীয় ব্যাটার জানেন। সেই কারণেই তাঁদের রান আটকানো নিউ জিল্যান্ডের অন্যতম বড় লক্ষ্য হতে পারে।
অন্য দিকে, ভারতীয় দলের সামনে চ্যালেঞ্জ হবে কিউয়ি পরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া। নিউ জিল্যান্ডের মাঠে আবহাওয়া, পিচের চরিত্র ও বাউন্সের ধরন ভারতীয় উপমহাদেশের তুলনায় আলাদা। নতুন ক্রিকেটারদের জন্য তাই সফরের শুরু থেকেই মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। রোহিত ও কোহলির মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের উপস্থিতি সেই জায়গায় দলের তরুণদের জন্য বড় সহায়তা হতে পারে। উল্লেখ্য, ৪ নভেম্বরের প্রথম এক দিনের ম্যাচের দিকে তাকিয়ে তাই দুই শিবিরেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। এক দিকে রোহিত-কোহলির ব্যাট থামানোর পরিকল্পনা করবে নিউ জিল্যান্ড, অন্য দিকে, ভারত চাইবে তাদের অভিজ্ঞ দুই ব্যাটার এবং শক্তিশালী বোলিং আক্রমণকে কাজে লাগিয়ে সিরিজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। বিশ্বকাপের আগে দুই দলের জন্যই এই সিরিজ দল গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আর তার আগেই মিচেল স্যান্টনারের বক্তব্য বুঝিয়ে দিচ্ছে, রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলিকে কোনও ভাবেই সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে না নিউ জিল্যান্ড। দুই মাস আগে থেকেই যদি কিউয়ি শিবিরে তাঁদের নিয়ে এতটা পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায়, তা হলে মাঠে লড়াই কতটা জমজমাট হতে পারে, তার আভাস মিলছে এখনই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rohit Sharma Padma Shri | পদ্মশ্রী পেলেন রোহিত শর্মা, রাষ্ট্রপতি ভবনে সম্মান গ্রহণ




