সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুর্শিদাবাদ : বিধানসভা নির্বাচনের এখনও বেশ কিছু মাস বাকি। নির্বাচনী নির্ঘণ্টও ঘোষণা হয়নি। কিন্তু তার আগেই রাজনীতির ময়দানে বড়সড় চমক দিলেন তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হওয়া ভরতপুরের নির্দল বিধায়ক হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir)। সোমবার দুপুরে নিজের নতুন রাজনৈতিক দল ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’ (Janata Unnayan Party – JUP) -এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের দিনই আংশিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে তিনি নির্বাচনী লড়াই শুরু করে দিলেন। দল প্রতিষ্ঠার মঞ্চ থেকেই হুমায়ুনের হুঙ্কার, ‘আগামী বিধানসভা ভোটেই মুর্শিদাবাদে তৃণমূলকে শূন্যে নামিয়ে আনব।’
নয়া দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিলেন হুমায়ুন। একদিকে যেমন তিনি তৃণমূল কংগ্রেসকে (Trinamool Congress) সরাসরি নিশানা করেন, তেমনই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও (Mamata Banerjee) একাধিক ইস্যুতে আক্রমণ করেন। তাঁর দাবি, তাঁকে দল থেকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল।
উল্লেখ্য যে, সোমবার ঘোষিত আংশিক প্রার্থী তালিকায় মোট ১০টি বিধানসভা কেন্দ্রের নাম রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে হুমায়ুনের নিজের সিদ্ধান্ত। তিনি জানিয়েছেন, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নিজেই দু’টি কেন্দ্র থেকে লড়বেন, ভরতপুর (Bharatpur) এবং রেজিনগর (Rejinagar)। রাজনৈতিক মহলের মতে, একই সঙ্গে দু’টি কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং শক্তি প্রদর্শনেরই ইঙ্গিত।
মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’ -এর প্রার্থী করা হয়েছে মনীষা পাণ্ডেকে (Manisha Pandey)। তিনি আগে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রানিনগর (Raninagar) কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হচ্ছেন আর এক হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir), তিনি ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কংগ্রেসের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।
নয়া দলে যোগ দিয়েছেন প্রাক্তন পুলিশকর্মী সিরাজুল হক মণ্ডল (Sirajul Haque Mondal)। তিনি দাবি করেন, একসময় বাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে নিজের চাকরি হারিয়েছিলেন। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় ছিলেন, কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। বর্তমানে তিনি ফেরিওয়ালার কাজ করে সংসার চালান। জেইউপি-তে যোগ দিয়েই সিরাজুলের বিস্ফোরক মন্তব্য, ‘আসল গদ্দার তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’ হুমায়ুন তাঁকে বারাসত (Barasat) কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করার প্রস্তাব দিয়েছেন বলেও জানান। প্রার্থী তালিকায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে জেইউপি। পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর গ্রামীণ (Kharagpur Rural) কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হচ্ছেন ইব্রাহিম হাজি (Ibrahim Haji)। মালদহের বৈষ্ণবনগর (Baishnabnagar) কেন্দ্র থেকে মুস্তারা বিবি (Mustara Bibi)। ভগবানগোলা (Bhagabangola) থেকে প্রার্থী হচ্ছেন আরও এক হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir )। দক্ষিণ দিনাজপুরের হরিরামপুর (Harirampur) কেন্দ্র থেকে লড়বেন ওয়েদুল রহমান (Wedul Rahman)। কলকাতার বালিগঞ্জ (Ballygunge) কেন্দ্র থেকে জেইউপি -এর প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে নিশা চট্টোপাধ্যায় (Nisha Chattopadhyay) -এর।
দলের ভবিষ্যৎ কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হুমায়ুন কবীর বলেন, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলাতেও বিজেপির (BJP) আসনসংখ্যা বাড়তে পারে, যদি তারা নিজেদের কৌশল ঠিকমতো প্রয়োগ করে। তবে তৃণমূলের ক্ষেত্রে আর কোনও সুযোগ নেই বলেই তাঁর দাবি। হুমায়ুনের কথায়, ‘আমি বেঁচে থাকলে আগামী নির্বাচনে মুর্শিদাবাদে তৃণমূলকে শূন্যে নামিয়ে আনব।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) -এর পারিবারিক সম্পত্তি নিয়েও কটাক্ষ করেন হুমায়ুন। তিনি বলেন, ‘আপনি মানুষকে ইউজ় অ্যান্ড থ্রো করেন। কত দিন এই শক্তি থাকবে? আপনি যদি বলেন আমি গদ্দারি করেছি, সেটাও বলবেন। কিন্তু আপনি যে কত রকম মিথ্যাচার করেছেন, সেগুলোও বাংলার মানুষকে জানাব। শেষ সিদ্ধান্ত নেবে মানুষই।’ নিজের সাসপেন্ড হওয়া নিয়েও ক্ষোভ উগরে দেন হুমায়ুন। তাঁর অভিযোগ, মালদহ (Malda) থেকে ফোন করে একাধিক তৃণমূল নেতার সঙ্গে আলোচনা করেই তাঁকে দল থেকে বার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি নাম করে লালগোলার বিধায়ক মহম্মদ আলি (Mohammad Ali), মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান (Abu Taher Khan), বহরমপুর পুরসভার চেয়ারম্যান নড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায় (Narugopal Mukhopadhyay) এবং জেলা তৃণমূল সভাপতি অপূর্ব সরকার (Apurba Sarkar) -এর কথা উল্লেখ করেন। হুমায়ুনের চ্যালেঞ্জ, ‘শক্তি থাকলে মুর্শিদাবাদে খাতা খুলে দেখাবেন।’
হুমায়ুন কবীর তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষকেও (Kunal Ghosh) চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন হুমায়ুন। তাঁর দাবি, আগামী জানুয়ারিতে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে (Brigade Parade Ground) লক্ষাধিক মানুষের জমায়েত করে শক্তি প্রদর্শন করবেন। জেইউপি -এর লক্ষ্যও স্পষ্ট করে দিয়েছেন হুমায়ুন কবীর। তাঁর দাবি, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ১০০টি আসনে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে তারা লড়াইয়ে নামবে। প্রার্থীদের মধ্যে ৭০ শতাংশ মুসলিম এবং ৩০ শতাংশ হিন্দু প্রার্থী থাকবেন বলে তিনি জানিয়েছেন। পাশাপাশি মুর্শিদাবাদের তৃণমূল বিধায়কদের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ তোলেন এবং কেন ইউসুফ পাঠান (Yusuf Pathan), কীর্তি আজাদ (Kirti Azad) ও শত্রুঘ্ন সিনহা (Shatrughan Sinha) -এর মতো অবাঙালিদের তৃণমূল সাংসদ করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। প্রসঙ্গত, আগামী ৪ জানুয়ারি ডোমকল (Domkal) এবং ৫ জানুয়ারি হরিহরপাড়ায় (Hariharpara) জেইউপি-এর পরবর্তী সভা হবে। হুমায়ুনের দাবি, ওই দুই সভায় তৃণমূল এবং আইএসএফ (ISF) থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী-সমর্থক তাঁর দলে যোগ দেবেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, ভোটের আগে হুমায়ুন কবীরের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Babri Masjid donation, Humayun Kabir fund | বাবরি মসজিদের নামে অনুদানে ঢল, এক দিনে ২০ লক্ষ জমা পড়তেই বাড়ানো হল ব্যাঙ্ক লিমিট




