সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পূর্ব বর্ধমান : উচ্চ মাধ্যমিক (Higher Secondary Examination বা HS) পরীক্ষার আবহে গম্ভীর পরিবেশ থাকার কথা। কিন্তু বর্ধমানের (Bardhaman) গুসকরা (Guskara) শহরে একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের সামনে ঘটল চাঞ্চল্যকর ঘটনা। বছর তিনেকের প্রেমের সম্পর্কের পর সদ্য বিবাহিত এক উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীকে নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রের সামনে মুখোমুখি হলেন মা ও শাশুড়ি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ‘মেয়েকে নিয়ে টানাটানি শুরু হয় দুই পরিবারের মধ্যে।’ ধাক্কাধাক্কির জেরে অসুস্থ হয়ে পড়েন ওই ছাত্রী। পরে তাঁকে গুসকরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গোটা ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে খবর, গুসকরা শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ওই ছাত্রী গুসকরা গার্লস হাই স্কুল (Guskara Girls High School) -এর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। দীর্ঘদিন ধরে গুসকরা শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুরজ পাসোয়ান (Suraj Paswan) নামে ২৮ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরিবার সূত্রে খবর, প্রায় তিন বছর ধরে সম্পর্ক চলার পর দুই সপ্তাহ আগে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে এই বিয়ে নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল ছাত্রীর বাবা-মায়ের। ছাত্রীর মায়ের অভিযোগ, ‘আমি এখনই মেয়ের বিয়ে দিতে চাইনি। ওর পড়াশোনা আগে শেষ হোক, সেটাই চেয়েছিলাম।’ তাঁর দাবি, পরিবারের অমতে তড়িঘড়ি করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং স্থানীয় কয়েকজন এই বিয়েতে সহায়তা করেছেন। অন্যদিকে ছাত্রীর শাশুড়ির বক্তব্য একেবারেই আলাদা। তিনি বলেন, ‘মেয়ের বাবা-মা, কাকা সকলে আমাদের বাড়িতে এসে কথাবার্তা বলেই বিয়ের সিদ্ধান্ত হয়। দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ে হয়েছে।’ এই পরস্পরবিরোধী দাবিকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে জটিলতা।
সূত্রের খবর, বিয়ের পর থেকে ছাত্রীটি শ্বশুরবাড়িতেই ছিলেন। সেখান থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পরিবার সূত্রে খবর, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য নিয়মিত প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। মঙ্গলবার নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা দিতে যান গুসকরা পি পি ইন্সটিটিউশন (Guskara P P Institution) পরীক্ষাকেন্দ্রে। স্বামী সুরজ পাসোয়ান তাঁকে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরে যান বলে জানা গিয়েছে। সমস্যার সূত্রপাত হয় পরীক্ষা শেষের পর। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, ‘পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই ছাত্রীর মা স্কুল গেটের বাইরে এসে অপেক্ষা করছিলেন।’ পরীক্ষা দিয়ে বেরনোর পর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরতে চান তিনি। কিন্তু ছাত্রী নাকি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি শ্বশুরবাড়িতেই ফিরে যেতে চান। সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রীর শাশুড়িও। এরপরই দুই পরিবারের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে।
স্থানীয়দের দাবি, ‘মেয়েকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য মা ও শাশুড়ির মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।’ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ছাত্রীটি মাটিতে পড়ে যান। মাথায় আঘাত লাগে বলে অভিযোগ। দ্রুত তাঁকে গুসকরা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে নিয়েও দুই পরিবারের মধ্যে বচসা চলতে থাকে বলে জানা যায়। ঘটনাস্থলে ভিড় জমে যায় কৌতূহলী মানুষের। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর। তবে মানসিক চাপে তিনি ভেঙে পড়েছেন বলে পরিবারের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি। ছাত্রীর মায়ের কথায়, ‘আমি মেয়েকে আরও পড়াতে চেয়েছিলাম। এখনই সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ছেলের বাড়ির লোকজন কথা রাখেনি।’
অন্যদিকে, ছাত্রী নিজে জানিয়েছেন, তিনি শ্বশুরবাড়িতে থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান। তাঁর বক্তব্য, ‘আমি পরীক্ষা দিতে এসেছি। পড়াশোনা বন্ধ করতে চাই না। সংসার আর পড়া দুটোই সামলাতে পারব।’ এই বক্তব্য ঘিরেই নতুন করে আলোচনার জন্ম নিয়েছে।
আইনবিদদের মতে, ১৮ বছর পূর্ণ হলে মেয়েরা আইনত বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতা অনেক সময় পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, ‘এ ধরনের ঘটনায় পারিবারিক সংলাপ ও পরামর্শের অভাবই মূল সমস্যা।’ উল্লেখ্য, এই ঘটনা ফের একবার সামনে আনল কিশোরী বয়সে প্রেম, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর দ্রুত বিয়ে এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নকে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, গ্রামীণ ও মফসসল অঞ্চলে এখনও মেয়েদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে দ্বিধা ও চাপা টানাপোড়েন রয়েছে। যদিও বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণীই সংসার ও শিক্ষাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী।
গুসকরা (Guskara) জুড়ে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চর্চা চলছে। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নজরে রেখেছে বলে সূত্রের খবর। তবে এখনও পর্যন্ত থানায় কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে এমন ঘটনা শিক্ষাজগতে প্রশ্ন তুলেছে। পড়াশোনা, প্রেম, বিয়ে এবং পারিবারিক সম্মতির জটিল সমীকরণে এক তরুণীর ভবিষ্যৎ এখন আলোচনার কেন্দ্রে। শেষ পর্যন্ত সমাধান কোন পথে হয়, সেদিকেই তাকিয়ে গুসকরার মানুষ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Gold Extraction from Seawater | সাগরের নোনা জলে লুকিয়ে কোটি কোটি টন সোনা, বাস্তবে মিলবে তো?


