সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গুয়াহাটি : অসমের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করতে চলেছে রাজ্য সরকার। সপ্তাহের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) সোশ্যাল মিডিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন, যা মুহূর্তের মধ্যেই রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী মহলে সাড়া ফেলে। তিনি জানান, স্বর্গদেউ চাওলুং চ্যু-কা-ফার (Chaolung Sukaphaa) প্রতি গভীর সম্মান জানাতে চাড়াইদেউতে নির্মিত হবে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, ‘চ্যু-কা-ফা ইউনিভার্সিটি’। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে অসমজুড়ে শুরু হয়েছে গর্ব, আবেগ ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের নতুন আলোচনা।
সোমবার মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পোস্টে লেখেন, ‘স্বর্গদেউ চাওলুং চ্যু-কা-ফাকে সম্মান জানিয়ে চাড়াইদেউরের চ্যু-কা-ফা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা করতে পেরে আমরা গর্ব অনুভব করছি। স্বর্গদেউ চ্যু-কা-ফা যে বড় অসম-এর ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে এটি আমাদের এক বিনম্র প্রয়াস।’ রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে ভবিষ্যতের জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলে মনে করছেন।
চাওলুং চ্যু-কা-ফা (Chaolung Sukaphaa) ছিলেন আহোম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি তৈরি করেছিলেন বড় অসম বা ঐক্যবদ্ধ অসমের বুনিয়াদ। তাই তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই নয়, তা অসমের বহু শতাব্দীর সাংস্কৃতিক সত্তাকে আবারও সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্ববিদ্যালয় চাড়াইদেউ অঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও অসমের গবেষণা-সংস্কৃতি দু’য়েরই মান বাড়াবে। মুখ্যমন্ত্রী শর্মা শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারের কথাই বলেননি, তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে জানুক, বুঝুক এবং গবেষণা করুক, এমন আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছেন। সরকার জানিয়েছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অসমের ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, ভাষা, জনজাতি সংস্কৃতি, নৃবিজ্ঞান, উত্তর-পূর্ব ভারতের সভ্যতা ও ঐতিহ্য নিয়ে বিশেষ বিভাগ থাকবে। গবেষণার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে আধুনিক ল্যাব, লাইব্রেরি ও ডিজিটাল পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে।
চাড়াইদেউ এলাকা নিজেই আহোম সভ্যতার স্মৃতিবিজড়িত স্থান। এখানকার ‘মইদাম’ বা রাজকীয় সমাধিক্ষেত্র ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই তোলা হচ্ছে। এই ঐতিহ্যকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে চাড়াইদেউতেই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার পরিকল্পনাকে অনেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। স্থানীয়দের বক্তব্য, এতদিন পর তাদের অঞ্চল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির যোগ্য একটি শিক্ষাকেন্দ্র পেতে চলেছে, এটাই তাদের কাছে বড় সম্মান। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা শুধু সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ তো অবশ্যই, তেমনি অসমের আত্মপরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করার প্রচেষ্টা। বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে অসম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর আগেও আহোম যুগের বিভিন্ন স্থাপত্য ও ইতিহাস সংরক্ষণে সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। চাওলুং চ্যু-কা-ফার নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ারই অংশ। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা, রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক সাফল্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি মূল্যবান প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে। বহু গবেষক ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন যে, এই বিশ্ববিদ্যালয় উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে, ছাত্র-যুবসমাজের মধ্যে এই ঘোষণাকে ঘিরে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছে। তরুণদের মতে, রাজ্যে আরও একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হলে শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগই বাড়বে না, স্থানীয় শিক্ষার্থীরা নিজেদের ইতিহাস, মাটি ও সংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগও পাবে।এদিকে মুখ্যমন্ত্রী শর্মার সাম্প্রতিক পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। হাজার হাজার মানুষ তাঁর ঘোষণাকে অভিনন্দন জানিয়ে মন্তব্য করেছেন। অনেকেই লিখেছেন, ‘এই উদ্যোগ আমাদের শিকড়কে শক্তিশালী করবে’, ‘অসম তার ইতিহাসকে নতুন করে সম্মান জানাল’, ‘প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে চাওলুং চ্যু-কা-ফার আদর্শ ছড়িয়ে পড়বে’। আরও বলা যায়, স্বর্গদেউ চাওলুং চ্যু-কা-ফাকে সম্মান জানাতে আসাম সরকারের এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নতুন আলো জ্বালাবে না, তা ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র অসমিয়া পরিচয়ের পুনরুজ্জীবনে এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : D’Dan Than Assam, Himanta Biswa Sarma | দ’দান থানে জনজাতীয় বিশ্বাস সংরক্ষণে নতুন উদ্যোগ, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বার্তা




