সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গুয়াহাটি : অসমের জনজাতীয় মানুষের লোকবিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা এবং ঐতিহ্যকে সংরক্ষণে বড় পদক্ষেপ নিল রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানিয়েছেন যে জনজাতি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরম্পরা রক্ষার জন্য একটি বিশেষ বিভাগ চালু করা হয়েছে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন, অসমের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোই তাঁর সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) লিখেছেন, “জনজাতীয় লোকবিশ্বাস আৰু পৰম্পৰাক সন্মান সহকাৰে সংৰক্ষণ আৰু সুৰক্ষা প্রদানৰ বাবে আমি সমর্পিত এটি বিভাগ মুকলি কৰি আমাৰ আন্তৰিক প্রয়াসক আগুৱাই নিছোঁ।” শুধু ঘোষণাই নয়, নতুন উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে এসেছে গোয়ালপাড়ার মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে অবস্থিত ‘শ্রীশ্রী ৰিছি আশ্রিত দ’দান’ থানের নাম। মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায়, “এই চেষ্টা সামৰি লৈছে গোৱালপাৰাৰ অপৰূপ প্রাকৃতিক শোভাৰ মাজত বিদ্যমান শ্রীশ্ৰী ৰিছি আশ্ৰিত দ’দান থানখনকো।”
রাভা জনজাতির (Rava Community) আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের কেন্দ্র হিসেবে দ’দান থান বহুদিন ধরেই সম্মান ও শ্রদ্ধার স্থান। এখানকার লোকবিশ্বাস, প্রাচীন রীতিনীতি এবং সাংস্কৃতিক চর্চা শিকড় গেঁথে আছে ইতিহাসের গভীরে। সেই ঐতিহ্যকে সরকারি স্তরে আরও সুরক্ষিত ও বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করতে উদ্যোগ নিয়েছে অসম সরকার। মুখ্যমন্ত্রী আরও লিখেছেন, “ৰাভা সমাজৰ বিশ্বাস আৰু আধ্যাত্মিকতাৰে সুশোভিত পর্যটনৰো আকর্ষণ বিন্দু থানখনৰ বাবে সেৱা আগবঢ়াবলৈ পোৱাতো আমাৰ বাবে সৌভাগ্যৰ বিষয়ো।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, দ’দান থানকে সাংস্কৃতিক পর্যটনেরও শক্তিশালী গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাজ্যের প্রতিটি উপজাতি সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। মুখ্যমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, “আমি প্রতিটো জনগোষ্ঠীৰ লোকবিশ্বাসৰ আধাৰথলীৰ বাবে এনেকৈয়ে আন্তৰিকতাৰে সেৱা আগবঢ়াবলৈ আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” তাঁর এই ঘোষণা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং প্রশাসনের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় করেছে।
স্থানীয় রাভা সংগঠনগুলোর মতে, অনেক দিন ধরেই দ’দান থানের উন্নয়ন, সুরক্ষা ও পর্যটন অবকাঠামো বাড়ানোর দাবি উঠছিল। অবশেষে সরকারিভাবে এই পদক্ষেপ নেওয়ায় তাঁরা স্বস্তি পেয়েছেন। একজন স্থানীয় রাভা সাংস্কৃতিক গবেষক জানান, “দ’দান থানে আমাদের সমাজের আত্মপরিচয়, বিশ্বাস এবং অতীতের ইতিহাস একসঙ্গে বহন করে। এবার সরকার উদ্যোগ নেওয়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা আরও সমৃদ্ধভাবে পৌঁছাবে।” বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিভাগ চালু করার ফলে শুধু দ’দান থান নয়, অসমজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বহু উপজাতি জনগোষ্ঠীর লোকবিশ্বাস, দেব-দেবীর পূজা-পদ্ধতি, ঐতিহ্যবাহী আচার এবং পবিত্র স্থানগুলি নথিভুক্ত ও রক্ষিত হবে। এর ফলে একদিকে যেমন সংস্কৃতি সংরক্ষণ হবে, অন্যদিকে রাজ্যের পর্যটন খাত আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষত গোয়ালপাড়া জেলার মতো অঞ্চলগুলি প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের অনন্য সম্মিলন হিসেবে জাতীয় পর্যটনের মানচিত্রে আরও উজ্জ্বলভাবে উঠে আসতে পারে। পর্যটন দপ্তরের এক কর্তা জানিয়েছেন, দ’দান থানকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও তুলে ধরা হবে। ইতিমধ্যেই রাস্তাঘাট, ইকো-ট্যুরিজম, নিরাপত্তা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং জনসচেতনতার পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে। তাঁদের মতে, এই প্রকল্প সফল হলে রাভা সমাজের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নতুনভাবে আলোতে আসবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার (Himanta Biswa Sarma) এই পদক্ষেপ শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং জনগোষ্ঠীগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রতীক। এমন উদ্যোগ উত্তর-পূর্ব ভারতের জনজাতি সম্প্রদায়ের আত্মমর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষায় নতুন মাইলফলক। অসমে বিভিন্ন জনজাতি সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়াই করে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে দ’দান থানের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থানকে সরকারি সহায়তা এবং উন্নয়নের আওতায় আনা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। স্থানীয় মানুষ মনে করছেন, এই উদ্যোগ তাঁদের পরিচিতিকে আরও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরবে। অসম সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে সমস্ত জনজাতিগত ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র পর্যায়ক্রমে সুরক্ষা ও উন্নয়নের আওতায় আনা হবে। দ’দান থান সেই সূচনার প্রথম ধাপ। মানুষের বিশ্বাস, আস্থা ও ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শুরু হলো নতুন এক যাত্রা, যা শুধু সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ নয়, বরং সামাজিক ঐক্যেরও প্রতীক হয়ে উঠবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Assam women SHG scheme, Himanta Biswa Sarma Facebook Post | অসমে ‘লাখপতি বাইদেউ’ প্রকল্পে নতুন ধাপ: ২৪,৮২৭ নারীকে আর্থিক সহায়তা, বললেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা


