বিনীত শর্মা, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : গুরমিত রাম রহিম সিং (Gurmeet Ram Rahim Singh) ফের জেল থেকে বাইরে এলেন। দুই শিষ্যাকে ধর্ষণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগরত এই ধর্মগুরু সোমবার হরিয়ানার রোহতকের সুনারিয়া জেল (Sunaria Jail) থেকে ৪০ দিনের প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন। ২০১৭ সালে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর এটাই তাঁর ১৫তম বার জেল থেকে সাময়িক মুক্তি। এই ঘটনাকে ঘিরে ফের রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ডেরা সূত্রে জানা গিয়েছে, প্যারোলের এই ৪০ দিনের সময়কালে গুরমিত রাম রহিম সিং হরিয়ানার সিরসায় (Sirsa) অবস্থিত ডেরার মূল আশ্রমেই থাকবেন। ডেরার মুখপাত্র ও আইনজীবী জিতেন্দ্র খুরানা (Jitender Khurana) জানিয়েছেন, ‘আইন অনুযায়ী প্যারোল মঞ্জুর হয়েছে এবং তিনি নির্ধারিত নিয়ম মেনেই আশ্রমে থাকবেন।’ প্রশাসনের তরফেও জানানো হয়েছে, প্যারোলের শর্ত অনুযায়ী তাঁর চলাফেরার উপর নজর রাখা হবে।
উল্লেখ্য, গুরমিত রাম রহিম সিং শুধু ধর্ষণের মামলাতেই নয়, সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাতেও দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি ও আরও তিনজনকে প্রায় ১৬ বছর আগে একজন সাংবাদিককে হত্যার দায়ে দোষী ঘোষণা করা হয়। যদিও ২০২৪ সালের মে মাসে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট (Punjab and Haryana High Court) ২০০২ সালে ডেরার প্রাক্তন ম্যানেজার রঞ্জিত সিং (Ranjit Singh) হত্যাকাণ্ডের মামলায় তাঁকে এবং আরও চারজনকে খালাস দেয়। আদালত জানায়, তদন্ত ছিল ‘কলুষিত ও অস্পষ্ট’, এবং সেই কারণেই সিবিআই (CBI) আদালতের যাবজ্জীবন সাজা খারিজ করা হয়। তবে সিবিআই আগেই দাবি করেছিল, এই হত্যাকাণ্ড একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গুরমিত রাম রহিম সিং-এর প্যারোলের সময়সূচী লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিবারই তা কোনও না কোনও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে মিলে গিয়েছে। তিনি সর্বশেষ ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ৪০ দিনের প্যারোলে জেল থেকে বেরিয়েছিলেন। তার আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ২১ দিনের ফারলো (furlough) এবং জানুয়ারিতে ৩০ দিনের প্যারোল পান, যা দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের (Delhi Assembly Election) ঠিক আগেই কার্যকর হয়েছিল। একইভাবে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনের (Haryana Assembly Election) ঠিক আগে তিনি ২০ দিনের প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিলেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতেও পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনের (Punjab Assembly Election) কিছুদিন আগে তাঁকে তিন সপ্তাহের ফারলো দেওয়া হয়।এই ধারাবাহিক প্যারোল ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। শিরোমণি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটি (Shiromani Gurdwara Parbandhak Committee) সহ একাধিক শিখ সংগঠন অতীতে বারবার প্রশ্ন তুলেছে, কীভাবে একজন গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে এতবার ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, এতে বিচার ব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয় এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি অন্যায় বার্তা যায়।
অন্যদিকে, ডেরা সচ্চা সৌদার অনুগামীদের সংখ্যা উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্যে বিপুল। হরিয়ানা, পাঞ্জাব, রাজস্থান এবং উত্তরপ্রদেশে ডেরার শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। বিশেষ করে হরিয়ানার সিরসা, ফতেহাবাদ (Fatehabad), কুরুক্ষেত্র (Kurukshetra), কৈথাল (Kaithal) ও হিসার (Hisar) জেলায় ডেরার অনুগামীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ফলে প্রতিবার প্যারোলের সময় রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। আইনজ্ঞদের একাংশের মতে, প্যারোল ও ফারলো আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হলেও এত ঘনঘন এই সুবিধা পাওয়া প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাঁরা বলছেন, ‘প্যারোল মূলত মানবিক কারণ বা পুনর্বাসনের জন্য, কিন্তু এর ব্যবহার যেন রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে।’ অপরদিকে, ডেরা পক্ষের দাবি, ‘আইনের মধ্যে থেকেই সব কিছু হচ্ছে এবং এতে কোনও অনিয়ম নেই।’
এই মুহূর্তে গুরমিত রাম রহিম সিং-এর মুক্তি ঘিরে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অতীতে তাঁর মুক্তির সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এবারও সিরসা ও সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে ৪০ দিনের প্যারোলে গুরমিত রাম রহিম সিং-এর জেলমুক্তি শুধু একটি আইনি ঘটনা নয়, বরং তা উত্তর ভারতের রাজনীতি, ধর্মীয় প্রভাব এবং বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিল। আগামী দিনে এই প্যারোল ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশবাসী।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rajasthan mobile ban, camera phone ban for women | প্রজাতন্ত্র দিবস থেকে ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল নিষিদ্ধ! রাজস্থানের গ্রাম পঞ্চায়েতের ফরমান ঘিরে তীব্র বিতর্ক




