আলোক নাথ, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : একসময় যে পরকীয়া সমাজে ভাঙনের প্রতীক বলে বিবেচিত হতো, আজ তা রূপ নিচ্ছে কোটি টাকার ডিজিটাল ব্যবসায়। আধুনিক প্রযুক্তির দৌলতে এখন সম্পর্কের বাইরে নতুন সংযোগের খোঁজ মিলছে এক ক্লিকেই। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ঘিরে ফের আলোচনায় এসেছে এক বিতর্কিত অ্যাপ ‘গ্লিডেন’ (Gleeden), যা দাবি করছে গোপনে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ। এই অ্যাপ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এখন তুমুল বিতর্ক, তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা দেখে মনে হচ্ছে বিতর্ক নয়, তা চাহিদাই বাড়ছে বহুগুণে।ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করছেন কীভাবে কাজ করে এই অ্যাপ। তাঁর দাবি অনুযায়ী, গ্লিডেন মূলত মহিলাদের কথা ভেবেই তৈরি। মহিলারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সাইন আপ করতে পারেন, কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই আর্থিক ব্যয় রয়েছে। পুরুষ ব্যবহারকারীদের ন্যূনতম ১,৮০০ টাকা খরচ করেই অ্যাপে প্রবেশাধিকার মিলবে। এরপর মেসেজ পড়া, ভার্চুয়াল উপহার পাঠানো, প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য আলাদা করে টাকা গুনতে হয়। তবে গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে অ্যাপ কর্তৃপক্ষ বাড়তি সতর্ক। ওই ভিডিওতে বলা হয়, লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টেও সরাসরি ‘গ্লিডেন’ শব্দটি দেখা যায় না, বরং তা “গুগল জিডি মিডিয়া” (Google GD Media) নামে প্রদর্শিত হয়।
শুধু তাই নয়, হঠাৎ করে কেউ ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে ব্যবহারকারীরা ব্যবহার করতে পারেন ‘কুইক-এক্সিট’ বোতাম। এক ক্লিকেই সঙ্গে সঙ্গে লগ আউট হয়ে যাওয়া সম্ভব। ভিডিওর বক্তা মন্তব্য করেছেন, “এ যেন পরকীয়ার স্টেরয়েড! তবে মজার বিষয় হল, এমন একটি অ্যাপের আসলে কারোরই প্রয়োজন নেই।” কিন্তু বাস্তব ছবিটা একেবারে আলাদা। গ্লিডেনের জনপ্রিয়তা আকাশ ছোঁয়া। ‘মানি কন্ট্রোল’ (Money Control) -এর তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রায় ৩০ লক্ষ ভারতীয় এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২৭০ শতাংশ ব্যবহারকারীর বৃদ্ধি ঘটেছে। গ্লিডেনের সদস্যদের মধ্যে এখন ৫৮ শতাংশই মহিলা, যা স্পষ্ট করে দিচ্ছে এ অ্যাপ শুধু পুরুষদের জন্য নয়। আরও চমকপ্রদ তথ্য হল, প্রতিদিন প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যবহারকারী এখানে গড়ে ৪৫ মিনিট সময় কাটাচ্ছেন। এদের বেশিরভাগের বয়স ৩০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে।
অন্যদিকে, ডিজিটাল পরকীয়ার হটস্পট হয়ে উঠেছে মেট্রো শহরগুলো। গ্লিডেনের ব্যবহারকারীদের মধ্যে ২০ শতাংশই বেঙ্গালুরু (Bengaluru) -এর, ১৯ শতাংশ মুম্বই (Mumbai), ১৮ শতাংশ কলকাতা (Kolkata) এবং ১৫ শতাংশ দিল্লি (Delhi) -এর বাসিন্দা। অর্থাৎ, ভারতের বড় শহরগুলোতেই এই অ্যাপের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। তবে এখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শহরগুলোতেও দ্রুত বাড়ছে এই প্রবণতা।
গ্লিডেনই একমাত্র নয়। বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক তৈরির জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাত আরেকটি প্ল্যাটফর্ম ‘অ্যাশলি ম্যাডিসন’ (Ashley Madison) জানিয়েছে, ভারত তাদের জন্য দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলির একটি। তাদের সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা যায়, তামিলনাড়ুর কাঞ্চীপুরম (Kanchipuram) শহরে সাইন আপের হার এখন দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। অবাক করার মতো তথ্য হলো, এক বছর আগেও এই শহরটি তালিকায় ১৭ নম্বরে ছিল। আজ সেই শহর দিল্লি বা মুম্বইয়ের মতো মেট্রোপলিসকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। সমাজতাত্ত্বিকরা বলছেন, এর পেছনে সমাজে পরিবর্তনশীল মানসিকতার প্রভাব রয়েছে। একদিকে পরিবার ও সমাজের চাপ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার খোঁজ, এই দুইয়ের টানাপোড়েনে অনেকেই নতুন ধরনের সম্পর্কের খোঁজ করছেন। আবার কারও কারও মতে, এটি আসলে নিছক এক ধরনের ‘এস্কেপ রুট’, যেখানে মানুষ তাদের দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি খোঁজেন। যতই জনপ্রিয় হোক, বিতর্ক কিন্তু থেমে নেই। সমাজবিদদের একাংশের মতে, এই ধরনের অ্যাপ সমাজে পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে তুলছে। অপরদিকে প্রযুক্তিবিদদের দাবি, এটি কেবল চাহিদা মেটানোর মাধ্যম, যা আইনি কাঠামোর বাইরে নয়।
অর্থাৎ, আধুনিক ভারতের ডিজিটাল লাইফস্টাইলে ‘গ্লিডেন’ এবং এর মতো প্ল্যাটফর্ম এখন একটি অস্বীকারযোগ্য বাস্তবতা, কিন্তু প্রশ্ন হল, এই প্রবণতা কতদূর ছড়াবে এবং এর প্রভাব কতটা গভীর হবে? সমাজের পরিকাঠামোয় তা ভাঙন ডেকে আনবে, নাকি এক নতুন সম্পর্কের দিগন্ত খুলে দেবে, উত্তর সময়ই দেবে।
-প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র




