সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কাজ দেওয়ার কথা বলে পরিচয়, তার পর ধীরে ধীরে বিশ্বাস অর্জন। ফুটপাতে থাকা এক দম্পতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে তাঁদের মাত্র ছ’মাসের শিশুকে অপহরণের (Child Kidnapping) অভিযোগ উঠল এক মহিলার বিরুদ্ধে। রবিবারের এই ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায় কলকাতায়। তবে অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্তে নামে পুলিশ। একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে অপহরণে ব্যবহৃত ট্যাক্সির হদিস মেলে। শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে উদ্ধার করার পাশাপাশি গ্রেফতার করা হয়েছে তিন জনকে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন মূলচক্রী হিসাবে অভিযুক্ত এক মহিলা, আরও এক মহিলা ও ট্যাক্সিচালক। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারের নীচে শিশুকে নিয়ে থাকতেন আজমিরা মোল্লা ও তাঁর স্বামী আলমগীর মোল্লা। আর্থিক অনটনের কারণে তাঁদের জীবন কাটে ফুটপাতেই। সেই পরিবারের সঙ্গে কয়েক দিন আগে পরিচয় হয় এক মহিলার। পরিচয়ের পর থেকেই ওই মহিলা আজমিরার সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন এবং তাঁর শিশুর সঙ্গেও সময় কাটাতেন। ধীরে ধীরে তাঁর উপর পরিবারের আস্থা তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ।
রবিবার সেই বিশ্বাসকেই কাজে লাগিয়ে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। অভিযোগ, ওই মহিলা আজমিরাকে কাজ দেওয়ার কথা বলেন। কাজের বিষয়ে কথা বলার জন্য শিশুকে সঙ্গে নিয়ে ট্যাক্সিতে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কাজের আশায় আজমিরাও সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। শিশুকে কোলে নিয়ে তিনি ট্যাক্সিতে ওঠেন। এর পরেই ঘটে যায় ঘটনাটি। অভিযোগ, পার্ক সার্কাসের কাছে পৌঁছনোর পর আজমিরাকে ট্যাক্সি থেকে নেমে যেতে বলা হয়। কাজের বিষয়ে কোনও কারণে তাঁকে সেখানে নামতে বলা হয়েছে বলে তিনি ধরে নিয়েছিলেন। সেই মতো ট্যাক্সি থেকে নেমে পড়েন তিনি। কিন্তু আজমিরা গাড়ি থেকে নামার পরেই পরিস্থিতি বদলে যায়। তাঁর ছ’মাসের সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ট্যাক্সিটি দ্রুত সেখান থেকে চলে যায় বলে অভিযোগ। এক মুহূর্তের মধ্যে সন্তানকে চোখের সামনে থেকে হারিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন আজমিরা। পরে স্বামী আলমগীরকে বিষয়টি জানান তিনি। শিশুকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, কিছুই বুঝতে পারছিলেন না তাঁরা। দ্রুত পুলিশের দ্বারস্থ হন দম্পতি। অভিযোগ পাওয়ার পরই শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য তদন্ত শুরু করে কলকাতা পুলিশ।
তদন্তকারীরা প্রথমেই ট্যাক্সিটির সন্ধান করার চেষ্টা করেন। পার্ক সার্কাসের আশপাশের রাস্তা থেকে শুরু করে সম্ভাব্য যাতায়াতের পথের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ঘটনায় ৫০টিরও বেশি সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়েছে। একাধিক ক্যামেরার ছবি পর পর মিলিয়ে ট্যাক্সিটির গতিবিধি অনুসরণ করার চেষ্টা করেন তদন্তকারীরা। দীর্ঘ সময়ের ফুটেজ বিশ্লেষণের পরে শেষ পর্যন্ত ট্যাক্সিটিকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এর পর ট্যাক্সিচালককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। তদন্তকারীদের প্রশ্নের মুখে তাঁর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মেলে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। সেই সূত্র ধরেই অপহরণে জড়িত সন্দেহে আরও দুই মহিলার কাছে পৌঁছন তদন্তকারীরা।
পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন বন্দনা রায় ও মধু নামে দুই মহিলা। তদন্তকারীদের দাবি, বন্দনা গড়িয়াহাট এলাকার ফুটপাতেই থাকেন। ফলে আজমিরা ও আলমগীরের পরিবারের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই শিশুটির পরিবার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। অন্য দিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা মধুকে এই ঘটনার মূলচক্রী বলে দাবি করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে শেষ পর্যন্ত মধুর বাড়ি থেকেই উদ্ধার করা হয়। শিশুকে উদ্ধার করার পর তাকে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সন্তানকে ফিরে পেয়ে স্বাভাবিক ভাবেই স্বস্তি পেয়েছেন আজমিরা ও আলমগীর।
কিন্তু শিশুটিকে কেন অপহরণ করা হয়েছিল, তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল এবং এই ঘটনার পিছনে আরও কেউ জড়িত কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। মূলচক্রী হিসাবে অভিযুক্ত মধুর সঙ্গে বন্দনা ও ট্যাক্সিচালকের যোগাযোগের ধরনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিশুটিকে বিক্রি করার কোনও পরিকল্পনা ছিল কি না, নাকি অন্য কোনও উদ্দেশ্যে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে কাজের প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে। কারণ, অপরিচিত কাউকে সহজে বিশ্বাস না করলেও নিজের আর্থিক পরিস্থিতির কারণে কাজের সুযোগ পেলে অনেকেই সেই প্রস্তাবে সাড়া দেন। এই ঘটনাতেও কাজের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেই আজমিরার আস্থা অর্জন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। তার পর শিশুকে সঙ্গে নিয়ে ট্যাক্সিতে ওঠানো হয়। তদন্তকারীরা মনে করছেন, পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত হতে পারে। কারণ, শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট জায়গায় মাকে নামিয়ে দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যে পরিকল্পনার ছাপ রয়েছে। ট্যাক্সিচালকও এই ঘটনার বিষয়ে আগে থেকে কিছু জানতেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর মোবাইল ফোনের কল তালিকা ও অন্যান্য তথ্যও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
অন্য দিকে, গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারের নিচে বসবাসকারী পরিবারটির সঙ্গে অভিযুক্তদের কীভাবে পরিচয় হয়েছিল, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। বন্দনা আগে থেকেই ওই এলাকায় থাকায় তাঁর সঙ্গে দম্পতির পরিচয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই পরিচয়কে কাজে লাগিয়েই শিশুটির মায়ের বিশ্বাস অর্জন করা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিশু উদ্ধারের ঘটনায় আপাতত তদন্তকারীরা বড় সাফল্য পেলেও ঘটনার পূর্ণ রহস্য এখনও সামনে আসেনি। ছ’মাসের শিশুকে কেন সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কার নির্দেশে পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল এবং এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত কি না, সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
ঘটনাটি সামনে আসার পরে গড়িয়াহাট ও পার্ক সার্কাস এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কাজ দেওয়ার নামে পরিচয় তৈরি করে একটি শিশুকে এ ভাবে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই ধৃত তিন জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অপহরণের পেছনের উদ্দেশ্য জানার চেষ্টা করছেন। পুলিশ সূত্রে খবর, ট্যাক্সিচালককে জিজ্ঞাসাবাদ এবং দুই মহিলার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘটনায় ব্যবহৃত ট্যাক্সি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। গড়িয়াহাটের ফুটপাত থেকে শুরু হয়ে পার্ক সার্কাস হয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা এই ঘটনাপ্রবাহের প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এখন মূল লক্ষ্য, শিশুকে অপহরণের আসল উদ্দেশ্য এবং ঘটনার নেপথ্যে থাকা পুরো চক্রের সন্ধান পাওয়া।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Kolkata hotel fire 2026, New Market hotel fire : জানলা পেরিয়ে তিনতলার কার্নিসে, মোবাইলের আলোয় প্রাণভিক্ষা! হোটেলের ১০ আবাসিকের মধ্যে ৮ জনের মৃত্যু, বেঁচে ফিরলেন বাংলাদেশি দম্পতি




