সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পৃথিবী একই রয়েছে, বদলাচ্ছে তাকে দেখার মানচিত্র। প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত একটি প্রচলিত মানচিত্র প্রক্ষেপণের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আরও বাস্তবসম্মত ভাবে মহাদেশগুলির আয়তন তুলে ধরার উদ্যোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন ‘ইকুয়াল আর্থ’ (Equal Earth) প্রক্ষেপণে আফ্রিকা, ভারত-সহ বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকা ভূখণ্ডগুলি কাগজে তুলনামূলক ভাবে বড় আকারে দেখা যাবে। বিপরীতে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং গ্রিনল্যান্ডের মতো উত্তর গোলার্ধের অঞ্চলগুলি প্রচলিত মানচিত্রের তুলনায় ছোট দেখাবে। এই পরিবর্তনকে নিছক মানচিত্র আঁকার কৌশল হিসেবে দেখছেন না অনেকে। কারণ পৃথিবীর মানচিত্রে কোনও ভূখণ্ডের অবস্থান, সীমারেখা এবং আয়তনের উপস্থাপনা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জম্মু-কাশ্মীর (Jammu and Kashmir) ও লাদাখ (Ladakh) -এর মতো বিতর্কিত অঞ্চল কীভাবে নতুন মানচিত্রে দেখানো হবে, তা নিয়েও ভারতের অবস্থান ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। ফলে ‘ইকুয়াল আর্থ’ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার সঙ্গে ভূখণ্ডগত বিতর্কও জড়িয়ে পড়েছে।
প্রায় ৫০০ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত ‘মার্কেটর প্রোজেকশন’ (Mercator Projection) -এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতল কাগজে এমন ভাবে দেখানো, যাতে দিক ও কোণের হিসাব অনেক ক্ষেত্রে নৌযাত্রার জন্য সুবিধাজনক হয়। কিন্তু এই পদ্ধতির বড় সীমাবদ্ধতা হল, পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার প্রকৃত আয়তনের অনুপাত বজায় থাকে না। বিশেষ করে মেরুর দিকে থাকা অঞ্চলগুলি প্রকৃত আয়তনের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ গ্রিনল্যান্ড (Greenland) ও আফ্রিকা (Africa)। প্রচলিত মার্কেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার কাছাকাছি আয়তনের বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে অবশ্য দুই ভূখণ্ডের মধ্যে আয়তনের বিপুল পার্থক্য রয়েছে। আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বড়। মানচিত্রের এই পার্থক্যই বহু বছর ধরে ভূগোলবিদদের আলোচনার অন্যতম বিষয়।
পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির ইতিহাস অবশ্য আরও পুরনো। প্রাচীন সভ্যতাগুলির সময় থেকেই মানুষ পৃথিবী ও তার বিভিন্ন ভূখণ্ডকে চিত্রের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেছে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর ব্যাবিলনীয় সভ্যতার মানচিত্র থেকে শুরু করে গ্রীক ভূগোলবিদদের কাজ, ধাপে ধাপে পৃথিবীর ভূগোল সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলেছে। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় বসে ভূগোলবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লডিয়াস টলেমি (Claudius Ptolemy) তাঁর বিখ্যাত ‘জিয়োগ্রাফি’ (Geography) গ্রন্থে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলকে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের মাধ্যমে চিহ্নিত করার পদ্ধতি তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় নাবিকদের সমুদ্রযাত্রা এবং নতুন ভূখণ্ডের সন্ধানের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব মানচিত্রও ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও ভূখণ্ড অনুসন্ধানের প্রতিযোগিতা মানচিত্র তৈরির প্রয়োজন আরও বাড়িয়ে দেয়। ১৫০৭ সালে জার্মান মানচিত্রকার মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলার (Martin Waldseemüller) -এর তৈরি মানচিত্রে ‘আমেরিকা’ নামটির ব্যবহার দেখা যায়। এরপর ফ্লেমিশ ভূগোলবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর (Gerardus Mercator) এমন একটি প্রক্ষেপণ তৈরি করেন, যা নৌপরিবহণ ও দিকনির্ণয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর হয়ে ওঠে।
১৫৬৯ সালে মার্কেটরের মানচিত্র প্রকাশিত হওয়ার পর সেটিই দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রচলিত মানচিত্র প্রক্ষেপণ হিসেবে জায়গা করে নেয়। কিন্তু পৃথিবীর ত্রিমাত্রিক গোলাকার পৃষ্ঠকে দ্বিমাত্রিক কাগজে তুলে ধরার সময় আয়তনের যে বিকৃতি ঘটে, তা নিয়ে পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে বিতর্ক বাড়তে থাকে। এই সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যেই ২০১৮ সালে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রক্ষেপণ তৈরি করেন বোয়ান সাভরিচ, টম প্যাটারসন (Tom Patterson) এবং বার্নহার্ড জেনি (Bernhard Jenny)। তাঁদের তৈরি পদ্ধতির মূল লক্ষ্য পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশের আপেক্ষিক আয়তনকে তুলনামূলক ভাবে সঠিক অনুপাতে তুলে ধরা। ফলে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মতো বিষুবরেখার কাছাকাছি থাকা অঞ্চলগুলিকে প্রচলিত মানচিত্রের তুলনায় ভিন্ন আকারে দেখা যায়।
নতুন মানচিত্রে আফ্রিকার বিশাল আয়তন আরও ভালভাবে বোঝা যায়। মহাদেশটি রাশিয়া (Russia)-র প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের। একই সঙ্গে আফ্রিকার বিস্তৃত ভূখণ্ডের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States), চিন (China), ভারত (India) এবং ইউরোপের বড় অংশকে বসানো সম্ভব, যা প্রচলিত মানচিত্র দেখলে সহজে উপলব্ধি করা যায় না। ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রক্ষেপণের অন্যতম নির্মাতা বোয়ান সাভরিচ জানিয়েছেন, তাঁদের পদ্ধতিতে মহাদেশগুলির আপেক্ষিক ক্ষেত্রফল বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘একটি গোলকের উপর পৃথিবীর যে আয়তনগত সম্পর্ক দেখা যায়, নতুন প্রক্ষেপণে সেটিকে যতটা সম্ভব বজায় রাখা হয়েছে।’ অর্থাৎ, নতুন মানচিত্রের লক্ষ্য কোনও দেশের প্রকৃত ভূখণ্ড বাড়ানো বা কমানো নয়; বরং কাগজের উপর তার আয়তনকে বাস্তবের কাছাকাছি দেখানো।
মানচিত্র বদলের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায় এসেছে। ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ (Correct the Map) নামে একটি প্রস্তাব রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় তোলা হয়। টোগোর (Togo) উদ্যোগে উত্থাপিত ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভারত-সহ বিপুল সংখ্যক দেশ ভোট দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ১৭১টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। কয়েকটি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। ওয়াশিংটনের আপত্তির কারণ নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য, পৃথিবীর মানচিত্রের প্রক্ষেপণ পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি করার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক শান্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ মানচিত্রে আয়তনের হিসাব সংশোধন করা গেলেও রাজনৈতিক সীমান্ত নিয়ে বহু পুরনো বিরোধ তাতে আপনা-আপনি মিটবে না।
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখের কারণে। নতুন মানচিত্রে ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ড কী ভাবে দেখানো হবে, তা নিয়ে নয়াদিল্লি বরাবরই সতর্ক। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল (Randhir Jaiswal) জানিয়েছেন, ভারত কোনও নির্দিষ্ট মানচিত্র প্রক্ষেপণকে সমর্থন বা বিরোধিতা করার অবস্থান নিচ্ছে না। তবে ভারতের সরকারি মানচিত্রে দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড যেভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা অনুসরণ করার বিষয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান অটুট। জয়সওয়ালের বক্তব্য, ‘জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ-সহ ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ড দেশের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী দেখাতে হবে।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ভারতের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে কোনও ভুল উপস্থাপনা মেনে নেওয়া হবে না।
জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখকে ঘিরে ভারত, পাকিস্তান ও চিনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ১৯৪৭-৪৮ সালের সংঘাতের পর কাশ্মীরের একটি অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্য দিকে ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পর লাদাখের বিস্তীর্ণ অংশ চিনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে এই অঞ্চলগুলির সীমারেখা ও অবস্থান নিয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক চলে আসছে। এখানেই ‘ইকুয়াল আর্থ’ নিয়ে মূল প্রশ্নটি উঠে আসছে। এই প্রক্ষেপণ পৃথিবীর ভূখণ্ডগুলির আয়তনকে বাস্তবের কাছাকাছি দেখানোর চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক সীমান্ত নির্ধারণ তার উদ্দেশ্য নয়। ফলে মানচিত্রে ভারত, চিন বা পাকিস্তানের সীমান্ত কীভাবে দেখানো হবে, সেটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট মানচিত্র নির্মাতা ও প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক-ভৌগোলিক তথ্যের উপর।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় কোনও প্রস্তাব গৃহীত হলেই বিশ্বের সমস্ত দেশকে একই মানচিত্র ব্যবহার করতে হয় না। বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেদের প্রশাসনিক, সামরিক, শিক্ষাগত এবং কূটনৈতিক প্রয়োজনে ভিন্ন প্রক্ষেপণ ব্যবহার করতে পারে। ফলে ‘ইকুয়াল আর্থ’ জনপ্রিয় হলেও মার্কেটর প্রোজেকশন একদিনে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে এই নতুন প্রক্ষেপণের গুরুত্ব যথেষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে মানচিত্র দেখে বিশ্বের দেশগুলির আয়তন সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। নতুন প্রক্ষেপণ সেই ভুল ধারণা কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন বোঝার ক্ষেত্রে এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রেও মানচিত্রের এই পরিবর্তন আকর্ষণীয়। প্রচলিত মানচিত্রে উত্তর গোলার্ধের তুলনায় দক্ষিণের দেশগুলি অনেক সময় ছোট বলে মনে হয়। নতুন প্রক্ষেপণে ভারতের প্রকৃত আয়তন ও অবস্থান তুলনামূলক ভাবে অন্য রকমভাবে চোখে পড়বে। তবে এটি ভারতের ভৌগোলিক আয়তন বাড়িয়ে দিচ্ছে না। বদলাচ্ছে কেবল পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতলে দেখানোর পদ্ধতি।
তাই ‘নতুন মানচিত্রে ভারত বড় হচ্ছে’ এই কথাটির অর্থ বাস্তবে ভারতের ভূখণ্ড বাড়ছে না। একই ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা গ্রিনল্যান্ডের জমিও কমে যাচ্ছে না। বদল হচ্ছে মানচিত্রের পর্দায় তাদের আপেক্ষিক আকারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনই পৃথিবীর দেশগুলির ভৌগোলিক ধারণা এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে। ফলে আগামী দিনে ‘ইকুয়াল আর্থ’ কতটা আন্তর্জাতিক ভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থা এটি ব্যবহার করে এবং সীমান্ত বিতর্কের ক্ষেত্রে দেশগুলি কী অবস্থান নেয়, তার উপরই নির্ভর করবে নতুন মানচিত্রের ভবিষ্যৎ। পৃথিবীর আয়তন একই থাকবে, কিন্তু তাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে পারে অনেকটাই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi on foreign travel | বিদেশ ভ্রমণ থেকে সোনা কেনা অভ্যাস বদলের ডাক নরেন্দ্র মোদীর, দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে দেশেই খরচের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর



