কৌশিক রায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) ফের সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব। মঙ্গলবার নিজের অফিসিয়াল X হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে তিনি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পোস্ট সরাসরি রাজ্য প্রশাসন এবং তৃণমূল সরকারের উপর তোপ দেগে তৈরি করেছে নতুন বিতর্কের আবহ। শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যের জেরে SIR -এর কাজ এবং মৃত ভোটারদের নাম মুছে ফেলা নিয়ে প্রশ্ন ঘনীভূত হচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।
শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, SIR (Special Summary Revision) প্রক্রিয়া শুরু হতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সরকার নাকি নড়েচড়ে বসেছে। তাঁর কথায়, মৃত ভোটারদের নাম না কাটার নির্দেশ দিয়ে সরকার নাকি ভোট জালিয়াতির পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। পোস্টে শুভেন্দু অধিকারী লেখেন, “এসআইআর-এর ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। তাই তাঁর প্রশাসনকে দিয়ে মৃত ভোটারদের নাম যাতে কাটা না যায়, আর ভোটের সময় তাঁর শান্তির বাহিনী দিয়ে সেই ভোটগুলি ছাপ্পা মেরে জেতার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু সে গুড়ে বালি।” এই মন্তব্য ঘিরেই জোরদার চর্চা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলনেতা শুধু অভিযোগেই থেমে থাকেননি। তিনি তাঁর পোস্টে যুক্ত করেছেন একটি অডিও ক্লিপের কথাও, যা ইতিমধ্যেই ভাইরাল। শুভেন্দুর দাবি, এই ভয়েস ক্লিপটি ফলতা এলাকার এক BLO -এর। সেই BLO নাকি স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন, ফলতার BDO এবং ARO তাদের ফোন করে নির্দেশ দিয়েছেন যে ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া কোনও মৃত ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটতে পারবেন না। অথচ মৃত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে এনুমারেশন ফর্মে ডিক্লিয়ারের সঙ্গে স্বাক্ষর জমা করা ছিল। অভিযোগ আরও, সেই ফর্ম পর্যন্ত আপলোড করতে দেওয়া হচ্ছে না।
শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, BLO -দের বলা হয়েছে মৃতদের ঘোষণাপত্র আপলোড না করে ‘আনম্যাপিং’ করে ফেলে দিতে। অর্থাৎ পরে প্রয়োজন হলে ফের তালিকায় নাম রেখে ‘জচ্চুরী’ বা জাল ভোট করানো যায় কি না, সেই সুযোগ রেখে দেওয়া। তাঁর কথায়, “এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। প্রশাসন পুরো বিষয়টাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। জনগণকে ভুল পথে দিচ্ছে।” এতেই শেষ নয়। শুভেন্দুর দাবি, ফলতা সহ বিভিন্ন এলাকায় ‘জাহাঙ্গীর বাহিনী’ নামে পরিচিত তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ দুষ্কৃতীদের নাকি বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে BLO -দের ভয় দেখানো হচ্ছে যাতে তারা মৃত ভোটারদের পরিবারের কাছ থেকে কোনও ডেথ সার্টিফিকেট নিতে না পারেন। অর্থাৎ মৃত হলেও নাম যেন তালিকা থেকে বাদ না যায়। বিরোধী দলনেতার দাবি, “খেলাটা খুব পরিষ্কার। BDO আর ARO–দের ব্যবহার করে, গুন্ডাবাহিনী দিয়ে ধমক-চমক দেখিয়ে মৃত ভোটারদের ভোটার তালিকায় রেখে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
শুভেন্দু অধিকারী সাধারণ BLO -দের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়ে বলেছেন, ভীত না হয়ে আইন অনুযায়ী কাজ করতে। তিনি লিখেছেন, “আমি সাধারণ মানুষ এবং BLO দের বলব আপনারা ভয় পাবেন না। আইনের আওতায় থেকে সকলে SIR -এর কাজে কমিশনকে সাহায্য করুন। BJP গোটা বিষয়টির উপর নজর রাখছে।” একই সঙ্গে তিনি রাজ্যের প্রশাসনিক আধিকারিকদেরও সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “তৃণমূলের দলদাস BDO এবং ARO দের বলব সাবধান হন। নচেৎ এর ফল আপনাদের ভুগতে হবে। আমরা কিন্তু ছেড়ে কথা বলব না।”
এছাড়াও বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচন কমিশনের কাছে হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন জানান। তাঁর দাবি, এই অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে কমিশন যেন দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিরোধী শিবিরের মতে, এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা রাজ্যের ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর সঙ্কট তৈরি করতে পারে। তবে তৃণমূল শিবির এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই বিষয়টি রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়াবে। উল্লেখ্য যে, শুভেন্দু অধিকারীর পোস্ট প্রকাশের পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো ঝড় উঠেছে। কেউ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আবার কেউ বিরোধী দলনেতার বক্তব্যকে রাজনৈতিক কৌশল বলেও দাবি করেছেন। যদিও অডিও ক্লিপের সত্যতা এখনও সরকারিভাবে যাচাই হয়নি। তবে মানুষের মনোযোগ যে তীব্রভাবে এই ইস্যুটির দিকে ধাবিত হয়েছে, তা স্পষ্ট।
বিরোধী দল দাবি করছে, এটি কেবল একটি ঘটনার উদাহরণ। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের অভিযোগ আসছে। সরকারের উপর আস্থা হারানোর ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। অন্যদিকে শাসক শিবিরের দাবি, বিরোধীরা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রশাসনের কাজকে কালিমালিপ্ত করতে চাইছে। যাই হোক, মৃত ভোটারদের নাম রিভিশন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ নতুন করে রাজনৈতিক সংহতি ও উত্তাপ তৈরি করেছে। নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রাজ্যবাসী।
ছবি : সংগৃহীত



