সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে বড় সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্র। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের (Rajnath Singh) নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ বা ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল (Defence Acquisition Council) প্রায় ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ সরঞ্জাম ভারতীয় শিল্পের কাছ থেকেই সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা, সামরিক আধুনিকীকরণ ও আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য, তিন ক্ষেত্রেই এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে ডিএসি (DAC) বিভিন্ন বাহিনীর জন্য একাধিক মূলধনী ক্রয় প্রস্তাবে ‘অ্যাকসেপ্ট্যান্স অব নেসেসিটি’ বা প্রয়োজনীয়তার প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। এই পর্যায়ের অনুমোদন সরাসরি চুক্তি স্বাক্ষরের সমান নয়, বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করে। প্রায় ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার এই প্রস্তাবের মধ্যে স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বায়ুসেনার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য অনুমোদিত তালিকায় রয়েছে কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল, রেডিয়োলজিক্যাল অ্যান্ড নিউক্লিয়ার বা CBRN রিকনাইস্যান্স ভেহিকল। রাসায়নিক, জৈবিক, তেজস্ক্রিয় এবং পারমাণবিক উপাদানের কারণে কোনও এলাকা দূষিত হলে সেই দূষণের অবস্থান শনাক্ত, চিহ্নিত, পর্যবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট করে দেওয়ার কাজে এই যান ব্যবহার করা যাবে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বা বিপজ্জনক দূষণের পরিস্থিতিতে সেনাদের নিরাপত্তা ও অভিযানের সক্ষমতার জন্য এমন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও সেনাবাহিনীর জন্য হাই মোবিলিটি ভেহিকল বা HMV কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু করে দুর্গম ও কঠিন ভূখণ্ডে সেনাদের চলাচল, রসদ পৌঁছে দেওয়া এবং সামরিক যানবাহনের গতিশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই যান ব্যবহার করা হবে। দেশের সীমান্তবর্তী বহু এলাকায় ভৌগোলিক পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় দ্রুত সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের ক্ষমতা বাড়ানো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
মাইন লেয়িংয়ের জন্য সেল্ফ-প্রপেলড মেকানিক্যাল মাইন লেয়ার বা MML-ও এই অনুমোদনের আওতায় এসেছে। কঠিন ভূখণ্ডে দ্রুত ও প্রয়োজন অনুযায়ী মাইন বসানোর সক্ষমতা বাড়ানোই এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের অগ্রসর হওয়ার পথ তৈরিতে ট্রল ট্যাঙ্ক এবং সার্বত্র ব্রিজ সিস্টেমেরও প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ভূখণ্ডে যুদ্ধরত বাহিনীকে বাধা পার করানো এবং দ্রুত পারাপারের ব্যবস্থা তৈরিতে এই সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার বা ALH -এর জন্যও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ভূখণ্ড এবং অপারেশনাল পরিস্থিতিতে জটিল মিশন পরিচালনার জন্য এই হেলিকপ্টার ব্যবহার করা যায়। পাহাড়ি বা দুর্গম এলাকায় সেনা মোতায়েন, দ্রুত চলাচল এবং প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে হেলিকপ্টারভিত্তিক সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিএসির অনুমোদনে ALH-এর ব্যবহার ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বায়ুসেনা দুই বাহিনীর প্রয়োজনের সঙ্গেই যুক্ত। নৌবাহিনীর ক্ষেত্রেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন। নৌবাহিনীর জন্য অরুধ্র রাডার এবং মেরিন গ্যাস টারবাইন সংগ্রহের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। অরুধ্র রাডার বিভিন্ন নৌবাহিনী বিমানঘাঁটিতে ব্যবহৃত পুরনো এয়ার রুট সার্ভেইল্যান্স রাডারের পরিবর্তে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অন্য দিকে, মেরিন গ্যাস টারবাইন যুদ্ধজাহাজের প্রপালশন বা চালনা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। দেশীয় ভাবে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সংগ্রহের ফলে বিদেশি সরবরাহকারীদের উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
বায়ুসেনার ক্ষেত্রেও একাধিক ব্যবস্থা অনুমোদন পেয়েছে। যুদ্ধবিমান, পরিবহণ বিমান এবং হেলিকপ্টারের যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রস্তাবের পাশাপাশি গ্রাউন্ড-বেসড মাল্টিপারপাস জ্যামার সংগ্রহের অনুমোদন রয়েছে। এই ব্যবস্থা প্রতিপক্ষের রাডারকে কার্যকর ভাবে জ্যাম করার কাজে ব্যবহার করা যাবে। আধুনিক যুদ্ধে ইলেকট্রনিক যুদ্ধক্ষমতার গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। তাই বায়ুসেনার সামগ্রিক যুদ্ধক্ষমতার সঙ্গে এই প্রযুক্তির সংযোজনও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়াও ডিফেন্স ফোর্সেস সিকিওর অ্যাকসেস কার্ড বা DEFSAC ব্যবস্থার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমান কাগজভিত্তিক পরিচয়পত্র, পাস ও পারমিট ব্যবস্থার পরিবর্তে রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন বা RFID-ভিত্তিক স্মার্ট কার্ড চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এর ফলে সশস্ত্র বাহিনীর নিরাপদ প্রবেশাধিকার ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করা সম্ভব হবে।
কিন্তু, এই পুরো সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল দেশীয় শিল্পের অংশগ্রহণ। ডিএসির অনুমোদিত মোট প্রস্তাবের প্রায় ৯৮ শতাংশ সংগ্রহ ভারতীয় শিল্পের কাছ থেকে করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বিপুল অঙ্কের এই প্রতিরক্ষা ব্যয়ের একটি বড় অংশ দেশের সংস্থা, উৎপাদক এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের বিভিন্ন অংশের কাছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। এর ফলে শুধু অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনই নয়, দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত গবেষণা, নকশা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উৎপাদন পরিকাঠামোর উপরও প্রভাব পড়তে পারে। বড় প্রতিরক্ষা সংস্থার পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি সংস্থা এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগগুলির জন্যও সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন বাড়লে বিদেশ থেকে সরঞ্জাম সংগ্রহের উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যও এগিয়ে যাবে।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনের উপর জোর দেওয়ার নীতি গত কয়েক বছর ধরেই কেন্দ্রের অন্যতম অগ্রাধিকার। ডিএসি-র সাম্প্রতিক একাধিক সিদ্ধান্তেও ভারতীয় শিল্পের কাছ থেকে সংগ্রহের ভাগ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা গিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসেও প্রায় ১.০৫ লক্ষ কোটি টাকার ১০টি মূলধনী প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং সেগুলির ক্ষেত্রে দেশীয় উৎসের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। এর আগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিএসি প্রায় ৩.৬০ লক্ষ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রস্তাবে প্রয়োজনীয়তার প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছিল। সেই বৈঠকেও সেনা, নৌবাহিনী ও বায়ুসেনার আধুনিকীকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। মার্চ ২০২৬-এ আরও প্রায় ২.৩৮ লক্ষ কোটি টাকার প্রস্তাব অনুমোদনের কথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছিল। ফলে সেপ্টেম্বরের এই প্রায় ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার অনুমোদনকে বিচ্ছিন্ন কোনও সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার বদলে সামরিক আধুনিকীকরণ এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এক দিকে সেনাবাহিনীর দুর্গম এলাকায় চলাচল, মাইন সংক্রান্ত সক্ষমতা, CBRN পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং নদী বা অন্যান্য বাধা পার হওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর সরঞ্জাম আসছে। অন্য দিকে নৌবাহিনী ও বায়ুসেনার জন্য রাডার, প্রপালশন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং নিরাপদ প্রবেশাধিকার ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তিও যুক্ত হচ্ছে।
রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ডিএসির এই সিদ্ধান্তে তাই একই সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতি ও দেশীয় শিল্প দুই দিকই গুরুত্ব পেয়েছে। প্রায় ৯৮ শতাংশ সরঞ্জাম ভারতীয় শিল্প থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা কার্যকর হলে বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা ব্যয় দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যেই ঘুরবে। ভারতীয় সংস্থাগুলির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বাজার এবং রফতানি সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয়, অনুমোদিত সরঞ্জামগুলির একটি বড় অংশ সরাসরি মাঠপর্যায়ে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর কার্যক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। CBRN রিকনাইস্যান্স ভেহিকল থেকে হাই মোবিলিটি ভেহিকল, মাইন লেয়ার, ALH, ট্রল ট্যাঙ্ক, সার্বত্র ব্রিজ, নৌবাহিনীর রাডার এবং মেরিন গ্যাস টারবাইন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আধুনিক যুদ্ধের প্রয়োজন মাথায় রাখা হয়েছে। ফলে ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার এই প্রতিরক্ষা অনুমোদন ভারতের সামরিক আধুনিকীকরণের পাশাপাশি দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rajnath Singh DRDO missile technology transfer | রাজনাথের বড় সিদ্ধান্ত, ভারতীয় সংস্থার হাতে DRDO-র ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি



