সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : অনলাইন কেনাকাটার সুবিধা এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ (COD বা Cash on Delivery) পদ্ধতি অনেকের কাছেই ভরসার জায়গা। কিন্তু সেই ভরসাকেই হাতিয়ার করে নতুন ধরনের প্রতারণার জাল ছড়িয়েছে কলকাতায় (Kolkata)। লালবাজার (Lalbazar) সূত্রে খবর, অর্ডার করা পণ্য হাতে পাওয়ার আগেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বহু ক্রেতা। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে ১৭ জনকে, যাঁদের মধ্যে ন’জন মহিলা রয়েছেন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্র অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে কাজ করছিল। ডিজিটাল তথ্য চুরি করে তারা প্রথমে চিহ্নিত করত কোন কোন ক্রেতা অনলাইনে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ অপশন বেছে নিয়ে পণ্য অর্ডার করেছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হত। এক পুলিশ আধিকারিক জানান, ‘গ্রাহকের অর্ডারের তথ্য জেনে নিয়ে নিজেদের ডেলিভারি সংস্থার কর্মী পরিচয় দিত প্রতারকেরা।’
এরপর শুরু হত মূল ফাঁদ। ক্রেতাদের ফোন করে বিভিন্ন অজুহাত দেওয়া হত, কখনও বলা হত ডেলিভারির আগে ‘প্রসেসিং চার্জ’ দিতে হবে, কখনও আবার ‘সিস্টেম আপডেট’ বা ‘লোকেশন কনফার্মেশন’-এর নাম করে টাকা চাওয়া হত। তবে নগদ নয়, কিউআর কোড (QR Code) স্ক্যান করে বা নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হত। অনেকেই এই ফাঁদে পা দিয়ে পণ্য পাওয়ার আগেই টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন। লালবাজারের সাইবার শাখা সূত্রে খবর, যাঁরা আগে টাকা পাঠিয়েছেন, তাঁদের কাছে আর কোনও পণ্য পৌঁছয়নি। পরে যখন আসল ডেলিভারি এজেন্ট পণ্য নিয়ে পৌঁছেছেন, তখনই গোটা বিষয়টি সামনে এসেছে। এক ভুক্তভোগীর কথায়, ‘ফোনে যিনি কথা বলেছিলেন, তাঁকে ডেলিভারি বয় ভেবেই টাকা দিয়েছিলাম। পরে বুঝলাম, সেটি সম্পূর্ণ প্রতারণা।’
এই অভিযোগগুলির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে সাইবার পুলিশ। দীর্ঘ নজরদারি এবং তথ্য বিশ্লেষণের পর গড়িয়াহাট (Gariahat) এলাকায় একটি কল সেন্টারের সন্ধান মেলে। সেখানেই হানা দিয়ে ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ৪৩টি মোবাইল ফোন, একাধিক সিম কার্ড, ল্যাপটপ এবং ওয়ারলেস ফোন। পুলিশ মনে করছে, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে একই পদ্ধতিতে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও তথ্য জোগাড়ের চেষ্টা চলছে। এই চক্রের সঙ্গে অন্য কোনও রাজ্য বা বড় নেটওয়ার্ক যুক্ত আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের ধারণা, ডিজিটাল তথ্য ফাঁসের মাধ্যমেই এই ধরনের প্রতারণা আরও বাড়তে পারে, যদি সময়মতো সতর্ক না হওয়া যায়। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ। একজন কর্তার কথায়, ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি অর্ডারের ক্ষেত্রে পণ্য হাতে পাওয়ার আগে অনলাইনে কোনও টাকা দেওয়া উচিত নয়।’ অর্থাৎ, ডেলিভারি এজেন্টের কাছ থেকে পণ্য গ্রহণ করার পরেই নগদে মূল্য পরিশোধ করাই নিরাপদ পদ্ধতি। পুলিশ আরও জানিয়েছে, কোনও অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে এবং ডেলিভারির নামে টাকা চাইলে তা যাচাই না করে কোনওভাবেই লেনদেন করা উচিত নয়। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ই-কমার্স সংস্থার অফিসিয়াল কাস্টমার কেয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। পাশাপাশি, কিউআর কোড স্ক্যান করার আগে তার উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়ছে, ততই প্রতারণার কৌশলও বদলাচ্ছে। এই ঘটনার পর শহরবাসীর মধ্যে নতুন করে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। অনলাইনে কেনাকাটার সুবিধা যেমন রয়েছে, তেমনই সচেতন না হলে ঝুঁকিও কম নয়। তাই নিরাপদ লেনদেনের নিয়ম মেনে চলাই এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে। কলকাতা পুলিশের এই অভিযানে বড় চক্র ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তদন্ত চলবে এবং আরও গ্রেফতারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আপাতত ক্রেতাদের সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা এড়ানো যায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi Sanand Speech | সাণন্দে সেমিকন্ডাক্টর যুগের সূচনা: ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ থেকে বৈশ্বিক বাজারে ভারতের শক্ত অবস্থান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বড় বার্তা



