সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দুর্গাপুজোর আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয়েছিল ভয়াবহ বিপর্যয়ে। প্রতিমা দর্শনের জন্য ভিড় জমিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। কারও সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্য, কেউ এসেছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। কিন্তু চোরবাগান (Chorbagan) সর্বজনীনের দুর্গাপুজো মণ্ডপে সেই সন্ধ্যার হুড়োহুড়ি কেড়ে নিল ১৯টি প্রাণ। পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় মৃতদের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে মৃত্যুর ভয়াবহ বিবরণ। কারও পাঁজরের হাড় ভেঙে গিয়েছে, ফেটে গিয়েছে ফুসফুস। কারও মৃত্যু হয়েছে ভিড়ের চাপে শ্বাস নিতে না পেরে। আবার কয়েক জনের মাথায় গুরুতর আঘাত ও মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণের কারণে প্রাণ গিয়েছে বলে উল্লেখ। দুর্গাপুজোর প্রথম সপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগান এলাকায় ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘিরে শোকের ছায়া নেমে আসে। এবার দুর্গাপুজোয় সপ্তমী দু’দিন হওয়ায় দ্বিতীয় সপ্তমীর দিন, রবিবার, দুর্ঘটনায় মৃত ১৯ জনের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট সামনে আসে। ওই রিপোর্টে মৃত্যুর বিভিন্ন কারণের উল্লেখ রয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সাত জনের পাঁজরের হাড় ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি ফুসফুস ফেটে গিয়েছিল। ভিড়ের প্রবল চাপে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলে উল্লেখ।
প্রতিমা দর্শনের সময় মণ্ডপে ভিড় বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। হুড়োহুড়ির মধ্যে একের পর এক দর্শনার্থী মাটিতে পড়ে যান। তাঁদের পিছনে থাকা লোকজনও ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। মাটিতে পড়ে থাকা কয়েক জনের উপর অন্য দর্শনার্থীরা পড়ে যান। ফলে অনেকেই উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ পাননি। বুকের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েক জনের ক্ষেত্রে এই চাপ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মৃতদের মৃত্যুর কারণ মূলত তিনটি ভাগে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, মাথায় গুরুতর আঘাত ও মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণ। দ্বিতীয়ত, বুকের উপর প্রচণ্ড চাপের কারণে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া। তৃতীয়ত, পাঁজরের হাড় ভেঙে ফুসফুসের ক্ষতি হওয়া। দুর্ঘটনার সময় ভিড়ের চাপে শরীরের উপর যে বিপুল বল প্রয়োগ হয়েছিল, মৃত্যুর কারণগুলির মধ্যে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
এই ঘটনায় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে মৃতদের ময়নাতদন্ত করা হয় বলে সূত্রের খবর। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের পুলিশ মর্গে ১৭ জনের দেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। একটি দেহের ময়নাতদন্ত করা হয় আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে ও অন্য একটি দেহের ময়নাতদন্ত হয় এনআরএস মেডিক্যাল কলেজে। তিন হাসপাতালের রিপোর্ট মিলিয়ে মৃতদের শরীরে একাধিক ধরনের গুরুতর আঘাতের তথ্য উঠে এসেছে। সূত্রের খবর, মৃতদের মধ্যে কয়েক জনের মাথায় গুরুতর চোট ছিল। মাথায় আঘাতের কারণে মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণ হওয়ায় তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক ময়নাতদন্তের তথ্য থেকে উল্লেখ। ভিড়ের মধ্যে পড়ে যাওয়ার পর মাথা মাটিতে বা অন্য কোনও শক্ত বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খেলে এমন আঘাত লাগতে পারে। তবে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ঠিক কীভাবে আঘাত লেগেছিল, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট ও অন্যান্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনায় শিশু ও নাবালকদের মৃত্যুর ঘটনাও বিশেষভাবে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্টে কয়েক জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘ট্রমাটিক অ্যাসফিক্সিয়া’ (Traumatic Asphyxia) -এর উল্লেখ রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায়, শরীরের বুকের অংশে অত্যধিক চাপ পড়ে শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হলে এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ভিড়ের মধ্যে একাধিক মানুষের শরীরের চাপ কোনও ব্যক্তির বুকের উপর পড়লে ফুসফুস স্বাভাবিক ভাবে প্রসারিত হতে পারে না। ফলে শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছনোর প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে এই অবস্থাই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরও পড়ুন : Durga Puja : মহালয়া থেকে নবদুর্গার তাত্ত্বিক রূপ এবং মহাআরাধনার বিধান
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কয়েক জনের কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। শরীরে গুরুতর আঘাত, রক্তসঞ্চালনে সমস্যা ও অক্সিজেনের অভাবের মতো পরিস্থিতিতে বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। তবে কিডনির ক্ষতির সঙ্গে মৃত্যুর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কতটা, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা-তথ্য ও পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রয়োজন বলে সূত্রের খবর। পুজোর মরসুমে কলকাতার বিভিন্ন মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ঢল নামে। বিশেষ করে জনপ্রিয় পুজোগুলিতে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষের জমায়েত হলে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে প্রবেশ ও বেরোনোর পথ, ভিড়ের গতিপথ ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চোরবাগানের এই দুর্ঘটনা সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা সাধারণত কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সামনের দিকে চলাচল বন্ধ হয়ে গেলেও পিছন থেকে মানুষের চাপ বাড়তে থাকলে মাঝখানে আটকে পড়া ব্যক্তিদের পক্ষে শ্বাস নেওয়া বা শরীর নাড়ানো কঠিন হয়ে যায়। কেউ পড়ে গেলে তাঁর উপর অন্যরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত ভিড়ের চাপ কমানো, বিকল্প পথ খুলে দেওয়া ও আহতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। চোরবাগানের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নয়, বহু পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। প্রতিমা দর্শনের আনন্দ নিয়ে যাঁরা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আর ফিরে যেতে পারেননি। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে আসা পাঁজরের হাড় ভাঙা, ফুসফুস ফেটে যাওয়া, মাথায় আঘাত এবং শ্বাসরোধের বিবরণ দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আরও সামনে এনেছে। কিন্তু প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তৈরি হলেও, প্রতিটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা-রিপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ। কী পরিস্থিতিতে মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, দর্শনার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল ও জরুরি পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ করা হয়েছিল, সেই প্রশ্নগুলির উত্তরও দুর্ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র বুঝতে সাহায্য করবে।
কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনা উৎসবের ভিড়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে ফের সামনে এনেছে। প্রতিমা দর্শনের সময় মানুষের নিরাপদ চলাচল, ভিড়ের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত উদ্ধারকাজের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তার উপরই নির্ভর করে এমন বিপর্যয় এড়ানোর সম্ভাবনা। ১৯ জনের মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে আসা তথ্য সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিল।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : R Sreelekha, Kerala Politics | ডিজিপি থেকে গেরুয়া রাজনীতির শীর্ষে: চার দশকের বামদুর্গ ভেঙে তিরুবন্তপুরমের মেয়র দৌড়ে আর শ্রীলেখা




