Sasraya News Sunday’s Literature Special | 18th October 2026, Issue 131, Sunday | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ৪ অক্টোবর ২০২৬, সংখ্যা ১২৯ | রবিবার

SHARE:

সম্পাদকীয়

উৎসবের আলোয় আমরা নিজেদের সমাজকে দেখতে পারি তার সৃজনশীলতা, অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সামাজিক বৈষম্য এবং নৈতিক দ্বন্দ্বসহ। সাহিত্য মানুষের আনন্দকে অস্বীকার করে না, আবার আনন্দের আড়ালে থাকা অস্বস্তিকর সত্যকেও আড়াল করে না। পুজোর মণ্ডপে যেমন শিল্পের সৌন্দর্য আছে, তেমনই মণ্ডপের বাইরে জীবিকার সংগ্রাম রয়েছে; প্রতিমার সামনে যেমন ভক্তির আবেগ আছে, তেমনই বাস্তব জীবনে ন্যায় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কঠিন দায়িত্ব রয়েছে।

দুর্গাপুজো: উৎসব আলোয় সময়ের মুখ

শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোল, বাতাসে শিউলির গন্ধ আর অপেক্ষার দিন গোনা দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে নিছক একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এ যেন তার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকা চিরন্তন আবেগ। সারা বছরের ক্লান্তি, দুঃখ, অভাব, অভিমান ও ব্যস্ততার মধ্যে দুর্গাপুজো এনে দেয় নতুন করে বাঁচার প্রেরণা। দেবী দুর্গার আগমনে শুধু মণ্ডপ আলোকিত হয় না, আলো জ্বলে মানুষের মনের গভীরেও। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসবের চরিত্রও বদলাচ্ছে। তাই আজ দুর্গাপুজোর আনন্দের পাশাপাশি তার সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক তাৎপর্য নিয়েও ভাবার অবকাশ রয়েছে।

একসময় দুর্গাপুজো ছিল মূলত পারিবারিক ও বারোয়ারি মিলনের উৎসব। বনেদি বাড়ির পুজো, পাড়ার মণ্ডপ, ঢাকের বাদ্যি, প্রতিমার সামনে অঞ্জলি, সন্ধ্যার আরতি, আত্মীয়স্বজনের সমাগম এসব নিয়ে গড়ে উঠত এক আন্তরিক সামাজিক পরিসর। সময়ের সঙ্গে সেই পরিসর বিস্তৃত হয়েছে। আজ দুর্গাপুজো বৃহৎ শিল্প-আয়োজন, সৃজনশীল প্রতিযোগিতা, পর্যটন, বিপণন এবং বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্যের অভিনবত্ব, প্রতিমা নির্মাণে শিল্পীর কল্পনা, আলোকসজ্জায় প্রযুক্তির ব্যবহার—সবই উৎসবকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বাংলার শিল্পী, কারিগর, আলোকশিল্পী, ঢাকি, মৃৎশিল্পী, পোশাক ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র বিক্রেতা এবং অসংখ্য অস্থায়ী শ্রমিকের জীবিকার সঙ্গে এই উৎসব গভীরভাবে যুক্ত।

Barisha Club Durga Puja 2026 Kaalrekha theme inspired by ancient Indian pillar architecture
বড়িশা ক্লাবের এবারের মাতৃপ্রতিমা। ছবি: সংগৃহীত

এই অর্থনৈতিক গুরুত্বকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। দুর্গাপুজো বহু মানুষের সারা বছরের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। উৎসবের বাজারে কেনাকাটা বাড়ে, পরিবহণ ও খাদ্যব্যবসায় গতি আসে, পর্যটনের প্রসার ঘটে। কিন্তু এই বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই একটি প্রশ্ন থেকে যায়, উৎসবের জৌলুসের আড়ালে যাঁদের শ্রমে এই আনন্দের আয়োজন, তাঁদের জীবনে কতটা নিরাপত্তা ও সম্মান পৌঁছয়? যে শিল্পীর হাতের কাজে মণ্ডপ অনন্য হয়ে ওঠে, যে শ্রমিক দিনের পর দিন পরিশ্রম করে উৎসবের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করেন, তাঁদের পারিশ্রমিক, কাজের পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। উৎসবের প্রকৃত সাফল্য শুধু তার বাহ্যিক আয়তনে নয়, তার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি এসেছে, তার মধ্যেও নিহিত।

বর্তমান সময়ের দুর্গাপুজোকে বুঝতে গেলে রাজনীতির উপস্থিতিকেও উপেক্ষা করা যায় না। বাংলার সামাজিক জীবনে দুর্গাপুজো এমন এক আবেগের কেন্দ্র, যার সঙ্গে মানুষের পরিচয়, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গর্ব জড়িয়ে আছে। ফলে রাজনৈতিক দল ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে এই উৎসব জনসংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। পুজোর উদ্বোধন, মণ্ডপ পরিদর্শন, অনুদান, প্রচার এবং উৎসবকে ঘিরে নানা কর্মসূচী ইত্যাদি সবই আজকের জনজীবনের পরিচিত দৃশ্য। জনসাধারণের উৎসবে জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ রাজনৈতিক কৃতিত্বের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়, অথবা উৎসবের সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে দলীয় প্রতিযোগিতার মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দুর্গাপুজো কোনও একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শের একচেটিয়া পরিচয়ও নয়। এটি বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ, যেখানে নানা ধর্ম, ভাষা, শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের মানুষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্ত। এই উৎসবের প্রাণশক্তি তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রে। তাই পুজোর মঞ্চ থেকে যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধার বদলে বিভাজনের বার্তা ছড়ায়, যদি সাংস্কৃতিক গৌরবের নামে অন্যের পরিচয়কে ছোট করা হয়, কিন্তু উৎসবের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যই ক্ষুণ্ণ হয়। রাজনীতি আসবে, যাবে, ক্ষমতার সমীকরণ বদলাবে; কিন্তু বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কোনও সাময়িক রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্কীর্ণ পরিসরে বন্দী  করা উচিত নয়।

এইসময় দুর্গাপুজোর আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য তার বাণিজ্যিক বিস্তার। নতুন পোশাক, রেস্তোরাঁ, বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ডের প্রচার, সামাজিক মাধ্যমে ছবি প্রকাশ এবং মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় মিলিয়ে উৎসবের একটি ভোগকেন্দ্রিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে আপত্তির কিছু নেই; অর্থনীতি চলবে, ব্যবসা বাড়বে, মানুষ আনন্দের জন্য খরচ করবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আনন্দের সংজ্ঞা কি ক্রমশ কেনাকাটা ও প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে? কত দামি পোশাক পরলাম, কতগুলি মণ্ডপ দেখলাম, কোথায় ছবি তুললাম, এসবের বাইরে পুজোর অনুভব কী আমাদের জীবনে যথেষ্ট জায়গা পাচ্ছে? যে উৎসব মানুষকে কাছাকাছি আনার কথা, সেই উৎসবেই যদি সামাজিক বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তবে আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। কারও পুজো কাটে বিলাসবহুল কেনাকাটা ও রেস্তোরাঁয়, আবার কারও কাছে নতুন পোশাক কেনাও কঠিন। এই ব্যবধান সমাজের বাস্তবতা। উৎসবের আনন্দকে সবার নাগালের মধ্যে আনার চেষ্টা তাই কেবল দয়া বা দান নয়, সামাজিক দায়িত্বেরও অংশ। পাড়ার পুজোয় অসচ্ছল পরিবারের শিশুদের নতুন পোশাক, প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো, একাকী মানুষের খোঁজ নেওয়া কিংবা স্থানীয় শিল্পীদের কাজের যথাযথ মূল্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসব আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।

দুর্গাপুজোর কেন্দ্রে রয়েছেন দেবী দুর্গা, শক্তির প্রতীক। অশুভের বিরুদ্ধে শুভের সংগ্রামের প্রতীক। এই প্রতীকী তাৎপর্যকে যদি আমরা কেবল প্রতিমার সামনে প্রণামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তবে তার সামাজিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের প্রশ্নে আমাদের সমাজ এখনও বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দেবীকে শক্তিরূপে আরাধনা করা হয়, অথচ বাস্তব জীবনে নারীর প্রতি অসম্মান, নির্যাতন, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা যায়, এই বৈপরীত্য আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে। নারীর প্রতি সম্মান শুধু উৎসবের ভাষণে বা প্রতিমার বন্দনায় প্রকাশ পেলে চলবে না; তা প্রতিফলিত হতে হবে পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং জনপরিসরে। দেবীর আরাধনার যথার্থতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন জীবন্ত নারীর মর্যাদাও সমান গুরুত্ব পাবে। একইভাবে, অসুরবধের পৌরাণিক দিককে আজকের সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে। অন্যায়, দুর্নীতি, হিংসা, লোভ, অসহিষ্ণুতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার, এগুলিও আমাদের সময়ের অশুভ শক্তি। প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিনাশ কামনা করা সহজ; কিন্তু নিজের জীবনে অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করা অনেক কঠিন। অন্যের দুর্নীতির নিন্দা করে নিজের সুবিধার জন্য অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া, হিংসার বিরোধিতা করে ভিন্নমতের মানুষকে অপমান করা কিংবা ন্যায়ের কথা বলে দুর্বলের অধিকার উপেক্ষা করা এসব প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে না পারলে দেবী আরাধনার নৈতিক শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। পরিবেশের প্রশ্নটিও এখনকার  দুর্গাপুজোর আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বড় মণ্ডপ, বিপুল আলোকসজ্জা, শব্দের তীব্রতা, একবার ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীর বর্জ্য ও বিসর্জন-পরবর্তী দূষণ উৎসবের আয়োজনের সঙ্গে পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হচ্ছে। আনন্দের অধিকার যেমন মানুষের রয়েছে, তেমনই অন্য মানুষের শান্তি, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তির স্বস্তি এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্বও আমাদের রয়েছে। পরিবেশবান্ধব উপকরণ, নিয়ন্ত্রিত শব্দ, বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহার ও বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা কোনওভাবেই উৎসবের সৌন্দর্য কমায় না; বরং তাকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। প্রকৃতির কোলে শরতের যে উৎসবের জন্ম, সেই উৎসব প্রকৃতির ক্ষতির কারণ হতে পারে না।

দুর্গাপুজোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক প্রকাশ। প্রতিমাশিল্প, মণ্ডপনির্মাণ, লোকশিল্প, সঙ্গীত, নাটক, আলোকচিত্র এবং সাহিত্য এসব ক্ষেত্রেই এই উৎসব নতুন সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু সৃজনশীলতার মূল্যায়ন যদি কেবল পুরস্কার, জনপ্রিয়তা ও প্রচারের নিরিখে হয়, তবে শিল্পের নিজস্ব স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একটি ছোট পুজোর আন্তরিকতা, একটি মৃৎশিল্পীর নিপুণতা কিংবা একটি সাধারণ মণ্ডপের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অনেক সময় বিপুল আয়োজনের চেয়েও গভীর হতে পারে। উৎসবের বিচার তাই শুধু আকার, ব্যয় ও ভিড়ের পরিমাপে হওয়া উচিত নয়; সেখানে কল্পনা, শিল্পমান, পরিবেশসচেতনতা ও সামাজিক সংযোগেরও মূল্য থাকা দরকার। প্রবাসী বাঙালির জীবনেও দুর্গাপুজো বিশেষ আবেগের নাম। দেশের বাইরে কিংবা বাংলার বাইরে বসবাসকারী অসংখ্য মানুষ এই উৎসবের মধ্য দিয়ে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যোগাযোগ পুনর্নির্মাণ করেন। ভাষা, খাবার, গান, আচার ও পারিবারিক স্মৃতির মধ্যে তাঁরা খুঁজে পান পরিচিত বাংলাকে। ফলে দুর্গাপুজো ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে সাংস্কৃতিক সংহতিরও বাহক। এই পরিচয়কে জীবন্ত রাখার জন্য প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে উৎসবের ইতিহাস, শিল্প ও মানবিক মূল্যবোধ তুলে ধরা শুধু আচার না, তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বোঝানোও।

রবিবারের সাহিত্যপত্রের কাছে এই সময়ের দুর্গাপুজো শুধু শরতের নস্টালজিয়া নয়, সমকালকে পড়ার একটি সুযোগ। উৎসবের আলোয় আমরা নিজেদের সমাজকে দেখতে পারি তার সৃজনশীলতা, অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সামাজিক বৈষম্য এবং নৈতিক দ্বন্দ্বসহ। সাহিত্য মানুষের আনন্দকে অস্বীকার করে না, আবার আনন্দের আড়ালে থাকা অস্বস্তিকর সত্যকেও আড়াল করে না। পুজোর মণ্ডপে যেমন শিল্পের সৌন্দর্য আছে, তেমনই মণ্ডপের বাইরে জীবিকার সংগ্রাম রয়েছে; প্রতিমার সামনে যেমন ভক্তির আবেগ আছে। তেমনই বাস্তব জীবনে ন্যায় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কঠিন দায়িত্ব রয়েছে। দুর্গাপুজো আমাদের আনন্দ দিক, অর্থনীতিকে শক্তি দিক, শিল্পকে প্রসারিত করুক, মানুষের মধ্যে মিলনের সেতু তৈরি করুক, এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু সেই সঙ্গে উৎসব আমাদের আত্মসমীক্ষার সাহসও দিক। আমরা যেন মনে রাখি, আলোকসজ্জার উজ্জ্বলতা দিয়ে সমাজের অন্ধকার ঢেকে রাখা যায় না, বিপুল আয়োজন দিয়ে বৈষম্যের প্রশ্ন মুছে ফেলা যায় না, আর দেবীর বন্দনা করে নারীর অসম্মানকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না।দুর্গাপুজোর প্রকৃত সার্থকতা শেষ পর্যন্ত মণ্ডপের উচ্চতায় নয়, মানুষের মন কতটা উদার হলো, সমাজ কতটা ন্যায়পরায়ণ হল ও দুর্বলের পাশে দাঁড়ানোর সাহস আমাদের কতটা বাড়ল, তার মধ্যেই নিহিত। দেবী দুর্গার আগমন যদি আমাদের ভিতরের ভয়, লোভ, বিদ্বেষ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার প্রেরণা দেয়, তবেই শরতের এই মহোৎসব নিছক বার্ষিক উদ্‌যাপনকে অতিক্রম করে জীবনের এক গভীর সামাজিক ও মানবিক অঙ্গীকারে পরিণত হবে।🍁

 

 

🍂মহামিলনের কথা 
পিতৃমাতৃসেবার মাহাত্ম্য। বলছেন— যে পুত্র ‘আমার পিতা আমার মাতা জগৎ-পিতা জগন্মাতা’ বোধে সেবা করেন, তাঁর আর অন্য কোন ধর্ম্ম-কর্ম্ম করতে হয় না। তাঁর দ্বারাই তিনি পরমগতি লাভ করে থাকেন। পিতৃমাতৃসেবী অসাধ্য সাধন করতে পারেন। তাঁকে শ্রীভগবল্লাভের জন্য স্বতন্ত্র সাধনা করতে হয় না। শ্রীভগবান যেচে সেধে এসে দর্শন দান করেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব। ছবি: সংগৃহীত

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ

পিতৃমাতৃভক্ত সুসন্তান— মানব নন, দেবতা। তাঁকে শ্রীভগবানকে লাভ করবার জন্য সাধনা করতে হয় না, শ্রীভগবান যেচে সেধে এসে দর্শন দান করেন— বর দেন। মহারাষ্ট্রদেশে পণ্ঢরপুর নামক এক নগর আছে। তথায় পুণ্ডরীক নামে এক ব্রাহ্মণ বাস করতেন। তিনি পূর্বে পিতৃমাতৃভক্ত ছিলেন। বিবাহের পর স্ত্রীর প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হয়ে পড়েন। পিতামাতার সেবা করা বা কোন সংবাদ লওয়া— কিছুই করতেন না। তাঁরা কোনরকমে কষ্টে দিন পাত করতে থাকেন। আর পুণ্ডরীক স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করবার জন্য সতত সচেষ্ট থাকতেন। কোনদিন পুণ্ডরীকের পত্নী কাশীখণ্ড পাঠ শুনতে যান। পাঠক মহাশয় বলেন, —কাশীর তুল্য স্থান নাই। কাশীতে মৃত্যু হলে ভগবান শঙ্কর তারকব্রহ্ম নাম দান করেন। কাশীতে গমন করে পাথরের দ্বারা পা ভেঙ্গে পড়ে থাকবে— কোনরূপ কাশী থেকে আর বের হবে না। ‘কাশী’ ‘কাশী’— এই নাম জপ করলেও মানুষ কৃতার্থ হয়। এইরূপভাবে কাশী-মাহাত্ম্য শুনে এসে পুণ্ডরীকপত্নী স্বামীকে বললেন,
—আমায় কাশী নিয়ে চল, আমরা কাশীতে বাস করবো পুণ্ডরীক বললেন,
—কাশী বহুদূর, বৃদ্ধা পিতামাতাকে নিয়ে কি প্রকারে যাবো? পুণ্ডরীক-পত্নী বললেন, আমি কোন কথা শুনবো না, তোমাকে কাশী যেতেই হবে। পুণ্ডরীক অগত্যা কাশী যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। পিতামাতাকে কাশী যাবার কথা বলায় বললেন— কাশী অনেক দূর কি করে যাবো? পুণ্ডরীক বললেন— যেমন করেই হোক যেতেই হবে। শুভদিনে পুণ্ডরীক কাশী যাত্রা করলেন। ২/৩ ক্রোশ গিয়ে স্ত্রী বললেন, আমি আর চলতে পারছি না।
স্ত্রীকে স্কন্ধে নিলেন। পিতামাতাকে চলতে না পারায় তাদের গলায় দড়ি দিয়ে টানতে টানতে বহু দিনে কাশীধামে উপস্থিত হলেন। কাশীর প্রান্তদেশে একটি আশ্রম। পাঠ হচ্ছে শুনতে পেয়ে পুণ্ডরীক তথায় গেলেন। পাঠক মহাশয় পাঠ করছেন— পিতৃমাতৃসেবার মাহাত্ম্য। বলছেন— যে পুত্র ‘আমার পিতা আমার মাতা জগৎ-পিতা জগন্মাতা’ বোধে সেবা করেন, তাঁর আর অন্য কোন ধর্ম্ম-কর্ম্ম করতে হয় না। তাঁর দ্বারাই তিনি পরমগতি লাভ করে থাকেন। পিতৃমাতৃসেবী অসাধ্য সাধন করতে পারেন। তাঁকে শ্রীভগবল্লাভের জন্য স্বতন্ত্র সাধনা করতে হয় না। শ্রীভগবান যেচে সেধে এসে দর্শন দান করেন। যে পুত্র পিতামাতার সেবা করে না, পিতামাতার প্রতি দুর্ব্যবহার করে, কটুবাক্য বলে, ভরণপোষণ করে না, সেই হতভাগ্য পুত্র যদি বহু ধর্ম্ম-কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে তার সে সমস্ত নিস্ফল। পিতৃ-মাতৃদ্রোহী পুত্রকে অনন্তকাল নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় ৷ সেই হতভাগ্য পুত্র কেবল অসীম যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকে।
জানি না কি শুভক্ষণে এই কথাগুলি পুণ্ডরীকের কর্ণকুহরে প্রবেশ করল। তাঁর হৃদয় অনুতাপে ভরে গেল। তিনি ছুটে এসে পিতামাতার চরণে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন— বাবা! মা! আমায় ক্ষমা কর। আমার মত পিতৃমাতৃদ্রোহী মহাপাপীর অনন্ত নরক অনিবার্য্য। আমি কখনও তোমাদের সেবা করি নাই, —দুর্ব্যবহার করেছি,— তোমরা ক্ষমা না তরলে আমাকে আ-কল্প নরক ভোগ করতে হবে।
তাঁদের চরণধারণ করে পুণ্ডরীক ক্রন্দন করতে লাগলেন। ক্ষমার অবতার পিতামাতা তাঁকে বললেন— বাবা, আমরা আমাদের প্রারব্ধ ভোগ করলাম— তোর কোন দোষ নাই— তোকে আমরা ক্ষমা করলাম।
পুণ্ডরীক বললেন— বিশ্বনাথ অন্নপূর্ণা আর দেখব না, তোমরাই আমার বিশ্বনাথ অন্নপূর্ণা।
পিতামাতা বললেন— তাকি হয় বাবা! দশাশ্বমেধ ঘাটে স্নান করে বিশ্বনাথ অন্নপূর্ণা দেখে দেশে যাই চল্।
পুণ্ডরীক পিতামাতার আদেশ পালন করলেন৷ যাবার সময় তিনি একটি বাঁক নিলেন। বাঁকের দু’টি ঝোড়ায় পিতামাতাকে বসিয়ে পণ্ঢরপুর অভিমুখে অগ্রসর হলেন ৷ যথাকালে পণ্ঢরপুর এসে পিতামাতার সেবা করতে লাগলেন ৷ মানুষ যেমন দেবতার সেবা করে তদ্রূপ পিতামাতার সেবায় নিরত হলেন ৷ তাঁদের স্নান করান, ভোজন করান, পদসেবা, বাতাস করা— এই নিয়েই সর্বদা থাকতেন। তাঁদের কাছ-ছাড়া ক্ষণকাল অবস্থান করতেন না ৷ চরণ-তলে নিদ্রিত হতেন। পিতামাতার সেবা ব্যতীত তাঁর অন্য চিন্তা ছিল না। সতত পিতামাতার সেবা করার ফলে পুণ্ডরীকের চিত্তশুদ্ধি হয়ে গেল। দেহাভিমানী মানুষের চিত্ত ততদিন অশুদ্ধ থাকে যতদিন মানব বাহ্য শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধাদি বিষয়সমূহের দ্বারা দেহকে সুখী করতে চায়, স্বীয় আত্মস্বরূপ বিস্মৃত হয়ে দেহকে আত্মাভেবে তারই পরিচর্য্যা করতে থাকে, তারই বাঞ্ছিত অবাঞ্ছিত বস্তুলাভে হৃষ্ট বা দুঃখিত হয় ৷ চিত্ত যখন কোন বিষয়ের আকাঙ্খা করে না— আলোকে-পুলকে আনন্দে আপনাতে আপনি ডুবে যায় তখনই চিত্ত শুদ্ধ হয়। বিষয়-স্পৃহা অশুদ্ধচিত্তে থাকে, শুদ্ধচিত্তে কোন বিষয়ের আকাঙ্খা থাকে না। পুণ্ডরীকের পিতামাতার সেবা করতে করতে বিষয়স্পৃহা দূর হয়ে গেল, তাঁর বিকশিত হৃদয়-কমলে নিত্য দেদীপ্যমান জ্যোতির আবির্ভাব হল। শ্রীভগবান আর স্থির থাকতে পারলেন না। একদিন তাঁর পিতৃমাতৃ-সেবাকালে পশ্চাদভাগে আবির্ভূত হয়ে বললেন— ‘পুণ্ডরীক আমি অতিথি৷’
পিতৃমাতৃ-সেবায় ব্যাপৃত আপন-হারা পুণ্ডরীক একখানা ইঁট দিয়ে বললেন, আপনি ইঁটের উপর অবস্থান করুন, পিতামাতার সেবা অন্তে আপনার সেবা করবো ৷ শ্রীভগবান কোমরে দুটি হাত দিয়ে দণ্ডায়মান হয়ে থাকলেন ৷ পুণ্ডরীক পিতামাতার সেবা করার পর যখন জলের দ্বারা অতিথির চরণ-প্রক্ষালন করতে গেলেন তখন দেখলেন অতিথির শরীর কঠিন, তিনি পাথর হয়ে গেছেন, পুণ্ডরীক অতিথি প্রস্তরে পরিণত হওয়ায় অনাহারে রোদন করে দিন অতিবাহিত করলেন। অহো! আমার দুষ্কৃতিবশে অতিথি পাথর হয়ে গেছেন— বলে কাতরস্বরে ক্রন্দন করতে লাগলেন। মধ্যরাত্রে তাঁর তন্দ্রা আসে, সেই সময় শ্রীভগবান দর্শন দান করত বলেন,— বৎস পুণ্ডরীক! আমি তোর পিতৃ-মাতৃভক্তিতে অতিশয় প্রীত হয়ে এসেছি, তুই আমার পূজা কর। যতদিন গগনে চন্দ্র-সূর্য্য থাকবে ততদিন আমি মণ্ঢরপুরে এইভাবে অবস্থান করবো। আজ হতে পণ্ঢরপুর তীর্থে পরিণত হল। চন্দ্রসূর্য্যের স্থিতিকাল পর্য্যন্ত তোর এই পিতৃ-মাতৃভক্তির কথা কোটি কোটি কণ্ঠে কীর্ত্তিত হবে। আজ পর্য্যন্ত শ্রীভগবান ইঁটের উপর চরণযুগল স্থাপন করত সেইভাবে অবস্থান করছেন। তাই বলছি— ভগবানবোধে পিতামাতার সেবাও মানুষকে পরমানন্দ দান করেন। যাঁদের পিতামাতা জীবিত আছেন তাঁদের অবশ্য কর্ত্তব্য— সর্বপ্রযত্নে পিতামাতাকে সন্তুষ্ট করা৷ তাঁরা প্রসন্ন হলে পুত্র জাগতিক বিষয় তো তুচ্ছ— শ্রীভগবানকে লাভ করতে পারেন, শ্রীভগবান স্বয়ং এসে দর্শন দান করেন ৷ 🍁
(লেখার সমস্ত কিছুই অপরিবর্তিত)

যুগবাণী | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী 

 

 

🍂সমসাময়িক
উন্নয়নের উল্লাসের আড়ালে জমে থাকা প্রশ্নগুলিই আজকের সময়ের আসল পরিচয়। লিখেছেন : দেবব্রত সরকার 

সময়ের কাঠগড়ায় সমাজ, রাজনীতি ও বিবেক

সময় কখনও নিরপেক্ষ দর্শক নয়। সে মানুষের কর্মকাণ্ড, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত, রাজনীতির চরিত্র ও সমাজের নৈতিক অবস্থানকে ইতিহাসের পাতায় ধরে রাখে। বর্তমানের যে ঘটনাকে আজ সাময়িক বলে মনে হচ্ছে, কাল সেটিই হয়ে উঠতে পারে একটি যুগের পরিচয়। তাই সমকালকে বুঝতে হলে শুধু ঘটনার বিবরণ জানলেই চলে না। ঘটনার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য, তার সামাজিক অভিঘাত এবং তার সুদূরপ্রসারী পরিণতিও বিচার করতে হয়। আজকের ভারত, আজকের বিশ্ব এবং আমাদের চারপাশের সমাজকে দেখার ক্ষেত্রে এই বিচারবোধই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন উন্নয়নের দাবি যত জোরাল, সাধারণ মানুষের জীবনের প্রশ্নগুলিও ততই কঠিন। পরিকাঠামো বাড়ছে, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের অবস্থান নিয়ে গর্ব প্রকাশ করা হচ্ছে। এসবের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু পাশাপাশি প্রশ্ন উঠবেই এই অগ্রগতির সুফল কতটা মানুষের ঘরে পৌঁছচ্ছে? শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থান, মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, কৃষকের অনিশ্চয়তা, শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা এবং চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়ভার, এই বাস্তব সমস্যাগুলির উত্তর কোথায়? উন্নয়নের সাফল্য যদি মানুষের দৈনন্দিন উদ্বেগ কমাতে না পারে, তবে তার মূল্যায়ন কেবল প্রচারের ভাষায় সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।

সমকালীন জনজীবনের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হল, সত্যের ক্রমবর্ধমান সঙ্কট। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রচারের বিস্তারে তথ্যের প্রবাহ অভূতপূর্ব দ্রুত হয়েছে। কিন্তু তথ্যের পরিমাণ বাড়লেই সত্যের প্রতিষ্ঠা ঘটে না। সম্পাদিত দৃশ্য, অসম্পূর্ণ তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার এবং যাচাইহীন অভিযোগ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। কখনও একটি মিথ্যা খবরের বিস্তার তার প্রতিবাদের চেয়েও দ্রুত হয়। পরে ভুল প্রমাণিত হলেও প্রথম আঘাতটি মানুষের মনে থেকে যায়। এই বাস্তবতায় সংবাদ গ্রহণের স্বাধীনতার পাশাপাশি তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বও নাগরিক জীবনের অপরিহার্য অংশ।

রাষ্ট্রের সাফল্য বিচার করার একটি সহজ মাপকাঠি রয়েছে ক্ষমতাবান কতটা শক্তিশালী হলেন, তার চেয়ে সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদ, স্বাধীন ও মর্যাদাসম্পন্ন জীবন পেলেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বৃহৎ প্রকল্পের উদ্বোধন দৃশ্যমান, কিন্তু একটি পরিবারের চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পারা, একজন তরুণের দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়া কিংবা একজন শ্রমিকের ন্যায্য পারিশ্রমিক না মেলা অনেক সময় প্রচারের আলোয় আসে না। অথচ রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের পরীক্ষা ঠিক এই অদৃশ্য ক্ষেত্রগুলিতেই। রাজনীতির বর্তমান চরিত্র নিয়েও তাই গভীর আত্মসমীক্ষা জরুরি। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, ক্ষমতার লড়াই থাকবে, জনসমর্থন অর্জনের চেষ্টা থাকবে। কিন্তু যখন জনকল্যাণের প্রশ্নকে সরিয়ে ব্যক্তিপূজা, প্রতিপক্ষকে হেয় করা এবং আবেগনির্ভর মেরুকরণ রাজনীতির প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনীতি যদি নাগরিকের সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে নাগরিকের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলে পরিণত হয়, তবে সেখানে প্রশ্ন করার অধিকার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কোনও সরকারই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কোনও রাজনৈতিক দলই দেশ, সমাজ কিংবা জনগণের একমাত্র প্রতিনিধি হওয়ার দাবি করতে পারে না। গণতন্ত্রে নির্বাচনী জনাদেশ শাসনের অধিকার দেয়, কিন্তু সীমাহীন কর্তৃত্বের অনুমতি দেয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকার গঠনের বৈধতা দিতে পারে; প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত সত্যে পরিণত করতে পারে না। বিরোধী মতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা, সমালোচককে অপছন্দের পরিচয়ে চিহ্নিত করা কিংবা যুক্তির বদলে আনুগত্যকে রাজনৈতিক যোগ্যতার মাপকাঠি করে তোলা এসব প্রবণতা যে দলের মধ্যেই দেখা দিক, তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পক্ষে বিপজ্জনক। এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা দরকার রাষ্ট্রের সমালোচনা আর রাষ্ট্রের বিরোধিতা এক বিষয় নয়। সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা আর দেশের বিরোধিতা এক বিষয় নয়। দেশের প্রতি ভালবাসা মানে দেশের প্রতিটি কাজকে নিঃশর্ত সমর্থন করা নয়। এটি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ও নাগরিকের অধিকার রক্ষা করাও দেশপ্রেমেরই অংশ। যে সমাজে প্রশ্ন করাকে অবিশ্বাসের লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে ভুল সংশোধনের পথ সংকুচিত হয়ে আসে। আর যে রাষ্ট্র নিজের সমালোচনা শুনতে পারে, তার আত্মসংশোধনের ক্ষমতাও বেশি থাকে।

সমকালীন জনজীবনের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হল, সত্যের ক্রমবর্ধমান সঙ্কট। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রচারের বিস্তারে তথ্যের প্রবাহ অভূতপূর্ব দ্রুত হয়েছে। কিন্তু তথ্যের পরিমাণ বাড়লেই সত্যের প্রতিষ্ঠা ঘটে না। সম্পাদিত দৃশ্য, অসম্পূর্ণ তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার এবং যাচাইহীন অভিযোগ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। কখনও একটি মিথ্যা খবরের বিস্তার তার প্রতিবাদের চেয়েও দ্রুত হয়। পরে ভুল প্রমাণিত হলেও প্রথম আঘাতটি মানুষের মনে থেকে যায়। এই বাস্তবতায় সংবাদ গ্রহণের স্বাধীনতার পাশাপাশি তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বও নাগরিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার কাজ শুধু ক্ষমতার বক্তব্য প্রচার করা নয়, ক্ষমতার কাছে জবাবদিহি দাবি করাও। আবার সমালোচনার নামে অসত্য প্রচার করাও সাংবাদিকতার কাজ হতে পারে না। স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করেই সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সংবাদ যখন অনুসন্ধানের পরিবর্তে প্রচার, বিশ্লেষণের পরিবর্তে উত্তেজনা এবং জনস্বার্থের পরিবর্তে দর্শকসংখ্যার প্রতিযোগিতায় আটকে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাগরিকের জানার অধিকার। এই সঙ্কটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক বিভাজনের রাজনীতি। ধর্ম, ভাষা, জাতপাত, অঞ্চল কিংবা পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরির প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু যখন সেই বিভাজনকে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তার ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হয়। মানুষের বাস্তব সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পরিচয়ের সংঘাতকে সামনে নিয়ে আসা সহজ, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক জবাবদিহির মতো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তুলনায় কঠিন। তাই জনজীবনে কোনও বিতর্কের তীব্রতা দেখেই তার গুরুত্ব বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে, সেই বিতর্ক মানুষের জীবনকে উন্নত করছে, নাকি বৃহত্তর সমস্যাগুলিকে আড়াল করছে। কিন্তু, সমাজের সমস্ত ব্যর্থতার দায় শুধু রাজনীতির ওপর চাপিয়ে দিলেও আত্মপ্রবঞ্চনা হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমাজেরই অংশ, তাদের শক্তি ও দুর্বলতার প্রতিফলন নাগরিক আচরণেও দেখা যায়। আমরা অন্যের দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ হই, কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙতে দ্বিধা করি না। অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদ করি, অথচ নিজের মতের বিরোধী মানুষকে অপমান করতে পিছপা হই না। নৈতিকতার দাবি করি, কিন্তু সেই নৈতিকতা নিজের ক্ষেত্রে কতটা প্রয়োগ করি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলি না। এই দ্বিচারিতা দূর না হলে সামাজিক পরিবর্তনের দাবি অনেক সময় নিছক উচ্চারণেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

এইসময়ে তরুণ প্রজন্মের সঙ্কটও বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। তাদের সামনে প্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনা, কিন্তু পাশাপাশি রয়েছে কর্মজগতের অনিশ্চয়তা, তীব্র প্রতিযোগিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। তাদের শুধু সাফল্যের স্বপ্ন দেখানো যথেষ্ট নয় সেই সাফল্যে পৌঁছনোর বাস্তব পথ তৈরি করাও জরুরি। শিক্ষা যদি কর্মদক্ষতা, চিন্তার স্বাধীনতা ও নৈতিক বোধের সমন্বয় ঘটাতে না পারে, তবে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়লেও সমাজের বৌদ্ধিক শক্তি সমানভাবে বাড়বে না। তরুণদের কাছে আনুগত্য নয়, যুক্তিবোধ।   অন্ধ অনুকরণ নয়, সৃজনশীলতা, এবং শুধু  প্রতিযোগিতা না, সহযোগিতার মূল্যও তুলে ধরতে হবে। এইখানেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূমিকা নতুন তাৎপর্য লাভ করে। সাহিত্য তো শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়, সময়কে প্রশ্ন করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। যে সাহিত্য মানুষের যন্ত্রণা, সামাজিক অসংগতি, রাজনৈতিক ভণ্ডামি আর নৈতিক দ্বন্দ্বকে স্পর্শ করতে পারে, সেই সাহিত্যই সমকালকে তার গভীরতায় ধারণ করে। সাহিত্যের কাজ কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শের মুখপাত্র হয়ে ওঠা না, বরং মানুষের অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিকতা প্রকাশ করা, প্রচলিত ধারণাকে পরীক্ষা করা এবং পাঠককে স্বাধীনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা।

সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল -এর  কাছে তাই প্রত্যাশাও সাধারণ বিনোদনের চেয়ে বেশি। সপ্তাহের ব্যস্ততার বাইরে দাঁড়িয়ে পাঠক যখন সমকালকে বুঝতে চান, তখন তাঁর সামনে এমন লেখা থাকা প্রয়োজন, যা শুধু পরিচিত সত্যের পুনরাবৃত্তি করবে না, অস্বস্তিকর প্রশ্নও তুলবে। ক্ষমতার কাছে প্রশ্ন, সমাজের কাছে প্রশ্ন, বিরোধী রাজনীতির কাছে প্রশ্ন, সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রশ্ন এমনকী নিজের বিবেকের কাছেও প্রশ্ন। তবে প্রশ্নের ধার যেন বিদ্বেষে ভোঁতা না হয়ে যায় ও সমালোচনার তীব্রতা যেন তথ্যের শৃঙ্খলা হারিয়ে না ফেলে। যুক্তিনিষ্ঠ প্রতিবাদই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বিপদ সম্ভবত কোনও একটি ঘটনা নয়, এটি অন্যায়ের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়া। প্রথমে যে ঘটনায় মানুষ প্রতিবাদ করে, বারবার ঘটতে ঘটতে সেটিই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করে। অসত্য, দুর্নীতি, হিংসা, বৈষম্য কিংবা দায়িত্বহীনতা যখন দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত দৃশ্য হয়ে ওঠে, তখন সমাজের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়। এই স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে সাহিত্য, শিক্ষা, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক বিবেককে একযোগে সক্রিয় থাকতে হবে।

ইতিহাসের বিচার তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে হয় না। কোনও শাসকের প্রচার, কোনও দলের স্লোগান কিংবা কোনও সময়ের উন্মাদনা চিরকাল স্থায়ী থাকে না। শেষ পর্যন্ত বিচার হয় মানুষ কতটা ন্যায়বিচার পেয়েছে, প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন থেকেছে, নাগরিক কতটা মর্যাদা নিয়ে বেঁচেছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কতটা সুস্থ সমাজ রেখে যাওয়া গেছে। এইসময়  আমাদের সামনে তাই প্রশ্নটি খুব স্পষ্ট: আমরা কি কেবল পরিবর্তনের দৃশ্য দেখতে চাই, নাকি পরিবর্তনের প্রকৃত ফলও যাচাই করতে প্রস্তুত? আমরা কি শুধু অন্যের ব্যর্থতা নিয়ে সরব হব, নাকি নিজের পক্ষের ভুলের বিরুদ্ধেও একই দৃঢ়তায় কথা বলব? আমরা কি দেশকে ভালোবাসার নামে প্রশ্ন বন্ধ করব, নাকি প্রশ্নের মধ্য দিয়েই দেশকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করব? সময় উত্তর দেবে না; উত্তর দিতে হবে আমাদেরই। কারণ ইতিহাসের প্রতিটি সংকটের ভিতরে সম্ভাবনার একটি দরজাও খোলা থাকে। সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য প্রয়োজন সাহস, সততা এবং বিবেকের স্বাধীনতা। আজকের সময়কে বুঝতে হলে তার সাফল্যের বিজ্ঞাপন যেমন দেখতে হবে, তেমনই শুনতে হবে তার নীরব মানুষের দীর্ঘশ্বাস। ক্ষমতার উচ্চারণ যেমন বিচার করতে হবে, তেমনই গুরুত্ব দিতে হবে ক্ষমতাহীন মানুষের প্রশ্নকে। আর সবশেষে মনে রাখতে হবে, যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সে সমাজ একদিন নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারও হারাতে বসে।

 

 

🍂কবিতা 

 

সুজাত মিশ্র -এর দু’টি কবিতা 

পুজো এলে তোমার কথা

কাশফুল জাগে নদীর ধারে, আকাশ নীলের চিঠি
শিউলি ঝরে ভোরের বুকে, স্মৃতিরা সব মিঠি।
ঢাকের তালে শহর জাগে, আলো নামে পথে
তবুও কেন মনটা আমার তোমায় খুঁজে ফেরে?

নতুন জামার গন্ধ মেখে শিশুর চোখে হাসি,
মণ্ডপজুড়ে জনসমুদ্র, রঙিন ভালোবাসি।
সিঁদুররাঙা সন্ধ্যাবেলায় ধূপের ধোঁয়া ওড়ে,
তোমার নামে জমে থাকা কথাগুলি মন পোড়ে।

দেবী আসেন, দেবী ফেরেন, বছর ঘুরে আবার,
আমার শুধু ফুরোয় না যে অপেক্ষার অন্ধকার।
পুজো শেষে শূন্য পথে ঝরে পড়ে ফুল,
তোমায় ছাড়া উৎসব আমার, আনন্দেরও ভুল।

 

তোমার চোখে 

তোমার চোখে শরৎ দেখি, নীল আকাশের ছায়া,
তোমার হাসি ছুঁয়ে গেলে হারায় মনের মায়া।
কাশের বনে হাওয়া এলে তোমার আঁচল ওড়ে,
আমার যত গোপন কথা তোমার কাছেই পড়ে।

পুজোর রাতে আলোর মেলায় হাতটা রেখো হাতে,
হারিয়ে যাব দুজনে আজ জনসমুদ্রের সাথে।
ঢাকের তালে হৃদয় আমার তোমার নামই লেখে,
চাঁদের আলো থমকে থাকে তোমার মুখের দিকে।

যদি কখনও দূরে যাও তুমি সময়েরই টানে,
রেখো আমায় একটু জায়গা তোমার স্মৃতিরখানে।
বছর ঘুরে দেবী আসবেন, ফিরবে উৎসবের দিন,
তোমার ছোঁয়া ছাড়া তবু সবই হবে মলিন।

প্রেম মানে তো কাছে থাকা- এমন কথা নয়
দূরে থেকেও কারও জন্য হৃদয় ব্যাকুল হয়
তোমার চোখে শরৎ থাকুক, থাকুক স্নিগ্ধ আলো
জীবন যত পথই বদলাক, তোমায় বাসি ভালো।

 

বৃন্দাবন দাস -এর একটি কবিতা 

চরিত্র

এই নিরিবিলি একাকীত্ব অনন্ত পরমায়ু

ঠিক যখন থেকে তুমি খন্ড খন্ড নালিকাপ্রবাহ
খন্ড খন্ড পরাধীনতায় বিচ্ছিন্ন সহোদর এবং নাকি শিল্পসম্মত
আরো কিছুদিন পর আমাদের মাটি ও শৈশব
স্বপ্নবাড়ি হয়ে স্থির জন্মের ভিতর কাঁপিয়ে তুলছে
নীতিগত উত্তীর্ণতা
অসাধারণ সত্যের মতো সত্যের ক্ষুব্ধতা
আর উৎকর্ষতার মত তাৎপর্য
অথচ এতটাই আপেক্ষিক যা আমাদের
যাবতীয় কুসংস্কারই উত্তরাধিকার

যদি বলো একা থাকাই জীবের ভবিতব্য
আমাদের চরিত্র অক্ষরবৃত্ত থেকে মোটেই আগাতে পারেনি—

 

 

নিতিন সমাদ্দার -এর দু’টি কবিতা

বিসর্জন

বিসর্জনের পর নদীটাকে বড় একা লাগে।
যেন কেউ তার বুক থেকে একটি মুখ তুলে নিয়েছে।
ঘাটে পড়ে আছে ফুল, ভাঙা মালা, কাগজের নৌকো,
একটি শিশু বাবার হাত ধরে বাড়ি ফিরছে।

আমারও বাড়ি আছে, আলো জ্বলে, ভাতের গন্ধ ওঠে,
তবু কোথাও যেন ফেরার পথটি হারিয়ে গেছে।
যে মেয়েটি একদিন বলেছিল, আবার দেখা হবে,
তার কথা মনে পড়লে শহরটা অন্য রকম লাগে।
এখন তার সংসার আছে, হয়তো একটি সন্তান,
আমার নাম সে মনে রেখেছে কি না জানি না।
আমি তাকে দোষ দিই না, জীবন এমনই,
সবাই সব প্রতিশ্রুতির কাছে ফিরে আসে না।

রাতে ঘুম ভেঙে গেলে জল খেতে উঠি,
আয়নায় দেখি, আমার বয়স বেড়ে গিয়েছে।
যে দুঃখ একদিন পৃথিবী শেষ করে দিতে চেয়েছিল
সে এখন চুপচাপ চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ে…

বাইরে ঢাক বাজছে, পুজো…
আমি জানি, আমিও একদিন হাসব মানুষের সঙ্গে।
তবু বিসর্জনের জলে যে মুখটি হারিয়ে গেছে,
তার জন্য আমার ভিতরে একটি নদী বয়ে চলে।

ভয়

আমি অন্ধকারকে ভয় পাই না।
ভয় পাই পরিচিত মুখের নীরবতাকে।
যে মানুষ কালও আমার পাশে ছিল
সে কেন চোখ নামিয়ে চলে যায়?
রাতে দরজা বন্ধ করি, জানালা বন্ধ করি
কিছু শব্দ ভিতরে ঢুকে পড়ে।
নিজের কাছেই প্রশ্ন করি, কীসের এত ভয়?
হারানোর, না কি একদিন সব হারিয়েও
স্বাভাবিক মানুষের মতো বেঁচে থাকার?
উত্তর আসে না, শুধু সকাল হয়ে যায়।

 

 

উৎসব মিত্র -এর একটি কবিতা

পৃথিবীকে ভালবাসার সামান্য উপায়

আমি খুব বড় কিছু করতে পারিনি
একটি গাছ লাগিয়েছি বাড়ির সামনের উঠোনে
একজন বৃদ্ধ পথ ভুলেছিলেন,
তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলাম এক সন্ধ্যায়
একটি মেয়ে কাঁদছিল বাসস্ট্যান্ডে
কিছু জিজ্ঞেস করিনি, শুধু জল এগিয়ে দিয়েছিলাম
আমার নিজেরও দুঃখ ছিল অনেক
তবু অন্যের দুঃখ দেখলে থেমে যেতে ইচ্ছে করে

ভালবাসা খুব বড় কোনও শব্দ না হয়ত
কোনও শপথ না, চাঁদের আলোয় লেখা চিঠিও না
যে মানুষটি সারাদিন কাজ করে বাড়ি ফেরে
তার জন্য এক কাপ চা রেখে দেওয়া
যে কথা বলতে পারে না, তার পাশে বসে থাকা
যে ভুল করেছে, তাকে আরেকটি সুযোগ দেওয়া
এইসব সামান্য কাজের ভিতরেই বোধহয়
পৃথিবীটাকে বাসযোগ্য রাখার শেষ চেষ্টা

আমি জানি, একদিন আমিও থাকব না
গাছটি হয়ত তখনও ছায়া দেবে পথের মানুষকে
ভালোবাসা যদি কিছু রেখে যায় পৃথিবীতে
সেটুকুই যথেষ্ট, বেঁচে থাকার পক্ষে।

 

 

শ্রীজিতা গুহ রায় -এর দু’টি কবিতা

 ভয়

নিভে গেল বাতিটার
কাঁপছে ছায়া, কোথায় হারায় ভালো

মেঘের গর্জন, দরজায় কার শব্দ
বুকের মধ্যে ভয়ের পাখি ডানা মেলে স্তব্ধ…

মানুষ মানুষকেই সন্দেহ করে বেশি
মুখের হাসির আড়ালটাতে কত অচেনা ফাঁসি

তবু ভোরের প্রথম পাখি গান শোনাবে এসে
সূর্য উঠবে অন্ধকারের সমস্ত ভয় ভেঙে

হাত বাড়িয়ে হাতটি ধরো, রাত পেরোবে ধীরে,
ভালোবাসা সাহস জোগায় সবচেয়ে গভীর নীড়ে

ভালোবাসা বেঁচে থাক

ভালোবাসা শুধু হাত ছোঁয়া?
ভাঙা মনে পাশে থাকা, দুঃখ ভাগ করে নেওয়াই…

ভালবাসা শুধু মধুর কথা বলা?
কঠিন সময় হাত না-ছাড়া, এও তো পরিচয়!

যে মানুষটি হাসির আড়াল কান্না লুকিয়ে রাখে
তার স্তব্ধতা বুঝতে শেখো, বসো তারই পাশে…

যে বৃদ্ধটি পথের ধারে অপেক্ষাতে রয়
একটু কথা, একটু মমতা তারও প্রাপ্য হয়

যে শিশুটির চোখের কোণে ক্ষুধার ছায়া নামে
এক মুঠো ভাত পৌঁছে দিও ভালোবাসার নামে
যে মেয়েটি ভয়ে ভয়ে ঘরে ফেরে রাতে
নিরাপত্তার অধিকার দাও তার চলার পথে

আলো জ্বলুক সবার ছোট্ট ঘরের কোণে
কেউ যেন একলা কাঁদে অন্ধকারের সঙ্গে
পৃথিবীটা বদলে যাবে বড় বড় কথায় নয়

একটি হৃদয় অন্য হৃদয় আপন করে নিলেই হয়

ধর্ম, ভাষা, জাতের বেড়া পেরিয়ে যাক মন
ভালোবাসায় বেঁচে থাকুক মানুষেরই বন্ধন।

 

 

মনামী ঘোষ দস্তিদার -এর একটি কবিতা 

তোমাকে বলিনি

তোমাকে ভালোবাসি
এ কথা বলা হয়নি
শুধু একদিন বৃষ্টিতে
তোমার ছাতা ধরেছিলাম।
তুমি হেসে বলেছিলে
এত ভিজছ কেন?
আমি বলিনি
তোমার পাশে থাকলে বৃষ্টি ভালো লাগে।

কত বছর কেটে গেল
তুমি অন্য শহরে
আমি অন্য জীবনে।
মাঝে মাঝে কোনও অচেনা মেয়ের হাসিতে
তোমার মুখ এসে দাঁড়ায়,
আমি চোখ ফিরিয়ে নিই।

ভালোবাসা তবে কী এই!
যার কাছে পৌঁছনো যায় না তাকে মনে রাখা?
নাকি যার কাছে পৌঁছে গিয়েছি
তার কাছেই নিজের কথা বলতে না পারা?

আজও বৃষ্টি নামলে
বুকের জানালাটা খুলি
কেউ আসে না
মনে হয় তুমি আসবে।
কিছু অপেক্ষার
কোনও শেষ নেই
শুধু মানুষ একদিন
অপেক্ষা করতে ভুলে যায়…

 

 

 

🍂ধারাবাহিক উপন্যাস  
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।

 

হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা

মমতা রায় চৌধুরী 

৩৩. 

গতকাল কাগুজি মাসির কথাগুলো সারারাত ভেবে গিয়েছে তিথি। কেমন যেন ওলট-পালট হয়েছে হৃদয়ে, এরপরেও আর কি করুণ কাহিনি থাকতে পারে। অনেক ভেবে তিথি স্থিত হল। লতাদি নিশ্চয়ই ছেলেটার সঙ্গে পালিয়ে ছিল প্রেমের মর্যাদা দিতে। পাতিলেবুর মত সকালে খুব ফুরফুরে মেজাজ ছিল তিথির, আজকে আর একটা কাহিনি লিখতে হবে।
আজ ২রা অক্টোবর ছুটির দিন আর কোন কথা হবে না। এরপর আবার ক’দিন মাসি থাকবে না। ঘুম থেকে উঠে তিথি পুচুকে দেখতে না পেয়ে মাসির ঘরের দিকে গেল। একি মাসির দরজাটা হাট করে খোলা কেন?
উঁকি দিয়ে দেখল ওরে বাবা পুচু তো মাসির পাশে গিয়ে শুয়ে আছে।
মাসি আপন মনে পুচুর সঙ্গে গল্প করছে।
—মাসি, ও মাসি?
মাসি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। বলল —বৌমা?
—হ্যাঁ গো মাসি।
—কি ব্যাপার হঠাৎ পুচু মাসির ঘরে?
—হ্যাঁ গো দরজায় এসে ধাক্কাচ্ছে।
—কে পুচু?
—হ্যাঁ।
বল কি!
মাসি হো হো হো করে হেসে উঠল।
তারপর পুচির গায়ে আদরে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
—ভালই লাগে জানো বৌমা, ওদের ভেতরে তো কোনো স্বার্থপরতা নেই। একটু ওদের ভালবাসলে ওরা যেন অনেক বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে।
—এটা ঠিকই বলেছ।

আকাশটাকে অচেনা মনে হয়েছে কখনও কখনও মনে হয়েছে আকাশটাকে অপরাজিতা ফুলের লাখ লাখ পাঁপড়ি ছড়ানো নীল আকাশ। আবার কখনও মনে হয়েছে ঠিক যেমন রাজহাঁসের পালক হয় ঘোলাটে সাদা এভাবেই আকাশ তার সম্মুখে ধরা দিয়েছে। কোনও সিদ্ধান্তেও আসতে পারেনি।

তিথি কাগুজি মাসির ঘরে ঢুকে, চেয়ারটাতে বসলো। পুচু লেজ নাড়তে শুরু করল।
তিথি, পুচুর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে দিল।
—তা ও-বৌমা সাত সকালে যে আমার ঘরে কী ব্যাপার?
তিথি আলস্য জড়ানো কন্ঠে বলল,
—চারিদিকে টিয়া পাখির মতো সবুজ ঘাসের দিকে তাকিয়ে মনে হয় খোলা নীল আকাশে নিজেকে মেলে ধরি।
—এসব কী বলছ সবুজ ঘাস কোথায় গো?
এবার তিথি পাশের খাটটাতে নিজের গাটাকে মেলে দিয়ে বলল,
—ও মাসি, মনে মনে ভাবছি আর কল্পনা করছি।
বুঝেছি বুঝেছি তোমার এখন গল্প লেখার মুড হয়েছে।
—তুমি তো বেশ ভাল ইংরেজি শিখে যাচ্ছে মাসি, আর বুঝতেও শিখে গেছ বলো আর দেরি করলে হবে না আবার তো তুমি পুজোতে থাকবে না বলছ।
—হ্যাঁ সেরকমই তো ভাবছি। দেখা যাক।
—হ্যাঁ কি যেন বলছিলাম।
ওই যে বলছিলে সেদিন সন্ধ্যা বেলায় নিজেকে খুব ভাল করে সাজিয়েছিল লতাদি। তারপর।
তারপর আর কী ছেলেটার মুখ থেকে অনেক কথা জানার চেষ্টা করেছে। তার পরিবার সম্পর্কেও
—কেন সে কি মুখ খোলেনি?
সেটাই তো বড় আশ্চর্যের যা বলছে সেসব কথা সত্যি কিনা!
—কেন এসব মনে হয়েছে?
তোমাকে একদিনই তো বলেছি ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়।
—তা অবশ্য ঠিকই বলেছ।
লতার কেমন একটু সন্দেহ হয়েছিল।
—ওমা তাই বুঝি?
—হ্যাঁ গো, ও বলল দাঁড়াও চালাকি। সেদিন লতা ওর সাথে খুব ভাল ভাবে মিশল এবং তাকে অনেক মদ খাওয়াল।
শেষে দেখা গেল হরহর করে তার কথা সব বেরিয়ে আসলো।
—কী রকম।
—ও তো বিবাহিত।
—কি বলছ মাসি! তিথি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
—তারপর ওর বাড়িতে স্ত্রী আছে সন্তান আছে। মা-বাবা আছে।
—মাসি!
—আমাকে বলতে দাও, লতার পায়ের তলা থেকে মাটি আস্তে আস্তে সরতে শুরু করল, যদিও নিজেকে সামলে নিয়েছিল সেই সময়। ভোর হবার অপেক্ষায় ছিল। ভেতরে কতটা আঘাত পেয়েছে তো।
যাকে ভরসা করেছে যাকে ভালবাসতে চেষ্টা করেছে সেই প্রতারণা করল।
—এরপর? তুমি বলো না তার সাথে তো ডিভোর্স হয়নি কিছুই
হয়নি?
—কী করে একটা মেয়ের সংসার সে নষ্ট করে?
—এটা একদম হক কথা।
তারপর তো সে বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল লতা অনেক অনেক কেঁদেছিল, তারপর আমাকে ডেকেছিল। আমি ওর কাছে যখন যাই তখন ও আমার বুকের উপর আছড়ে পড়েছিল।
আমার সান্ত্বনা দেবার কোন ভাষা ছিল না। ও শুধু আমাকে বলল ভাগ্যিস তুমি আমাকে শর্ত দিয়েছিলে এবং যাচাই করতে বলেছিলে, নইলে তো আবার আমি একই ভুল করতাম। প্রথমদিকে আমার একটু অভিমান হয়েছিল তোমার প্রতি।
তারপর নিজের মনকে বুঝিয়েছিলাম, এত দিনের একজন অভিজ্ঞ তার কথাটা শোনা দরকার। ভাগ্যিস শুনেছিলাম আজ হয়তো আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি সেটা সাময়িক কিন্তু সারা জীবনের ব্যাপার যেখানে এবং অন্য একটি মেয়ের জীবনটাকে আমি নষ্ট করতে যাচ্ছিলাম ছিঃ! ভাবতেও আমার কেমন লাগে।
তিথি বলল,
—মাসি।
কাগুজি মাসি হাত দিয়ে কথা বলতে বারণ করে দিল।
ওর চোখের জল আমার কাঁধ পিঠ ছুঁয়ে পড়ছে তখন।
আর তখন আমার অবস্থা হয়েছিল কেমন যেন দালানে যেমন খুঁটি থাকে সেই খুঁটিটা যেমন কোনও প্রতিক্রিয়া থাকে না। তোমাদের ভাষায় কি বলে যেন…!
তিথি বলল,
—অনেকটা অভিব্যক্তিহীন, অবস্থায় যেমন দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক সেরকম তাই না।
—একদম। ওকে কান্নার জন্য সময় দিলাম। যে কষ্ট ওর বুকের উপর চেপে আছে। সেটা কিছুটা হালকা হোক।
তারপরে এক সময় ওকে ধরে বসালাম, তারপর বললাম, কী ভাবলি?
—কিছু ভাবার নেই আমার জীবন এভাবেই এই গলিতে শেষ হবে মাসি।
—কেন তোকে যে বোনের মর্যাদা দিয়েছে সেখানে যাবি না?
—না মাসি।
-চোখের জল মুছতে মুছতে বলল,
—কী অপূর্ব লাগছিল লতাকে।
এত সুন্দর সেজেছিল এত স্নিগ্ধ লাগছিল ওকে আমি চোখ ফেরাতেই পারছিলাম না।
কে জানত, পরের দিন ওকে বুনো চিতাবাগের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ভোরের আলোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তারপর একসময় জলে নেমে সারা রাতের ক্লান্তি দূর করবে।
তিথি বুঝতে পারল সারা রাতের ক্লান্ত-শ্রান্ত মন একটু সতেজ করার জন্য সে প্রত্যাশী।
—আচ্ছা মাসি ও কথা কেন বলল যে, পাতানো দাদার কাছে যাবে না। কেন?
—আসলে বুঝে গেছিল জীবনের সার। কতবার মানুষ এভাবে হারতে পারে?
তাছাড়া ওই দাদা ওকে নিয়ে গেলে ওকে নিয়ে যে বাড়িতে অশান্তি হবে না সে গ্যারান্টিটা কে দেবে?
—কথাটা তুমি ঠিকই বলেছ।
তাহলে লতাদির শেষ জীবন এই গলির অন্ধকারেই কেটেছিল?
—কী বলব তোমায়, ওর কাছে তখন চেনা আকাশটাকে অচেনা মনে হয়েছে কখনও কখনও মনে হয়েছে আকাশটাকে অপরাজিতা ফুলের লাখ লাখ পাপড়ি ছড়ানো নীল আকাশ। আবার কখনও মনে হয়েছে ঠিক যেমন রাজহাঁসের পালক হয় ঘোলাটে সাদা এভাবেই আকাশ তার সম্মুখে ধরা দিয়েছে। কোনও সিদ্ধান্তেও আসতে পারেনি।
—তিথি তিথি তিথি ই ই ই…
—ও বৌমা দেখো ছেলে বোধহয় ডাকছে।
এ বাবা মাসি, অনেক বেলা হয়ে গেছে গো।
—হ্যাঁ হ্যাঁ উঠি উঠি চলো চলো।
হাতে হাতে কাজগুলো করে দিই।
—আমি আগে গিয়ে চা বসাই বুঝেছ।
হ্যাঁ সেই ভাল।এই পুচু ওঠ।
পুচু লেজ নাড়তে নাড়তে তিথিকে কেউ অনুসরণ করল।🍁 (ক্রমশঃ)।

 

 

🍂গ্রন্থ সমালোচনা  
জীবনের যে পর্যায়ে এসে মানুষের কাছের কাউকে আরও বেশি প্রয়োজন হয়, সেই সময়েই মনুবাবু যেন নিজের সংসারে একা হয়ে পড়েন। এখানেই উপন্যাসটি পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ, আমাদের সমাজে বাবা-মায়ের জন্য সন্তানের কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই আবেগকে যুক্তির আসনে বসানো হয়। সন্তানের জীবনের সিদ্ধান্তে বাবা-মায়ের অধিকার কতখানি, কিংবা বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বাবা-মায়ের পাশে থাকা কতটা প্রয়োজনীয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর সামাজিক রীতিতে অনেক সময় আগেই ঠিক করে রাখা থাকে। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের জীবন যে আলাদা, প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষা যে একই ছাঁচে গড়া নয়, তা আমরা সুবিধামতো ভুলে যাই।

 

সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ-এর ‘ভোরের আগে’ কী সত্যিই এই প্রজন্মকে নতুন করে ভাবতে শেখায়?

ভালবাসা, অবসর, নিঃসঙ্গতার পাশে একটু বসে থাকা, কিংবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে কয়েকটি সাধারণ মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া এসবের মূল্য কী সাফল্যের সংজ্ঞায় ধরা পড়ে? বুদ্ধদেব গুহর (Buddhadeb Guha) ‘ভোরের আগে’ উপন্যাসটি এই প্রশ্নগুলিকেই পাঠকের সামনে হাজির করে। উপন্যাসের নাম শুনে কোনও রোম্যান্টিক পরিণতির আভাস মিলতে পারে, কিন্তু কাহিনির ভিতরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, এখানে অন্ধকার তো শুধু রাতের না। তা মানুষের একাকিত্বের, প্রজন্মের চিন্তার সঙ্ঘাতের আর নিজের জীবনকে নিজের মতো করে বেছে নেওয়ার অধিকার নিয়ে সংশয়েরও।

সানি সরকার

জীবনকে কি শুধুই সাফল্যের মাপকাঠিতে মাপা যায়? নিজের পায়ে দাঁড়ানো, প্রতিষ্ঠা অর্জন, অর্থ উপার্জন অথবা নাম-যশের শিখরে পৌঁছনোই বেঁচে থাকার চূড়ান্ত সার্থকতা? নাকি জীবনের হিসেবের খাতায় এমন কিছু প্রাপ্তি থেকে যায়, যার কোনও বাজারদর নেই, অথচ অভাব হলে সমস্ত অর্জনই কেমন ফিকে হয়ে আসে? ভালবাসা, অবসর, নিঃসঙ্গতার পাশে একটু বসে থাকা, কিংবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে কয়েকটি সাধারণ মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া এসবের মূল্য কী সাফল্যের সংজ্ঞায় ধরা পড়ে? বুদ্ধদেব গুহর (Buddhadeb Guha) ‘ভোরের আগে’ উপন্যাসটি এই প্রশ্নগুলিকেই পাঠকের সামনে হাজির করে। উপন্যাসের নাম শুনে কোনও রোম্যান্টিক পরিণতির আভাস মিলতে পারে, কিন্তু কাহিনির ভিতরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, এখানে অন্ধকার তো শুধু রাতের না। তা মানুষের একাকিত্বের, প্রজন্মের চিন্তার সঙ্ঘাতের আর নিজের জীবনকে নিজের মতো করে বেছে নেওয়ার অধিকার নিয়ে সংশয়েরও। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বুদ্ধদেব গুহ-এর লেখার একটি নিজস্ব আকর্ষণ আছে। ওঁর ভাষা সাধারণত সাবলীল, বর্ণনায় অনাবশ্যক জটিলতার ভার কম, আর প্রকৃতির উপস্থিতি তাঁর আখ্যানকে দেয় আলাদা মাত্রা।

ভালবাসা যে সব সময় সরাসরি উচ্চারিত হয় না, কখনও কখনও তা দীর্ঘদিনের যত্নে, কোনও গাছকে বাঁচিয়ে রাখায় কিংবা একটি স্মৃতিকে আগলে রাখার মধ্যে প্রকাশ পায়, এই অনুষঙ্গ সেই কথাই মনে করায়। গাছের বেড়ে ওঠার মধ্যে সময়ের চলাচল রয়েছে। তাকে বড় হতে দেওয়া মানে অপেক্ষা করা, যত্ন নেওয়া এবং তার নিজের মতো করে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কী একই কথা প্রযোজ্য নয়? কাউকে ভালবাসা আর তাকে নিজের ইচ্ছেমতো গড়ে তুলতে চাওয়া যে এক জিনিস না, এই ভাবনার সঙ্গে গাছটির উপস্থিতি তাৎপর্য মিশে যায়।

‘ভোরের আগে’ পড়তে পড়তে সেই পরিচিত লেখনশৈলীর স্বাদ পাওয়া যায়। কিন্তু উপন্যাসটির মূল্য সহজপাঠ্য গদ্য কিংবা প্রেমের আবহে আটকে নেই। এর কেন্দ্রে এমন দ্বন্দ্ব, যার সঙ্গে বহু পাঠক কোনও না কোনওভাবে পরিচিত। নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়া? নাকি পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছাকে পিছনের সারিতে বসিয়ে দেওয়া? এই দু’য়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো যে সব সময় সহজ নয়, লেখক সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই উপন্যাসটির ভিত তৈরি করেছেন।

উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মনুবাবু। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি অনেক কিছুই অর্জন করেছেন। অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার বাধ্যবাধকতা তাঁর আর নেই। কিন্তু বয়সের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর সামনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা অর্থ দিয়ে পূরণ করার নয়! সংসারে সাফল্য, সামাজিক অবস্থান কিংবা সঞ্চিত সম্পদ কোনও কিছুই তাঁর নিঃসঙ্গতার প্রতিষেধক হয়ে উঠতে পারে না। ছেলে-মেয়েরা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। ফলে জীবনের যে পর্যায়ে এসে মানুষের কাছের কাউকে আরও বেশি প্রয়োজন হয়, সেই সময়েই মনুবাবু যেন নিজের সংসারে একা হয়ে পড়েন। এখানেই উপন্যাসটি পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ, আমাদের সমাজে বাবা-মায়ের জন্য সন্তানের কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই আবেগকে যুক্তির আসনে বসানো হয়। সন্তানের জীবনের সিদ্ধান্তে বাবা-মায়ের অধিকার কতখানি, কিংবা বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বাবা-মায়ের পাশে থাকা কতটা প্রয়োজনীয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর সামাজিক রীতিতে অনেক সময় আগেই ঠিক করে রাখা থাকে। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের জীবন যে আলাদা, প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষা যে একই ছাঁচে গড়া নয়, তা আমরা সুবিধামতো ভুলে যাই। মনুবাবুর নিঃসঙ্গতা সেই ভুলে যাওয়ার জায়গাটিকেই সামনে আনে। তাঁর চাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তিনি চান, তাঁর ছোট ছেলে শুভেন কাছে থাকুক, সংসার করুক, জীবনের শেষ পর্বে বাবার পাশে দাঁড়াক। কিন্তু এই চাওয়ার মধ্যেই কি ছেলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রবণতা লুকিয়ে নেই?

শুভেন হল এই উপন্যাসের দ্বন্দ্বের অন্য প্রান্ত। তার স্বপ্ন বড়। সে বিজ্ঞানী হতে চায়, নিজের গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করতে চায়। শুভেনের কাছে জীবন মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠিত সংসার না। জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার জন্য সে নিজের মতো করে এগোতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষাকে নিছক তারুণ্যের খামখেয়ালিপনা বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু তাতে কাহিনির মূল প্রশ্নটিই এড়িয়ে যাওয়া হয়। নতুন কিছু করতে চাওয়া কী ভুল? প্রচলিত জীবনযাত্রার বাইরে নিজের পথ তৈরি করার চেষ্টা কি দায়িত্বহীনতা? নাকি পরিবারের প্রতি কর্তব্যের নামে ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর অদৃশ্য শিকল পরিয়ে দেওয়াই আমাদের সমাজের পুরনো অভ্যাস? শুভেনের সঙ্কট এই কারণেই আকর্ষণীয় যে, সে কোনও সহজ সমাধানের সামনে দাঁড়িয়ে নেই। এক দিকে নিজের স্বপ্ন, অন্য দিকে বাবার নিঃসঙ্গতা। বাবার প্রয়োজনকে উপেক্ষা করলে অপরাধবোধ, আর নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিলে অপূর্ণতার আশঙ্কা। দুই দিকেই রয়েছে মানসিক মূল্য। উপন্যাসের এই দ্বিধা পাঠককে ভাবায়, কারণ এখানে কোনও একটি পক্ষকে সম্পূর্ণ ভুল বলে চিহ্নিত করে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। মনুবাবুর চাওয়া মানবিক, কিন্তু শুভেনের আকাঙ্ক্ষাও সমান বাস্তব। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ভালোবাসা অপরের জীবনকে নিজের ইচ্ছেমতো সাজিয়ে নেওয়ার অধিকারে পরিণত হয়।

এই উপন্যাসের আর একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র কুড়ি। দেখা যায়, মনুবাবুর জীবনের শেষ পর্বে কুড়ির উপস্থিতি নিছক পার্শ্বচরিত্রের ভূমিকা পালন করে না। তাঁর প্রতি যত্ন, দায়িত্ববোধ ও মানুষের পাশে থাকার ক্ষমতা কাহিনিতে এক আলাদা আবেগের পরিসর তৈরি করে। মনুবাবুর দেখভালের সঙ্গে কুড়ির যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা কেবল কর্তব্যের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। মানুষের জীবনে আত্মীয়তার সম্পর্কের বাইরেও যে গভীর টান তৈরি হতে পারে, কুড়ি সেই সম্ভাবনারই প্রতিনিধি। কুড়িকে ভাল লাগার কারণ তার উপস্থিতির মধ্যে কোনও কৃত্রিম নায়কোচিত আয়োজন নেই। মানুষের পাশে থাকা, প্রয়োজনের সময়ে দায়িত্ব নেওয়া ও নিজের কাজের মাধ্যমে অন্যের জীবনে জায়গা করে নেওয়ার যে গুণ, তা তাকে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তবে এই চরিত্রকে শুধু ত্যাগী নারী হিসেবে দেখলে তার তাৎপর্য কিছুটা খর্ব হয়। আবার প্রশ্নও ওঠে, মনুবাবুর পাশে থাকার যে দায়িত্ব কুড়ি পালন করেছে, তা কী কেবল পরিবারের সদস্যদেরই পালন করার কথা ছিল? রক্তের সম্পর্কের বাইরেও যে মানুষে-মানুষে দায়বদ্ধতা তৈরি হতে পারে, উপন্যাসের এই দিকটি ভাবার মতো। মনুবাবুর কাছে কুড়ির গুরুত্ব এবং শুভেনকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, এই দু’য়ের মধ্যে একটি আবেগগত যোগসূত্র রয়েছে। তাঁর মনে হয়, ছেলে ফিরে এলে জীবনের ফাঁকা জায়গাগুলি হয়তো আবার ভরে উঠবে। কিন্তু মানুষের অনুপস্থিতি পূরণ করার জন্য অন্য একজনকে ধরে রাখার চেষ্টা কতটা যুক্তিসংগত? সন্তানের উপস্থিতি কী নিঃসঙ্গতার স্থায়ী সমাধান, নাকি বাবা-মায়ের প্রত্যাশার ভিতরেও এমন কিছু থাকে, যা সন্তানের নিজস্ব জীবনকে সঙ্কুচিত করে? ‘ভোরের আগে’ এই প্রশ্নগুলির সহজ উত্তর দেয় না। কিন্তু পাঠককে নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে উত্তর খুঁজতে বাধ্য করে।

উপন্যাসটির আর একটি আকর্ষণ হাজারিবাগের (Hazaribagh) প্রকৃতি। বুদ্ধদেব গুহ -এর রচনায় প্রকৃতি বহু ক্ষেত্রেই নিছক পটভূমি হয়ে থাকে না; তা চরিত্রের মানসিক অবস্থার সঙ্গে মিশে যায়। এখানেও প্রকৃতির উপস্থিতি কাহিনির আবেগকে অন্য মাত্রা দেয়। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, সামাজিক প্রতিষ্ঠার চাপ আর ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদের বাইরে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার মধ্যে এক ধরনের বিরতি আছে। সেই বিরতি মানুষকে নিজের জীবন নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়। তবে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে কেবল মানসিক শান্তির আশ্রয় হিসেবে দেখলে তার বাস্তব তাৎপর্য কমে যায়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, তার প্রতি যত্ন এবং স্মৃতির সঙ্গে তার যোগও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কুড়ির শুভেনের প্রতি ভালবাসাকে মনে রেখে একটি গাছের পরিচর্যা করে তাকে বড় করে তোলার প্রসঙ্গটি উপন্যাসের আবেগময় দিকগুলির মধ্যে অন্যতম। ভালবাসা যে সব সময় সরাসরি উচ্চারিত হয় না, কখনও কখনও তা দীর্ঘদিনের যত্নে, কোনও গাছকে বাঁচিয়ে রাখায় কিংবা একটি স্মৃতিকে আগলে রাখার মধ্যে প্রকাশ পায়, এই অনুষঙ্গ সেই কথাই মনে করায়। গাছের বেড়ে ওঠার মধ্যে সময়ের চলাচল রয়েছে। তাকে বড় হতে দেওয়া মানে অপেক্ষা করা, যত্ন নেওয়া এবং তার নিজের মতো করে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কী একই কথা প্রযোজ্য নয়? কাউকে ভালবাসা আর তাকে নিজের ইচ্ছেমতো গড়ে তুলতে চাওয়া যে এক জিনিস না, এই ভাবনার সঙ্গে গাছটির উপস্থিতি তাৎপর্য মিশে যায়।

উপন্যাসটির আবেগঘন উপাদানগুলি যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। বাবা-ছেলের সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাত বাংলা সাহিত্যে একেবারে নতুন বিষয় না। ফলে এই বিষয়গুলির উপস্থিতিই কোনও উপন্যাসকে অভিনব করে তোলে না। আসল বিচার নির্ভর করে লেখক চরিত্রগুলির দ্বন্দ্বকে কতটা গভীরে নিয়ে যেতে পেরেছেন, তাঁদের সিদ্ধান্তের সামাজিক ও মানসিক পরিণতি কতটা অনুসন্ধান করেছেন, তার উপর। ‘ভোরের আগে’ সহজ গদ্য ও আবেগের সাহায্যে পাঠককে কাছে টানে ঠিকই, কিন্তু যাঁরা চরিত্রের মনস্তত্ত্বের আরও কঠোর বিশ্লেষণ কিংবা দ্বন্দ্বের আরও জটিল বিন্যাস প্রত্যাশা করেন, তাঁদের কাছে কিছু জায়গা তুলনামূলক সরল মনে হতে পারে। আবেগের টান কখনও কখনও প্রশ্নের ধারকে নরম করে দেয়। এই সীমাবদ্ধতা কিন্তু উপন্যাসটির মূল আলোচনাকে অগ্রাহ্য করার কারণ না। বড় কথা, ‘ভোরের আগে’ পড়ার পর মনুবাবুর প্রতি সহানুভূতি যেমন তৈরি হয়, তেমনই শুভেনের স্বপ্নের পক্ষেও যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। কুড়ির যত্ন ও নিষ্ঠা পাঠককে মুগ্ধ করে, কিন্তু তার উপস্থিতি মনুবাবুর পরিবারের অনুপস্থিতির প্রশ্নটিকেও সামনে আনে। এখানে ভালবাসা কোনও একরৈখিক অনুভূতি হিসেবে দেখলে ভুল হয়ে যাবে। তার মধ্যে দাবি রয়েছে, দায়িত্ব আছে, প্রত্যাশা, আবার মুক্তি দেওয়ার কঠিন শিক্ষাও আছে। এই কারণেই উপন্যাসটি প্রেমের গল্প বা প্রকৃতিনির্ভর আখ্যান হিসেবে পড়লে তার একটি বড় অংশ অধরা থেকে যায়।

বুদ্ধদেব গুহর ‘ভোরের আগে’ এমন এক উপন্যাস, যা পাঠ শেষে জীবনের সাফল্য সম্পর্কে আমাদের পরিচিত ধারণাগুলিকে আর এক বার যাচাই করতে বলে। প্রতিষ্ঠা অর্জন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে সম্পর্কের জায়গাটি কতটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নও কম জরুরি নয়। বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেই দায়িত্ব কী সন্তানের সমস্ত স্বপ্নের উপর চূড়ান্ত অধিকার দিতে পারে? ভালোবাসার মানুষকে কাছে চাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু তার জন্য তাকে নিজের পথ থেকে সরিয়ে আনা কি সত্যিই ভালোবাসা? এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাঠকভেদে আলাদা হতে পারে। আর সেই কারণেই উপন্যাসটির আলোচনা বইয়ের শেষ পাতায় থেমে যায় না। বইটির সহজপাঠ্য ভাষা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, নিঃসঙ্গতার বেদনা কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে আবেগের মেলবন্ধনের জন্য ‘ভোরের আগে’ পাঠযোগ্য। কিন্তু  বইটিকে নিছক মন ভাল করা প্রেমের উপন্যাস ভাবলে ভুল হবে। এর ভিতরে লুকিয়ে আছে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও। তা হল, আমরা যাঁদের ভালবাসি, তাঁদের পাশে থাকতে গিয়ে তাঁদের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকারও কী নিজেদের হাতে তুলে নিই? আর যে মানুষটি নিজের স্বপ্নের দিকে এগোতে চায়, তাকে ভালবাসার নামে আটকে রাখলে শেষ পর্যন্ত কার জীবনই বা পূর্ণ হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বুদ্ধদেব গুহর উপন্যাসটি পাঠকের মনে থেকে যায়।

বই: ভোরের আগে
লেখক: বুদ্ধদেব গুহ
মুদ্রিত দাম : ৩৫০ টাকা

 

আরও পড়ুন : Sasraya News Sunday’s Literature Special | 11th October 2026, Sunday | Issue 130 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ১১ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার | সংখ্যা ১৩০ 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আইডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News